সেই দৃশ্য, যেখানে ঠাকুর ষোড়শী রূপে মাকে পূজা করেন।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের লীলা এবং বাণী, দু’টিই আমাদের জীবনে পরম সম্বল বলেই পরিচিত। আজ ফলহারিণী কালীপুজো। আজ থেকে ঠিক ১৪৯ বছর আগে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে এমনই এক ফলহারিণী কালীপুজোর দিন ঠাকুর ষোড়শী রূপে পূজা করেছিলেন মা সারদার।

Loading videos...

জগজ্জননী মা সারদা, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, রানি রাসমণিকে নিয়ে বহু চলচ্চিত্র, নাটক এবং টিভি ধারাবাহিক হয়েছে। এঁদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী। তাঁদের সুনিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রগুলিকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। তবে ইদানীং যে ধারাবাহিকটি দর্শকমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল সেটি হল আকাশ আট চ্যানেলের ‘জগজ্জননী মা সারদা’। সেই ধারাবাহিকে ঠাকুরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুমন কুণ্ডু। সুমনবাবুকে তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হয়েছিল ফলহারিণী কালীপুজোর দিনের শ্রীরামকৃষ্ণকে।      

কথা হচ্ছিল অভিনেতার সঙ্গে। তিনি জানালেন, যখন প্রথম খবর পান যে তিনিই এই ধারাবাহিকে ঠাকুরের চরিত্রে অভিনয় করছেন, তখন এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে বলে বোঝানো যায় না। তবে ঠাকুরের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি যে  দর্শকদের এতটা কাছে পৌঁছে যেতে পারবেন তা হয়তো ভাবতে পারেননি।

শ্রীরামকৃষ্ণরূপী সুমন কুণ্ডু।

অভিনেতা জানান, তাঁর ভিতরে ভক্তিভাব আছে, তাই তিনি ঠাকুরের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। তবে ‘জগজ্জননী মা সারদা’র এই বিশাল জনপ্রিয়তার জন্য ধারাবাহিকের পরিচালক, আকাশ আট চ্যানেল, ঔপন্যাসিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-সহ অন্যান্য চরিত্রাভিনেতা ও কলাকুশলীদের কৃতিত্ব দিয়েছেন সুমনবাবু।

কী হয়েছিল ফলহারিণী কালীপুজোর শুটিং-এর দিন? পুজোর মুহূর্তে তাঁর অভিব্যক্তি কেমন ছিল? সুমনবাবু সবটাই জানালেন খবর অনলাইনকে।

ঠাকুরের ষোড়শীপুজো মা সারদাকে

তবে সে বিষয়ে জানার আগে ঠাকুরের ষোড়শীপুজোর তাৎপর্য জানার প্রয়োজন রয়েছে। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের (১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ) জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় ফলহারিণী কালীপুজো। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব আজ জগন্মাতাকে পূজা করবেন বলে সমস্ত আয়োজন করেছেন। ওই আয়োজন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে না হয়ে গুপ্ত ভাবে হল। পুজোর সময় দেবীকে বসানোর বসার জন্য আলিম্পনভূষিত এক পীঠ পূজকের আসনের ডান দিকে স্থাপন করা হয়েছে। দেবীর রহস্যপূজার সকল আয়োজন করতে করতে প্রায় রাত ন’টা বেজে গেল। সারদাজননীকে পূজায় উপস্থিত থাকার জন্য রামকৃষ্ণদেব আগেই খবর পাঠিয়েছিলেন তাঁর কাছে।

শ্রীশ্রীমা সারদা উপস্থিত হলেন ঠাকুরের পূজার স্থানে এবং ঠাকুরও পূজায় বসলেন। এর পর ঠাকুর আলিম্পনভূষিত আসনে শ্রীমাকে বসতে বলেন। এর পর মন্ত্রপূত জল দিয়ে তিনি বারবার মাকে অভিষিক্ত করলেন। মন্ত্র বলার পর তিনি প্রার্থনা করলেন, “হে বালে, হে সর্বশক্তির অধিশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইহার শরীরমনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর!” এর পর ঠাকুর শ্রীমায়ের অঙ্গে মন্ত্রসকলের ন্যাস করে সাক্ষাৎ দেবীজ্ঞানে তাঁকে ষোড়শোপচারে পূজা ও ভোগ নিবেদন করেন। পুজোর সময় সারদাজননী সমাধিস্থা হন। ঠাকুরও অর্ধবাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে সমাধিস্থ হলেন। রাত্রি দ্বিপ্রহর অতিক্রান্ত হতে লাগল। ঠাকুর এ বার কিছুটা চেতনে ফিরে এলেন। বার বার তিনি তাঁর জপের মালা এবং আরও বহু সাধনার ফল শ্রীদেবীর পায়ে চিরকালের মতন অর্পণ করে তাঁকে প্রণাম করলেন –

মা সারদারূপী অর্পিতা মণ্ডলের সঙ্গে।

“হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্নকারিণি, হে শরণদায়িনি ত্রিনয়নি শিব-গেহিনি গৌরি, হে নারায়ণি, তোমাকে প্রণাম, তোমাকে প্রণাম করি।”

প্রসঙ্গত এই ভাবেই যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেব জ্যৈষ্ঠ মাসের ফলহারিণী কালীপুজোর দিন সারদা মাকে ষোড়শী রূপে পূজা করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পুজো ও সাধনফল গ্রহণ করে সারদাজননী মানবশরীরে মহাশক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন। তিনি সকলের মা, গুরুপত্নী নন, পাতানো মা নন, কথার কথা মা নন, তিনি সত্য জননী।

প্রকৃতপক্ষে শ্রীশ্রীমায়ের জীবনের রহস্যটি রামকৃষ্ণদেব জানতেন। শ্রীমাকে তাঁর স্বরূপ মনে করিয়ে দিয়ে এবং নিজের অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন মাত্র। ষোড়শী রূপে পুজো করে ঠাকুর শ্রীমাকে বিশ্বমাতার বেদিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শুধু প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই নয়, স্বামীজীর কথায় – “যাঁর আবির্ভাবে সমগ্র ভারতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল”।

সুমনের অভিনয়ে ঠাকুরের সেই লীলা

ঠাকুরের সেই লীলা অভিনয় করতে হয়েছিল সুমনকে। তবে একদিনেই শুটিং শেষ হয় বলে জানালেন অভিনেতা। ঠাকুর যেমন হলুদ বস্ত্র পরে পুজো করতে বসেছিলেন, ঠিক তেমনই সুমনকেও একটি হলুদ পট্টবস্ত্র পরানো হয়। পরিচালক তাঁকে বুঝিয়ে দেন পুরো বিষয়টি এবং তিনিও দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেন। আর জন্য তিনি ঠাকুরেরই শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

একটা বিষয় সুমনবাবুর থেকে জানা গেল। তিনি শুটিং চলাকালীন এবং শুটিং-এর বাইরেও প্রতিটি কলাকুশলীকে তাঁর চরিত্রের নামেই ডাকতেন। অভিনেতার স্মৃতিচারণায় উঠে এল, দিনটি ছিল মঙ্গলবার এবং তিনি পুজো করতে বসে মাকে একটি পদ্মের মালা পরিয়েছিলেন ও হাতে একটি পদ্মফুল দিয়েছিলেন।

প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদারূপী তিন অভিনেতা।

‘জগজ্জননী মা সারদা’ ধারাবাহিক শুরুর আগে নিজেকে ঠাকুরের চরিত্রে বসানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সুমনবাবু। সেই সময় নিয়মিত যেতেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে। তার ফলস্বরূপ পেয়েছিলেন বহু মানুষের শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা। সুমনবাবুর বিশ্বাস, সবটাই তাঁর ইচ্ছাতেই সম্ভব হয়েছিল। তিনি চেয়েছেন, তাই এমনটা হয়েছে।

ধারাবাহিক এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে দর্শকদের অনুরোধে আকাশ আট তার ‘জগজ্জননী মা সারদা’র টিম নিয়ে পৌঁছে যায় বিভিন্ন জেলায়। প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপচে পড়া ভিড় এবং ‘ঠাকুর’ বলে আপ্লুত প্রাণ যেন সুমনকে নতুন ভাবে ভাবতে সাহায্য করে। অভিনেতা বলেন, ৫৮টি স্টেজ অনুষ্ঠান করেছেন তাঁরা এবং অদ্ভূত ব্যাপার হল দর্শক আসনে সবাই নিস্তব্ধ থাকতেন। চুপচাপ শুনতেন ঠাকুরের সেই সব আশীর্বাণী সুমনের কণ্ঠে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.