দেশে চলছে স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব (Azadi Ka Amrit Mahotsav) উদ্‌যাপন। যাঁদের আত্ম বলিদানে ঔপনিবেশিক শাসনকে চূর্ণ করে স্বাধীনতা পেয়েছে দেশ, তাঁদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে ঘরে ঘরে উড়বে তেরঙা। ১৫ আগস্ট মানেই পাড়ায় পাড়ায় বাজবে তাঁর গান। নিজের সুরের জাদুতে শুধুমাত্র দেশবাসীর নয়, বিদেশের মাটিতেও ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছেন। আর কেউ নন, তিনি হলেন প্রয়াত সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar)।

এই তো ক’দিন আগেই (৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২) ৯২ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘ভারতের কোকিলকন্ঠী’। ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লতার জন্ম এক মরাঠি পরিবারে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান। তার আগে অবশ্য বাবার হাত ধরেই অভিনয় এবং গান শিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন। ১৩-১৪ বছর বয়সেই প্রথম বার সিনেমায় গান গাওয়া। মরাঠি ছবিতে। মুম্বই যাওয়ার পর ১৯৪৮ সালে প্রথম হিন্দি ছবিতে গান। ‘মজবুর’ ছবিতে। ছয় ও সাতের দশকে তাঁর গান জনপ্রিয়তার যে শিখর ছুঁয়েছিল, তা আজও অম্লান।

তাঁর কণ্ঠ আর জাতীয়তাবাদ

ভারত-চিন যুদ্ধে শহিদ হওয়া সেনাদের‌‌‌‌‌ পরিবারের জন্য তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠান। দিল্লির জাতীয় স্টেডিয়ামে লতা মঙ্গেশকর গাইছেন ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কি লোগো’ গানটি। তাঁর এই গান শুনে কেঁদেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্বয়ং। ভারত-চিন যুদ্ধের আবহে রচিত সেই গানই এখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আরেক সুর হয়ে উঠেছে। শুধু এই গান নয়, তাঁর কণ্ঠে আরও অনেক গানেই স্পষ্ট হয়ে ঝরেছে দেশাত্মবোধের মন্ত্র।

রেকর্ড সংখ্যক রেকর্ড

ভারতের ৩৬ টি আঞ্চলিক ভাষা ও বিদেশি ভাষাতেও গান গাওয়ার রেকর্ড একমাত্র তাঁরই। সাত দশকের দীর্ঘ কেরিয়ারে ত্রিশ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন তিনি। ২০০১ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান, ভারত রত্নে ভূষিত করা হয়েছে। এর আগে ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ’-এর মতো নাগরিক সম্মানও দেওয়া হয়েছে লতা মঙ্গেশকরকে। চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার দাদা সাহেব ফালকে দ্বারাও সম্মানিত হয়েছেন তিনি। গিনেস বুক অফ রেকর্ডসের ১৯৭৪ সালের সংস্করণ লতা মঙ্গেশকরকে সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।

প্রবীণ-নবীনে একাকার

সত্তরের দশকে যে সব গানকে লতাকণ্ঠ স্মরণীয় করে গিয়েছে, তার অধিকাংশই লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল এবং রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে। রাহুল দেব বর্মণের সুর করা প্রথম ও শেষ, দু’টি ছবির গানেই রয়েছে লতার কণ্ঠ। নব্বইয়ের দশকেও লতা পূর্ণপ্রভায় উপস্থিত। কাজ করেছেন আনন্দ-মিলিন্দ, যতীন-ললিত, অনু মালিক, উত্তম সিংহ থেকে এ আর রহমানের মতো সুরকারের সঙ্গে। এর পরেও লতা প্লে-ব্যাক করেছেন। লতার বাংলা গানের সংখ্যা দু’শো ছুঁইছুঁই। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, ভূপেন হাজরিকা, সুধীন দাশগুপ্ত, কিশোরকুমার প্রমুখের সুরে। তাঁকে দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করিয়েছিলেন হেমন্ত।

আলাদা মাত্রায় রোম্যান্টিকতা

রোম্যান্টিকতা ও প্রেমের গানকে আলাদা মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন কিশোর কুমার-লতা মঙ্গেশকর ৷ রাহুলদেব বর্মনের সুরে ঘর ছবির ‘আপ কী আঁখো মে কুছ…’ তারই একটি উদাহরণ ৷ তালিকা আরও লম্বা ৷ খৈয়ামের সুরে কভিকভি ছবির ‘তেরে চেহরে সে নজর নেহি হাঠতি’ এগুলির মধ্যে অন্যতম ৷ এ ছাড়াও ‘গাতা রাহে মেরা দিল’, ‘ভিগি ভিগি রাতো মে’, ‘তেরে মেরে মিলন কী ইয়ে ব়্যায়না’,’হাম দোনো দো প্রেমী’, ‘পান্না কী তামান্না হে কী..’ ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে কোয়ি’, ‘তুম আ গায়ে হো নূর আ গায়া হে’… এর মতো কালজয়ী শিল্পির কন্ঠে আজও অমর৷

এক অন্য নজির

ক্রিকেট জগতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ভারতীয় ক্রিকেট দল ১৯৮৩ সালে যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল তখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই-এর কাছে খেলোয়াড়দের পুরস্কার দেওয়ার মতো টাকাও ছিল না। তারপর লতাজি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন এবং সেখানে গেয়ে খেলোয়াড়দের জন্য পুরস্কারের অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, গানটির জন্য বিসিসিআই থেকে এক পয়সাও নেননি তিনি।

আরও পড়তে পারেন: 

লতা মঙ্গেশকর গাইছেন ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কি লোগো’, চোখে জল প্রধানমন্ত্রী নেহরুর, জানুন এই গানের ইতিহাস

…ঝান্ডা উঁচা রহে হমারা, দেশাত্মবোধের মন্ত্র-রচয়িতা শ্যামলাল গুপ্তকে ৮ বার জেলে পাঠায় ব্রিটিশ সরকার

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন