অনন্য সব কীর্তি রেখে চলে গেলেন চলচ্চিত্রকার তরুণ মজুমদার  

0
Tarun Majumder

কলকাতা: তরুণ মজুমদার আর নেই। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় স্রষ্টা সোমবার সকাল সোয়া ১১টা নাগাদ এসএসকেএম হাসপাতালে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

রবিবার তাঁর শারীরিক অবস্থার খুবই অবনতি হয়। বেড়ে যায় শ্বাসকষ্ট। ক্রিয়েটিনিনের মাত্রাও প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন অবস্থায় ছিলেন তিনি। পুরোপুরি ভেন্টিলেটরি সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাঁকে।  

প্রসঙ্গত গত ২২ বছর ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন পরিচালক। কিডনি ও ফুসফুসের সমস্যা অত্যন্ত বাড়ায় গত ১৪ জুন এসএসকেএম হাসপাতালে ভরতি করা হয় তরুণবাবুকে। তাঁকে উডবার্ন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। পাঁচ সদস্যের একটি চিকিৎসক দল তাঁর চিকিৎসা করছিলেন। অবশেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ‘ভালোবাসার বাড়ি’র পথে পাড়ি দিলেন ‘জীবনপুরের পথিক’।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

অবিভক্ত বাংলা, অধুনা বাংলাদেশের বগুড়ায় ১৯৩১ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তরুণ মজুমদার। তাঁর বাবা বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন স্বাধীনতাসংগ্রামী।

কেমিস্ট্রির মেধাবী ছাত্র হলেও সিনেমা তৈরির ঝোঁক ছিল বরাবরই। সেই সুবাদেই তাঁর চলচ্চিত্র সৃষ্টিতে ঝাঁপিয়ে পড়া। তবে একক ভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনা করার আগে শচীন মুখার্জি ও দিলীপ মুখার্জিকে নিয়ে ‘যাত্রিক’ নামের ব্যানারে তরুণবাবু চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজে নামেন। তাঁদের প্রথম ছবি সুচিত্রা সেন ও উত্তমকুমার অভিনীত ‘চাওয়া পাওয়া’। অভিষেকেই সাড়া জাগিয়েছিল ‘যাত্রিক’। ‘যাত্রিক’ পরিচালিত তৃতীয় ছবি ‘কাঁচের স্বর্গ’। এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দিলীপ মুখার্জি। ‘কাঁচের স্বর্গ’ও বক্স অফিস হিট হয়েছিল। এই ‘কাঁচের স্বর্গ’ ছবির জন্য প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান তরুণবাবু। ‘কাঁচের স্বর্গ’-এর আগে ‘যাত্রিক’ পরিচালিত ‘স্মৃতিটুকু থাক’ ১৯৬০-এ মুক্তি পায়। এতে অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেন, ছবি বিশ্বাস, অসিত বরণ প্রমুখ।        

১৯৬৩ থেকে তরুণবাবু একক ভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজে নামেন। প্রথম ছবি ‘পলাতক’। অনুপকুমার ও সন্ধ্যা রায় অভিনীত এই ছবি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। অনুপকুমার প্রধানত কৌতুকশিল্পী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেই অনুপকুমারকে দিয়ে তরুণবাবু সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করালেন। এবং ‘পলাতক’-এ অভিনয়ে করে অনুপকুমার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কত বড়ো মাপের শিল্পী। আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই’ আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে।  

এক অনন্য কীর্তি ‘বালিকা বধূ’

সাহিত্যিক বিমল করের উপন্যাস ‘বালিকা বধূ’র চলচ্চিত্রায়ন (১৯৬৭) বাংলা সিনেমার জগতে এক অনন্য কীর্তি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই ছবিতে অভিষেক হয়েছিল পরবর্তী কালের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌসুমি চট্টোপাধ্যায়ের। ১৯৭৬-তে এই ছবির হিন্দি রিমেক হয়েছিল। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে ১৯৬৭-তে ফিল্মফেয়ার ইস্ট পুরস্কার পেয়েছিল ‘বালিকা বধূ’। অবশ্য ‘বালিকা বধূ’ করার দু’ বছর পরেই বিশ্বজিৎ, সন্ধ্যা রায় ও শশীকলাকে নিয়ে একটি হিন্দি ছবি করেছিলেন তরুণবাবু। নাম, ‘রাহগীর’।

এর পর একে একে তৈরি করেলেন ‘নিমন্ত্রণ’ (১৯৭১), ‘কুহেলি’ (১৯৭১), ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ (১৯৭৩)। সব ছবিই দর্শকের সমাদর পেল। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ তো সুপার হিট। উৎপল দত্ত দর্শকদের মাতিয়ে দিলেন। আর বাংলা চলচ্চিত্র পেল ভবিষ্যতের এক শক্তিময়ী অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীকে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প ‘অরন্ধনের নিমন্ত্রণ’ অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্র ‘নিমন্ত্রণ’ অনেক পুরস্কার পেল – বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্র হিসাবে জাতীয় পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালনা হিসাবে বিএফজেএ পুরস্কার, সর্বশ্রেষ্ঠ ফিল্ম হিসাবে ফিল্মফেয়ার ইস্ট পুরস্কার।  

ফুলেশ্বরী, ফুলেশ্বরী, ফুলের মতো নাম

পরের বছরই বানালেন তিনটি ছবি – ‘ঠগিনী’, ‘ফুলেশ্বরী’ ও ‘যদি জানতেম’। ‘ফুলেশ্বরী’কে তাঁর সব চেয়ে প্রিয় ফিল্ম বলে পরে বর্ণনা করেছেন তরুণবাবু। সেই সময়ের বাংলা গানের জগতের বেশ কয়েক জন নামকরা শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছিলেন ‘ফুলেশ্বরী’তে – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায় এবং অনুপ ঘোষাল।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে ১৯৭৫-এ তরুণবাবু বানালেন ‘সংসার সীমান্তে’। প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটি ছোটোগল্প অবলম্বনে রাজেন তরফদারের তৈরি চিত্রনাট্যকে সিনেমায় রূপ দিলেন তরুণ মজুমদার। এই ফিল্মে সৌমিত্র অভিনয় করলেন ‘অঘোর’ নামে এক চোরের ভূমিকায়। পরে কোনো একসময়ে সৌমিত্র বলেছিলেন, সিনেমায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির মধ্যে ‘অঘোর’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্র।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৮-এ তরুণবাবুর তৈরি ‘গণদেবতা’ পেল ‘সার্বিক বিনোদনের উপযোগী সর্বশ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় চলচ্চিত্র’ হিসাবে জাতীয় সম্মান। ‘গণদেবতা’য় অন্যতম মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সেই সময়ে বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯৮০-এর কীর্তি ‘দাদার কীর্তি’

১৯৮০-তে মুক্তি পেল তরুণ মজুমদারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘দাদার কীর্তি’। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মজার গল্পটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দিলেন তরুণবাবু। ‘দাদার কীর্তি’ আজকালকার ভাষায় একেবারে সুপার ডুপার হিট। নায়িকার ভূমিকায় মহুয়া। এই ‘দাদার কীর্তি’র মাধ্যমে টলিউড পেল দুই শক্তিশালী অভিনেতা ও অভিনেত্রীকে – তাপস পাল ও দেবশ্রী রায়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য এই দুই জনই বাংলার রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৮১-তে মহুয়া পেলেন ফিল্মফেয়ার ইস্ট পুরস্কার।  

এর পরেও আরও বহু ছবি বানিয়েছেন তরুণ মজুমদার। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শহর থেকে দূরে’ (১৯৮১), ‘মেঘমুক্তি’ (১৯৮২), ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ (১৯৮৬), ‘পথভোলা’ (১৯৮৬), ‘আলো’ (২০০৩), ‘ভালোবাসার অনেক নাম’ (২০০৫), চাঁদের বাড়ি (২০০৭), ‘ভালোবাসার বাড়ি’ (২০১৮) ইত্যাদি। বানিয়েছিলেন দু’টি তথ্য-কাহিনিচিত্র – ‘অরণ্য আমার’ (১৯৮৪) এবং ‘অধিকার’ (২০১৮)। এই ‘অধিকার’ই তাঁর তৈরি শেষ চলচ্চিত্র।

ঝুলিতে বহু পুরস্কার

বছরের সব চেয়ে বিশিষ্ট কাজ হিসাবে ২০০৪-এ ‘আলো’ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসাবে ২০০৭-এ ‘ভালোবাসার অনেক নাম’ বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছিল। ২০০৪ সালে ‘আলো’ সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে আনন্দলোক পুরস্কার পায়। তথ্য-কাহিনিচিত্র ‘অরণ্য আমার’ সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।

তরুণবাবু তাঁর কর্মজীবনে চারটি জাতীয় পুরস্কার, সাতটি বিএফজেএ পুরস্কার, পাঁচটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ও একটি আনন্দলোক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯০ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত করা হয়।

বামপন্থী চিন্তাধারার মানুষ তরুণ মজুমদার আমৃত্যু রাজ্যের বাম নেতৃবৃন্দের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তৃণমূল সরকারের আমলে সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচিতে দেখা যেত তরুণ মজুমদারকে।                              

                     

           

      

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন