bollywood

ওয়েবডেস্ক: জার্মানির হাত ধরেই কি সাবালক হল বলিউডের ছবি?

প্রশ্নটার উত্তর বিতর্কের জন্ম দেবে! কিন্তু যা-ই বলুন, ভারত আর জার্মানির মধ্যে একটা ভাববিনিময়ের সম্পর্ক আছেই! যা কালের স্রোত বেয়ে এসে পড়েছে চলচ্চিত্রের জগতেও। প্রমাণ উদ্ধারের জন্য পিছিয়ে যাওয়া যায় অনেক অনেকগুলো বছর!

সময়টা ১৮৬৯। সেই সময়ে জার্মানিতে ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন মহাপণ্ডিত ম্যাক্স মুলার। ব্যস্ততা তাঁর ঋগ্বেদের অনুবাদ নিয়ে। সেই প্রসঙ্গে এক সভায় মন্তব্য করেছিলেন তিনি- “খুব শীঘ্রই জন্ম নেবে এক নতুন ভারতীয় সাহিত্য। যাকে ভাবধারার দিক থেকে পুষ্ট করবে ইউরোপীয় সংস্কৃতি, অথচ তা সর্বাঙ্গে ধারণ করে থাকবে ভারতীয় ঐতিহ্য!”

bollywood
‘কর্ম’ ছবিতে দেবিকা রানি আর হিমাংশু রায়

সাহিত্যের ক্ষেত্রে না হলেও ম্যাক্স মুলারের এই ভবিষ্যদ্বাণী কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সত্যি হল ভারতীয় ছায়াছবির ক্ষেত্রে।

বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত দাবি- চলচ্চিত্রের প্রথম উদ্ভাবন হয় জার্মানিতে। সৌজন্যে, লুমিয়ের ভ্রাতৃযুগল। অগস্ত আর লুই লুমিয়ের প্রথম যে ফুটেজটি তুলেছিলেন কারখানা থেকে নারী-শ্রমিকদের বেরিয়ে আসার, সেই ‘ওয়ার্কার্স লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি’-কেই বলা হয়ে থাকে বিশ্বের প্রথম ছবি!

bollywood
‘অচ্ছ্যুৎ কন্যা’ ছবিতে লীলা চিটনিস আর অশোক কুমার

কে কল্পনা করেছিল, প্রথম চলচ্চিত্রের সেই ঢেউ জার্মানি থেকে এসে পৌঁছবে ‘বম্বে’-তেও! এবং জার্মানির হাত ধরেই কালে-দিনে বলিউডের পালে লাগবে সাহসিকতার হাওয়া।

তথ্য বলছে, ভারতীয় চলচ্চিত্র বা বলা ভাল বলিউডের ছবি, প্রথম সাবালক হল ‘প্রপঞ্চ পাশা’ ছবির হাত ধরে। সেই ছবিতেই ঘনিষ্ঠ এক চুম্বন দৃশ্যে রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজকে যথেষ্ট চমকে দিয়েছিলেন ছবির নায়িকা সীতা দেবী। সময় ১৯২৯ সাল। ছবির গল্পের অবলম্বন ভারতীয় সাহিত্যের চিরকালের অনুপ্রেরণা মহাভারত। অথচ, সেই ছবির পরিচালক এক জার্মান, নাম ফ্রানজ অস্টেন।

এর পরে এক ধাক্কায় চলে আসা যাক ১৯৩৩ সালে। ফের বলিউডের পর্দায় ধুন্ধুমার। দেবিকা রানি আর হিমাংশু রায়ের ঠোঁটঠাসা চুমু হইচই ফেলে দিয়েছে ভারতীয় জনমানসে। ছবিটির নাম ‘কর্ম’। পরিচালক জে এল ফ্রিয়ার হান্ট জার্মান নন ঠিকই! কিন্তু, ছবিটি তৈরি হয়েছিল ভারত আর জার্মানির যৌথ উদ্যোগে।

bollywood
‘দিল আপনা অউর প্রীত পরাই’ ছবির শুটিংয়ে মীনা কুমারী, কামাল অমরোহি আর জোসেফ ওয়ার্শ্চিং

যদিও ‘প্রপঞ্চ পাশা’র কথা বাদ দিলে হিমাংশু রায়, দেবিকা রানি এবং তাঁদের মানসপুত্র ‘বম্বে টকিজ’-এর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে জার্মান সম্পর্ক। সেই প্রসঙ্গেই জোসেফ ওয়ারশ্চিংয়ের নাম না নিলেই নয়। ১৯২৫ সালে এই জার্মান সিনেম্যাটোগ্রাফার কাজ শুরু করেছিলেন ফ্রানজ অস্টেনের সঙ্গে। সেই ছবির নাম ছিল ‘প্রেম সন্ন্যাস’ বা ‘দ্য লাইট অব এশিয়া’। গৌতম বুদ্ধর জীবন নিয়ে তৈরি এই ছবি যেমন জনপ্রিয় হয়েছিল, তেমনই তার সূত্রে বলিউড পেয়েছিল জোসেফকে।

bollywood
‘মহল’ ছবিতে মধুবালা

জোসেফ ওয়ারশ্চিংয়ের কাজের দিকে যদি তাকাতে হয়, দেখা যাবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনেক ছবিই তৈরি হয়েছে ‘বম্বে টকিজ’-এর উদ্যোগে। অশোক কুমার আর লীলা চিটনিসের ‘অচ্ছ্যুৎ কন্যা’, যা শুধু বিষয়ের দিক থেকেই নয়, চিত্রগ্রহণের দিক থেকেও ভারতীয় ছবির মাইলফলক, সেখানেও ক্যামেরার নেপথ্যে রয়েছেন জোসেফ। ‘বম্বে টকিজ’-এর ১০টিরও বেশি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন এই জার্মান সিনেম্যাটোগ্রাফার। যদিও সেই যাত্রায় যতি পড়ে অচিরেই। ১৯৪০ সালে দেবিকা রানির মৃত্যুর পর ‘বম্বে টকিজ’ অনাথ হয়ে যায়।

bollywood
‘পাকিজা’-য় মীনা কুমারী

কিন্তু, বলিউডের সঙ্গে জার্মান যোগাযোগ থেকে গেল ঠিকই। জোসেফ কাজ শুরু করলেন ‘কামাল পিকচার্স’-এর সঙ্গে। তাঁর দক্ষ মুন্সিয়ানায় আর কামাল অমরোহির পরিচালনায় একে একে ভারতীয় পর্দায় অপূর্ব সব চিত্রকল্প রচনা করল ছায়াছবিরা। তার মধ্যে বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের ‘মহল’, ১৯৬০-এর ‘দিল আপনা অউর প্রীত পরাই’, ১৯৭২-এর ‘পাকিজা’ ছবির কথা না বললেই নয়। যদিও মুক্তির পর বড়োপর্দায় ‘পাকিজা’ দেখে যেতে পারেননি জোসেফ। ১৯৬৭-তেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছে পৃথিবী ছেড়ে।

bollywood
ফ্রানজ অস্টেনের ‘বচন’ ছবির শুটিং দৃশ্য

সত্যি বলতে কী, শুধু জোসেফই নন, জার্মানির যাঁরাই কাজ করেছেন বলিউডে, তাঁরা এক বিশেষ ঘরানার জন্ম দিয়েছেন ভারতীয় সিনেম্যাটোগ্রাফিতে। যার মধ্যে সমান ভাবে মিশে আছে জার্মান আর ভারতীয় চেতনা। জার্মান এক্সপ্রেশনিজম ছবির চরিত্রদের দিয়েছে অতিরঞ্জিত, কখনও বা সামান্য বিপর্যস্ত এক রূপ যাকে পুষ্ট করেছে ভারতীয় মূল্যবোধ। ‘অচ্ছ্যুৎ কন্যা’ থেকে ‘পাকিজা’- সর্বত্রই ছবিটা এক! এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে জার্মানির এক্সপ্রেশনিজমকে সম্বল করে আর ভারতীয় উপাদান নিয়ে তৈরি ছবির সেট, কোরিওগ্রাফি। বলতে দ্বিধা নেই, যার পরিণামে ছবিগুলো পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক তকমায়। এখনও তাদের নিয়ে কথা না বললে চলে না।

‘দিল আপনা অউর প্রীত পরাই’ ছবির শুটিংয়ে জোসেফ ওয়ার্শ্চিং

কিন্তু দেখার সুযোগ তো সকলের হয় না! বিশেষ করে সেই সব ঘটনা যা রয়ে গিয়েছে শুটিংয়ের আড়ালে, স্থিরচিত্রশিল্পীর ক্যামেরায়। সৌভাগ্যের বিষয়, জোসেফের মৃত্যুর এত বছর বাদে তাঁর তোলা এমন বেশ কিছু স্থিরচিত্রের একটি প্রদর্শনী হচ্ছে রাজধানীতে। চলবে তা ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

কিন্তু যাঁরা সেই চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে পাচ্ছেন না?

তাঁদের জন্য রইল ভারত-জার্মান সহাবস্থানের সাক্ষী থাকা কিছু ভিডিও আর ছবি, এই পাতায়!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here