‘ছন্দবন্ধন’-এর একগুচ্ছ নিবেদনে আপ্লুত শ্রোতা-দর্শকরা

0
chhandobandhan
বিদ্যাসাগরের ২০২তম জন্মদিনে 'ছন্দবন্ধন'-এর নিবেদন।

পাপিয়া মিত্র  

ভৌগোলিক সীমারেখা মুছে বিশ্ব আমাদের বৈঠকখানায় আসন পেতেছে। সব কিছুর ভালোমন্দর দু’টো দিক থাকে। করোনা অতিমারি বর্তমান বিশ্বে যে ভাবে দামামা বাজিয়ে চলেছে গত দু’বছর ধরে, তাতে অনেক চোখের জলের মাঝে পাওয়ার আনন্দটুকু তৃতীয়ার চাঁদের মতো। প্রযুক্তিবিদ্যার সৌজন্যে ও একটি মুঠোফোনের দৌলতে এখন ‘দূর’ বাড়ির বারান্দায় এসে পড়েছে। তাই করোনা শুধু নেয়নি, দানের ডালিও খুব খারাপ নয়।

সেই ‘দূর’ অর্থাৎ পশ্চিম এশিয়ার বাহরাইনের মাত্র ছ’ মাস বয়সি সাংস্কৃতিক সংগঠন   ‘ছন্দবন্ধন’ ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি অন্তর্জালীন অনুষ্ঠান করে শ্রোতা ও দর্শকবন্ধুদের মনে দাগ কেটেছে। একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান দিয়ে সংগঠনের পথ চলা শুরু হলেও সম্প্রতি সেপ্টেম্বর মাসের অনুষ্ঠান খুবই সময়োপযোগী ছিল। শিক্ষক দিবস, সুচিত্রা মিত্রের জন্মদিন পালন, বিখ্যাত বাচিক শিল্পী গৌরী ঘোষের প্রয়াণসন্ধ্যা ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০২তম জন্মদিন পালন খুবই মর্যাদার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

ফিরে দেখতে গেলে নারীদিবস, শঙ্খ ঘোষ ও মিতা হকের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি, ২৫শে বৈশাখের দু’ দিন ব্যাপী ও ২২শে শ্রাবণের তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান, নজরুল, দ্বিজেন্দ্র-অতুলপ্রসাদ ও রজনীকান্ত সেনের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং যন্ত্রসংগীত দিবসও নিবেদন করে ‘ছন্দবন্ধন’ ফেসবুক লাইভে।

‘ছন্দবন্ধন’-এর ফেসবুক লাইভ যখনই শুরু হয় আবহসংগীত হিসাবে থাকে একটি রবীন্দ্রসংগীত। মৌমিতা ভট্টাচার্যের কণ্ঠে ‘অধরা মাধুরী, ধরেছি ছন্দবন্ধনে’। সংগীতের পাশাপাশি পর্দার দৃশ্যাবলি মনোমুগ্ধকর।

শিক্ষক দিবসের নিবেদন।

শিক্ষক দিবসে ‘ছন্দবন্ধন’ ফেসবুক লাইভে আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ থেকে সঞ্চিতা রাখী ও ভারত থেকে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী তৃষিত চৌধুরীকে। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় নিবেদিত হল একের পর এক গান। তৃষিতবাবু গাইলেন ‘প্রতিদিন তবে গাঁথা’, ‘বহে নিরন্তর অনন্ত’, ‘শুধু তোমার বাণী’, ‘ওদের সাথে মেলাও যারা চরায় তোমার ধেনু’-সহ কয়েকটি গান। পরিবর্তে  সঞ্চিতা গুরুদক্ষিণা দিলেন গানে গানে। শোনালেন, ‘সুরের গুরু’, ‘তুমি কেমন করে’, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’-সহ কয়েকটি গান। 

আবৃত্তিকার গৌরী ঘোষকে কথায়-কবিতায় শ্রদ্ধা জানান রুমকি গঙ্গোপাধ্যায়, দীপন সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রাণী মজুমদার। সঞ্চালনা করেন মলি দত্ত। আমাদের মাতৃসমা এমনই এক আটপৌরে বাচিকশিল্পী গৌরী ঘোষ। কপালে মাঝারি টিপ, চোখে কাজল, হাতখোঁপা, পরনে ঢাকাই শাড়ি। আবার কখনও বা চওড়া পাড়ের শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে যখন খুব সাবলীল ভাবে মঞ্চে দাঁড়াতেন তখন শ্রদ্ধায় স্বাভাবিক ভাবেই মাথা নিচু হয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে যেত প্রেক্ষাগৃহ।

রুমকি তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতাটি আবৃত্তি করে। দীপন সেনগুপ্ত জানিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। একটা সময় ছিল যখন ‘আকাশবাণী কলকাতা’ কণ্ঠস্বর এক মায়ার সৃষ্টি করতে। শাশুড়ি-মা ভোরে উঠে চা করে দিতেন। গৌরীদির ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’, ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’, ‘কচ দেবযানী’ শুনে শুনে বড়ো হয়ে ওঠা। ইন্দ্রাণী সুন্দর একটি কথা বলেছেন – কবি যদি নদী হয়, বাচিক সেই হাওয়া। মনে করেছেন সেই অনাড়ম্বর অথচ অমোঘ উচ্চারণকে। ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’-এ  ‘বৎস তোর জীবনের প্রথম প্রভাতে’, যেন সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বলছেন। এখানেই যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ শিল্পীর। শিল্পীদের পাশাপাশি সঞ্চালক মলি দত্ত যথার্থ কাজটি করে গেছেন।

গৌরী ঘোষের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

কিংবদন্তি শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের ৯৭তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায় ‘মুক্তধারা শিল্পী গোষ্ঠী’। নমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় কথায়-গানে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায় ‘মুক্তধারা’র সদস্যরা। সুচিত্রা মিত্রের কাছে দীর্ঘ বছর শিক্ষাগ্রহণ ও তাঁর কাছে পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া (দু’বার) কম কথা নয়। তাই ছাত্রীর নামধাম বেশ পরিচিত ছিল তাঁর কাছে। টুকরো টুকরো কথার জাল বুনতে বুনতে নমিতা এগিয়ে চললেন গানে গানে। শাশ্বতী বিশ্বাস, শ্রীময়ী ভৌমিক, লোপামুদ্রা মুখোপাধ্যায়, মিত্রা দত্তগুপ্তকে নিয়ে সহ নমিতা নিবেদন করলেন তাঁর প্রিয় গান ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’।

‘রবিতীর্থ’-এর প্রাক্তনী নমিতা জানান, শিক্ষাগ্রহণের শনিবার ও রবিবারের কথায়। শনিবার গান শিখিয়ে সুচিত্রাদি রবিবারে তার স্ক্যানিং করে আনতে বলতেন। সেই শিক্ষা এক পরম প্রাপ্তি। ফোর্থ ইয়ারে প্রথম শেখালেন ‘বিপুল তরঙ্গ রে’। শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণে সমবেত কণ্ঠে গীত হল। রেডিওর প্রোগ্রামের কথা উঠে এল। ছাত্র তৈরিতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন সুচিত্রাদি। গুণী ছাত্র-ছাত্রী ঠিক বের করে আনতেন। এই গুণটি সমমাত্রায় বিরাজিত ছাত্রীটির মধ্যে। 

সহশিল্পীদের নিয়ে নমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিবেদন।

শাশ্বতী বিশ্বাসের কণ্ঠে ‘সার্থক করো সাধন’, মিত্রা দত্তগুপ্তের কণ্ঠে ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’, লোপামুদ্রা ও নমিতার যুগলবন্দি ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ ছিল অপূর্ব নিবেদন। সুচিত্রা মিত্র ছিলেন আইপিটিএ-র সক্রিয় সদস্য। ষাটের দশকে চালের আকালে সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া গান জনতার স্লোগানে পরিণত হয়েছিল। মন্মথ ভট্টাচার্যের কথা ও অনল চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘আজ বাংলার বুকে দারুণ হাহাকার’ গান খুব নিপূণ ভাবে পরিবেশিত হল। ‘চণ্ডালিকা’ গীতিনাট্যে মা ও মেয়ের চরিত্রে লোপামুদ্রা ও নমিতা আর এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এখানে সংগীতাভিনয় অনবদ্য। পুজো দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই শারদলক্ষ্মীকে অভিবাদন করে গাওয়া হল ‘তোমার মোহন রূপে’। অনুষ্ঠান শেষ হয় ‘একটি নমস্কারে প্রভু’ দিয়ে। তবলায় সহযোগিতা করেছেন সব্যসাচী চন্দ্র। 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০২ জন্মদিন পালিত হল ‘ছন্দবন্ধন’-এর পেজ থেকে। সে দিন অতিথি ছিলেন ভাষাবিদ পবিত্র সরকার, সুমন্ত্র সেনগুপ্ত ও শুভ সরকার। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুজয় গোস্বামী। বিদ্যাসাগরের জীবন নিয়ে নানা কথার মালা গাঁথলেন পবিত্রবাবু। উনিশ শতকে তিনি যে কত বড়ো নেতা ছিলেন সেটা তিনি তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণঘরের সন্তান হয়েও তিনি সমাজসংস্কারের পথে হেঁটেছেন। ধর্ম নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা ছিল না। গ্রামীণ বালকটি পাঠশালায় পড়াকালীন বাংলা ভাষাকে ভালোবেসেছিল। একটু বড়ো হয়ে কলকাতায় চলে এল। সেই সময় কলকাতায় আসা মানে বিশ্বের নাগরিক হওয়া। তিনি নিজের জীবন নিজেই নির্মাণ করেছিলেন। দুর্জয় সাহস, পরিশ্রমের জেদ বালক থেকে যুবক হয়ে ওঠা মানুষটিকে একটা মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। মাত্র ২৩ বছরের যুবকটি কলকাতার এলিটদেরও এলিট মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহকারী হয়ে উঠলেন। যিনি ছিলেন সংস্কৃতি জগতের আধার। সংস্কৃত নিয়ে পড়াশোনা করলেও বাংলা লিখতেন চমৎকার। তিনি বুঝেছিলেন, সংস্কৃত ভাষা দিয়ে কোনো কাজ করে সাধারণ মানুষের পাশে পৌঁছোনো যাবে না। এর পাশাপাশি চাইলেন মানুষকে, ধর্ম বা ঈশ্বরকে নয়। সমাজের আর্থিক ভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষদের পাশাপাশি দেবেন্দ্রনাথদের মতো মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল বিদ্যাসাগরের। ধনী, গরিব, ইংরেজ, ডোম, মুচি , মেথর – সকলের সঙ্গেই মিশতেন। ডোম-মায়ের মাথার জটায় তেল মাখিয়ে চুল বেঁধে দেওয়ার অনন্য উদাহরণ সমাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। 

অনেকেই কোনো না কোনো সময়ে রাজার পোশাক ব্যবহার করেছেন। বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন অন্য পোশাকে সাধারণ মানুষের থেকে অনেক দূরে চলে যাবেন। তাই চাদর, ধুতি, চটিতেই স্বচ্ছন্দ রইলেন। এখানে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে এক মনোভাবের পরিচয় মেলে। সমাজ যাঁদের হেয় করে রাখতেন বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁদের কাছে সেই সময়ের একক বটবৃক্ষ।

নবীন প্রজন্মের তিন কবির তিনটি কবিতা পাঠ করেন সুমন্ত্র সেনগুপ্ত এবং শুভ সরকার পাঠ করেন শঙ্কর তালুকদারের ‘বিদ্যাসাগর’ কবিতাটি।

‘ছন্দবন্ধন’ পরিবারে যুক্ত আছেন বাহরাইনের মৌমিতা ভট্টাচার্য ছাড়া সুজয় গোস্বামী, শুভ সরকার, কানাডা থেকে মানালি ভট্টাচার্য ও ইউএসএ থেকে সফিক আহমেদ।

আরও পড়তে পারেন

রবিবারের পড়া: এক ভিন্ন আঙ্গিকে রবীন্দ্র-স্মরণ শিল্পী নমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন