আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সারা পৃথিবীকে মহাভারতের গল্প শোনাচ্ছেন প্রবাসী বাঙালি

0

কলকাতা: কথিত আছে, “মহাভারতের কথা অমৃত সমান”। আমেরিকায় বসে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই মহাভারতের কথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা সুদীপ্ত ভৌমিক। “দ্য স্টোরিজ অব মহাভারত” নামে এই পডকাস্টের রেকর্ডিং, সম্পাদনা, শব্দ সংযোজনা এবং সামগ্রিক প্রযোজনায় রয়েছেন ইজরায়েলি আভি জিভ। মহাভারতের সেই চিরন্তন কাহিনি, ইংরেজি ভাষায় গল্প বলার মত নাটকীয় পরিবেশনায় পর্বে পর্বে সম্প্রসারিত হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায়। আধুনিক প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই পডকাস্ট। আজ পর্যন্ত ছেচল্লিশটি পর্ব সম্প্রসারিত হয়েছে এবং আড়াই লক্ষের বেশি ডাউনলোড হয়েছে এই পডকাস্ট। ভারতে আইটিউন্স পডকাস্ট শিল্প সংস্কৃতি বিভাগে এখন এক নম্বরে “দ্য স্টোরিজ অব মহাভারত”।

আমেরিকার নিউ জার্সির ব্রিজওয়াটার শহর নিবাসী সুদীপ্ত ভৌমিক একজন প্রতিষ্ঠিত নাটককার, অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক। শ্রী শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, এবং শাঁওলী মিত্রর ছাত্র সুদীপ্তর নাটক একাধিক ভাষায় অনুদিত হয়ে মঞ্চস্থ হয়েছে আমেরিকা ও ভারতবর্ষের নানান শহরে। তিনটি নাটকের সংকলন ছাড়াও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সুদীপ্তর নাটক। একাধিক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত সুদীপ্ত আইআইটি খড়গপুর থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

“ইন্টারনেটের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এক দারুণ বিপ্লব এসেছে মিডিয়ার দুনিয়ায়, বললেন সুদীপ্ত। “মানুষ এককালে রেডিও শুনত, বেতার কেন্দ্র থেকে যা সম্প্রসারিত হত নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসারে। অর্থাৎ শনিবার দুপুর তিনটের নাটক যদি আপনি কোন কারণে মিস করেন, তাহলে অপেক্ষা করে থাকতে হবে পুনঃ প্রচারের জন্য। মানুষের এখন সে ধৈর্য নেই। তারা তাদের বিনোদন চান তৎক্ষণাৎ। ইন্টারনেট সেই সুযোগ করে দিয়েছে। এখন ইন্টারনেটের দৌলতে মানুষ তার পছন্দের গান শুনছেন, সিনেমা দেখছেন, নাটক শুনছেন – যখন খুশি, যেমন খুশি। ভৌগলিক সীমারেখা মুছে দিয়েছে এই প্রযুক্তি। পুরাকালে মহাভারত শ্রুতির মাধ্যমেই প্রচারিত হত। আমরাও তাই করছি, কেবল নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে।”


“মহাভারতের কালের চরিত্ররা যেমন সেই সময়ের সেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন, আমরা আমাদের সময়ের সেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি।” বললেন শব্দ প্রযুক্তিবিদ আভি জিভ। “উন্নত মানের শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি এখন সহজলভ্য। ফলে যথাযথ কল্পনাশক্তি এবং নিষ্ঠা থাকলে শব্দ নিয়ে অসাধারণ কাজ করা যেতে পারে। শ্রুতি নাটকের এ এক স্বর্ণ যুগ বলা যায়। মহাভারতের গল্পের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডিং, এডিটিং, শব্দ নিয়ন্ত্রক সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকি। সর্বাধুনিক কম্পিউটার এবং রেকর্ডিং হার্ডওয়্যার ব্যবহৃত হয়। নানান ধরনের শব্দ সংগ্রহ করা হয় – কিছু ইন্টারনেট থেকে, কিছু নিজেরা রেকর্ড করে। কল্পনার সাহায্যে গড়ে তোলার চেষ্টা করি সেই সময়ের শব্দ পটভূমি, সেই সময়ের আমেজ।  নিউজার্সির হোপওয়েল শহরের বাসিন্দা আভি জিভ পেশায় ওয়ারলেস কমিউনিকেশান ইঞ্জিনিয়ার হলেও নেশায় সঙ্গীত শিল্পী। নিজের রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে প্রায়শই শব্দ পরিকল্পনা ও সঙ্গীত নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষায় ব্যস্ত থাকেন আভি। মহাভারতের গল্প শ্রুতি নাটকে আভি তার সঙ্গীত চেতনা ও প্রযুক্তি ভাবনাকে সম্পূর্ণ ভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন।

শুধু ভারতীয় নয়, সুদীপ্ত-আভিরা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে চান এই মহাকাব্য। তাঁরা মনে করছেন, প্রবাসে বড়ো হয়ে উঠছে যে সমস্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ তরুণী, তাদের কাছে এই গল্প পৌঁছে দেবার এর চেয়ে ভাল মাধ্যম আর নেই। মহাভারতের গল্পের প্রতিটি পর্বের ইংরেজি নাট্যরূপ দেন সুদীপ্ত। “নাট্যরূপ দেবার সময় আমাকে খেয়াল রাখতে হয় গল্পের ভাষা যেন সমকালীন হয় এবং সহজ হয়। নানান বয়সের, নানান সমাজের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে এটা আবশ্যিক”, বললেন সুদীপ্ত।

এই পডকাস্ট মানুষকে যেভাবে নাড়া দিয়েছে, তা এক কথায় অভাবনীয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রোতারা তাদের মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন।

“আমি যদিও মহাভারত পড়েছি এবং দেখেছি, কিন্তু এই আকর্ষণীয় পডকাস্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রতিটি পর্বে বোঝা যায় কতটা নিষ্ঠা ও পরিশ্রম ঢেলেছে সুদীপ্ত এবং আভি। রোজ অফিস থেকে ফেরার পথে, এই পডকাস্ট আমার দৈনন্দিন সঙ্গী।” বলেছেন আধুনিক মহাভারতের এক শ্রোতা।

আমেরিকায় বড় হয়ে ওঠা ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক শ্রোতা বলেছেন, “ছোটবেলা থেকে মহাভারতের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হলেও, আমি কখনো এমন নাটকীয় এবং আবেগপূর্ণ পরিবেশনা শুনিনি। রোজ অফিস যাবার সময় এই গল্পগুলি দিয়ে আমার দিন শুরু হয়।”

এইরকম আরও অনেক মন্ত্যব্যে ভরে উঠেছে আই টিউন্স-এর পাতা। সুদীপ্ত বলেন, “সারা পৃথিবীর মানুষ – আমেরিকা, ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি, শুনছেন এই পডকাস্ট। মহাভারতের কাহিনীর সার্বজনীন আবেদন, দেশ কালের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যায় সব মানুষের কাছে। কারণ, মহাভারত মানুষের কাহিনী। তাই একমাত্র মহাভারতই পারে সব জাতি, সব ধর্ম, সব দেশের মানুষকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলতে। মানুষকে বুঝতে, তার বৈচিত্র্য, তার বিশ্বাসকে সম্মান করতে, সহিষ্ণু হতে শিক্ষা দেয় মহাভারত।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here