টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো ঘটনা ঘটেনা। শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি গোয়েন্দা ছবি হয় আর মিডিওকার পরিচালকরা কখনো ‘মাস’ আর কখনো নাকি ‘ক্লাস’-এর ছবি বানিয়ে থাকেন। কোন ছবিটা কাদের জন্য, সেটা আবার তাদের মুখ থেকেই জেনে নেওয়া যায়। জেনে নেওয়া যায়, কোন ছবিটা দুয়ের দিব্যি মিলমিশ। যাক গে, খারাপ কথা বাদ দিয়ে অনেক খুঁজে গোটা তিনেক খবর দেওয়া যাক, যা টালিগঞ্জে এ বছর ঘটেছে।

বুম্বা-ঋতু জুটির কামব্যাক– শিবপ্রসাদ-নন্দিতার হাত ধরে কতওও বছর পরে যেন পর্দায় ফিরল প্রসেনজিত-ঋতুপর্ণা জুটি। প্রাক্তন। স্বাভাবিক ভাবেই জমিয়ে ব্যবসা করেছে ছবিটি। যদিও মেয়েদের অধিকার নিয়ে, প্রায়োরিটিজ নিয়ে যারা সামান্যও ভাবেন, তারা প্রচুর গালাগাল করেছেন।

রাজ-মিমির ব্রেকআপ– পরিচালক আর নায়িকার প্রেমের মতো একটা ক্লিশে বস্তু নিয়েও আমাদের টলিউডের সাংবাদিকরা বহু পাতা এবং ফুটেজ খরচ করেন,পাঠকরাও উপায়ান্তর না পেয়ে সেগুলিই পড়েন ও দেখেন। এরকম পড়তে পড়তেই একদিন জানা গেল, নায়িকা মিমি বিদেশ-বিভুঁইয়ে শুটিং করতে গিয়েও স্বদেশের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুর পোষ্য নিয়ে ফেলেছেন। তাও আবার কি ছিরির নাম তার। মিলি। জাতে তুর্কি। তার বাবা সে দেশের লাইন প্রোডিউসার। তা মিমি-মিলির নয়া প্রেমকাহিনি মোটেই ভালো ভাবে নেননি রাজ চক্রবর্তী। নেওয়ার কথাও না। কষ্টে ভেঙে পড়ে কার হাত ধরে রাজ উঠে দাঁড়ালেন, সেটা এখনো আম জনতার সামনে আসেনি সেভাবে। ২০১৭-য় আসবে হয়তো।

zulfiqar

জুলফিকার–  জিৎ রাজি হননি কৌশিক সেনের রোলটা করতে। না হলে, কী যে হত, ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। এমন মাল্টিস্টারার গ্যাংস্টার মুভি বাংলা এর আগে হয়নি। প্রসেনজিৎ বলেছেন, এমন নাকি আর হবেও না। যাকে বলে ‘এই অ্যাক নতুন’। নানারকম কীর্তি স্থাপনে সদাব্যস্ত সৃজিৎ মুখার্জি এই ছবি রিলিজের পরই কলকাতা ছেড়ে মুম্বই চলে গিয়েছেন। রিলিজের পর শোনা যাচ্ছিল জুলফিকার নাকি প্রচুর ব্যবসা করেছে। যত দিন গিয়েছে, আলোচনা কমে এসেছে। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখেনি কেউ।

এবার বলিউড। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সব সিনেমার আগে হলে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর নির্দেশের ব্যাপারটা সাধারণ ভাবে বলা থাক। কারণ ওটা তো আর স্রেফ বলিউডের ব্যাপার না। গোটা দেশের বিষয়। উল্লেখ থাক, সেন্সর বোর্ডের প্রধান পহলাজ নিহালনির নামটাও। তিনি গালাগালি থাকার জন্য উড়তা পঞ্জাব ছবিকে অ্যাডাল্ট তকমা দিয়েছেন। যদিও আদিত্য চোপড়ার বেফিকরে ছবির হাজারো চুমু এবং বিছানা দৃশ্যের প্রতীক তার ছাড় পেয়েছে (একটি গানে দুই মহিলার ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে চুমু অবশ্য ছাড় পায়নি)। ছাড়ের কারণ, ছবিটির প্রেক্ষাপট বিদেশ। আমরা জানতে পেরেছি, যৌনক্রিয়াদি ভারতের জলহাওয়াভূমিতে মোটেই মানানসই নয়। যাক গে, বিষয়ে ঢোকা যাক।

banned

উগ্র জাতীয়তাবাদ– উরিতে সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি শিল্পীদের ভারতীয় ছবিতে না দেওয়ার দাবিতে উত্তাল হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এ বছর বেশ নজর কেড়েছেন। পরিস্থিতি এমনই হয়, যে করন জোহরের অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিলের রিলিজ নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত করন সেনা বাহিনীর তহবিলে উগ্র হিন্দুদের দাবিতে ৫ কোটি টাকা দেন বলে শোনা যায়। এবং জাতীয়তাবাদ প্রমাণে একটি আবেগময় ভিডিও প্রকাশ করেন। কারণ, তাঁর ছবিতে একজন পাকিস্তানি অভিনেতা ছিলেন। এই বিতর্কে গোটা বলিউড দুভাগ হয়ে যায়। বিপদ এখনো বাকি। জানুয়ারিতে আসছে শাহরুখের রইস। সেখানেও এক পাকিস্তানি নায়িকা অভিনয় করেছেন।

parched-edited

পার্চড, পিঙ্ক ও মহিলা কুস্তিগিররা– ২০১৫ থেকেই বলিউডে মহিলা প্রোটাগনিস্টরা বেশ বাজার জমিয়েছেন। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে পুরুষতন্ত্রের নেতৃত্বে মহিলাদের অগ্রগতি জারি রয়েছে ২০১৬-তেও। পিঙ্কের বৃদ্ধ উকিল অমিতাভ বচ্চন তার প্রমাণ। এছাড়া রয়েছে সুলতান ও দঙ্গল। যেখানে মহিলা কুস্তিগিরদের দাপট। দুই ছবিকে ন্যায্যতা দিতেই হয়তো এবারের অলিম্পিক থেকে পদক এনেছেন সাক্ষী মালিক। কিন্তু দৃঢ় নায়ক পিতা আমিরের দাপটে তাঁর দুই মেয়ে যখন বর্ষশেষে সাফল্য অর্জন করে, তখন বলিউড ও মহিলাদের রসায়ন নিয়ে কিঞ্চিত টেনশন হয় বৈকি।

বায়োপিক– রাজনৈতিক নেতাদের বায়োপিকের দিন পেরিয়ে বলিউড এখন খেলোয়াড়দের বায়োপিক বানিয়ে চলেছে একটানা। ধোনি, আজহার, বুধিয়া এবং শেষে মহাবীর সিং ফোগট। সবই নাকি ‘অথরাইজড বায়োপিক’। পাথরের বাটি যে সোনারও হয়,  সে তো আমরা কবে থেকেই জানি।

taimur-ali-khan

তৈমুরের জন্ম– কানু বিনে কি গীত হয়। তৈমুর ছাড়াও ২০১৬ সালের বলিউড হয় না। কোথায় নাম হবে সাইফিনা, তা না হয়ে সইফ-করিনার ছেলের নাম হয়েছে দুর্দান্ত মুসলিম শাসক, দিল্লি আক্রমণকারী ঐতিহাসিক চরিত্র তৈমুর লঙ-এর নামে। ব্যস! আর যায় কোথায়। রে রে করে উঠেছে হিন্দুত্ববাদীরা। তাতে অবশ্য কিছু হওয়ার নয়। বছর বিশেক পরে নিশ্চয় সারা ভারত তৈমুরের নাচের তালে পা দোলাবে। কিংবা তার বীরগাথায় উজ্জীবিত হবে।  

হলিউড নিয়ে আমাদের খুব মাথা ব্যথা নেই। তবু বচ্ছরকারের ব্যাপার তো। উল্লেখ থাক। তার ওপর বলিউডের চেনা মুখরা আজকাল হলিউডেও দিব্যি নাম কামাচ্ছেন, পয়সাও।

priyanka-edited

প্রিয়ঙ্কা-ইরফান– বছরের শেষে অসম পর্যটনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়ে দেশে ফিরেছেন বটে, কিন্তু প্রিয়ঙ্কা আজকাল হলিউডেই থাকেন প্রায়। সেখানেই টিভি সিরিজ কোয়ান্টিকোয় অভিনয় করেন। রকমারি অ্যাওয়ার্ড দেন ও নেন।

পিছিয়ে নেই ইরফানও। তিনিও একের পর এক হলিউড ছবিতে অভিনয় করে চলেছেন। সেই লাইফ অফ পাই থেকে শুরু, এবছর অভিনয় করলেন ইনফার্নো-তে। শোনা যাচ্ছে, হলিউডে কাজ করে অস্কারের স্বপ্ন দেখছেন পিকুর প্রেমিক।

leonardo-dicaprio

লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও-র অস্কার লাভ– সেই কবে থেকে অভিনয় করছেন। টাইটানিকে অভিনয় করে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত হয়েছিলেন। ছ-ছবার সেরা অভিনেতার সম্মানের জন্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের নমিনেশন পেয়েছেন কিন্তু অস্কার জোটেনি। ২০১৬-য় এসে বাঁধ ভাঙল লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও-র। রেভন্যান্ট ছবির জন্য ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট অ্যাক্টর’ পেলেন তিনি।

branjelina

ব্র্যাঞ্জেলিনার বিচ্ছেদ– সেবারও অলিম্পিক ছিল। ২০০৪। সেবারই সম্পর্কটা তৈরি হয় ব্র্যাড পিট ও অ্যাঞ্জেলিনা জোলির। তারপর কত কিছু। একের পর এক দত্তক। গর্ভে ধারণ করা সন্তান। ক্যান্সারের সম্ভাবনা দেখে জোলির দুই স্তন কেটে বাদ দেওয়া। সঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সিনেমা কেরিয়ার। নানা ভাবেই খবরে এসেছেন হলিউডের এই রূপকথার জুটি। আরেকটা অলিম্পিকের বছরেই আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ হল সেই সম্পর্ক। বিবাহ বিচ্ছেদ হল। সব ভাল জিনিসই এক সময় শেষ হয়। ২০১৬ তার একান্ত নিজস্ব বোতলে সেই পুরোনো মদটাই পরিবেশন করে দিয়ে গেল আমাদের। সে মদের স্বাদ যে সকলের সমান লাগবে না, তা তো বলাই বাহুল্য।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here