polar beer

ওয়েবডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একটা গোটা প্রাণীজাতি বিশ্ব থেকেই অবুলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তারা সুমেরু অঞ্চলের পোলার বিয়াররা। সঠিক পুষ্টি না পেয়ে এই জগৎ থেকেই মুছে যেতে পারে তারা। এমনই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পোলার বিয়ারদের পুষ্টির সম্পর্ক কোথায়? একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

বসন্তকাল পোলার বিয়ারদের শিকার করার প্রধান সময়। সুস্থ থাকার জন্য সারা দিনে যা পুষ্টি এই বিয়ারদের দরকার, সেটা শুনলে আপনার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যেতে পারে। একটি পোলার বিয়ারের দিনে ১২ হাজার কিলোক্যালোরি খাবার দরকার, অর্থাৎ একজন মানুষ সারা দিন যা খাবার খায়, তার ছ’ গুণ। পোলার বিয়ারদের পুষ্টির ব্যাপারে এতটাও ধারণা ছিল না বিজ্ঞানীদের। গত তিন বছরে, এই প্রাণীদের ওপরে কিছু সমীক্ষা করে তাদের খাবারের ব্যাপারে সঠিক ধারণায় আসা গিয়েছে।

২০১৪, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে আলাস্কার উত্তর উপকূলের বিউফোর্ট সাগরে ন’টা স্ত্রী পোলার বিয়ারের গতিবিধির ওপরে নজরে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। রক্ত এবং মুত্র নমুনা পরীক্ষা করার পাশাপাশি গতিবিধি নজর করার জন্য তাদের জিপিএস কলারও দেওয়া হয়েছিল। তাদের সব কর্মকাণ্ডই ধরা পড়েছিল ওই কলারে। সেখানে দেখা গিয়েছে, পোলার বিয়ারদের খাবারের ব্যাপারে এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যা জানতেন, তার থেকেও বেশি খাবার প্রয়োজন তাদের।

সুস্থ থাকার জন্য প্রতি দশ থেকে বারো দিন অন্তর একটা পূর্ণাঙ্গ সিল মাছ খেতে হয় তাদের। না হলে অন্তত উনিশটা শিশু সিল খেতে হয়। এই পরিমাণ খাবার খেতে না পারলে দ্রুত ওজন কমতে থাকে তাদের। যে ন’টা পোলার বিয়ারের গতিবিধি নজর করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে চার জনের দশ দিনে ৪৪ পাউন্ড বা প্রায় কুড়ি কিলো ওজন কমে গিয়েছিল, যা তাদের ওজনের দশ শতাংশ।

এখানে আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তা হলে জলবায়ু পরিবর্তন বা বরফ গলার সঙ্গে খাবার না পাওয়ার সম্পর্কটা কোথায়?

সুমেরু সাগরে জমে থাকা বরফের সাহায্যে পোলার বিয়াররা সিল মাছ ধরতে যেতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা যত বাড়ছে, তত তাড়াতাড়ি গলছে সুমেরুর বরফ। তাই আর মাছ ধরতে যেতে পারছে না পোলার বিয়াররা।

পোলার বিয়ারদের শিকারের পদ্ধতি অন্যদের থেকে আলাদা। তারা বসন্ত এবং গ্রীষ্মের শুরুতেই তাদের শিকারকাজ করে ফেলতে চায়। এই সময়েই সব থেকে বেশি পরিমাণ খাবার খেয়ে ফেলতে চায় তারা। এই সময়ে খাবার খেয়ে ফেললে সারা বছর খাবারের জন্য বিশেষ চিন্তা করতে হয় না তাদের। কিন্তু এই সময়ে বরফ যদি গলতে শুরু করে তা হলে একদিকে যেমন কম সিল ধরতে পারবে তারা, তেমনই সিল খোঁজার জন্য ওদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, যাতে তাদের কম পুষ্টির পাশাপাশি শক্তিক্ষয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস যে ভাবে নির্গত হচ্ছে তার ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পোলার বিয়ারের অবলুপ্তি ঘটে যেতে পারে এবং এই শতকের শেষেই তারা পৃথিবী থেকে পুরোপুরি মুছে যাবে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, পোলার বিয়ারদের অবলুপ্তি তারও আগে হতে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন ২০০৪ সালের তুলনায় ২০০৭-এ বিউফোর্ট সাগরের পোলার বিয়ারের জনসংখ্যা প্রায় চল্লিশ শতাংশ কমে গিয়েছে।

যদিও সম্প্রতি করা সমীক্ষাটি মাত্র ন’টা মহিলা পোলার বিয়ারের ওপরে করা হয়েছিল, বিজ্ঞানীদের মতে এতেই পোলার বিয়ারের পুরো জগতটার ব্যাপারে একটা ধারণা করা গিয়েছে। গবেষকদের মতে, মা পোলার বিয়ারদের পুষ্টি আরও বেশি দরকার হয় শিশুদের লালনপালন করার জন্য। এই ন’জনের মধ্যে কেউ মা ছিল না। সুতরাং তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি হতে বাধ্য। এই গবেষণা যে কুমেরু সাগরের অন্য প্রান্তে পোলার বিয়ারদের ওপরেও প্রযোজ্য সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানীদের এ বার লক্ষ্য, বরফ গলে যাওয়া কী ভাবে সরাসরি পোলার বিয়ারদের প্রভাবিত করছে, তার ওপর সম্পূর্ণ গবেষণা করা। একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা এখনই না মিটলে পৃথিবী থেকে অবলুপ্তি ঘটবে এই মেরু প্রাণীদের। এক বিজ্ঞানীর কথায়, “সারা বিশ্ব এখন কী অবস্থায় রয়েছে সে ব্যাপারে একটা বার্তা দিচ্ছে পোলার বিয়াররা। আমাদের এই দিকে নজর দিতেই হবে।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here