নয়াদিল্লি: বায়ুদূষণের যত চর্চা আমরা করি, সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন মোনো-অক্সাইডের নির্গত হওয়ার দিকেই আমাদের নজর বেশি থাকে। অ্যামোনিয়া গ্যাস নিয়ে খুব একটা চর্চা কেউ করে না, অথচ ভারতে দূষণের অন্যতম প্রধান উপকরণ এই অ্যামোনিয়া।

মজার ব্যাপার শহুরে অঞ্চল নয়, ভারতের গ্রামীণ এলাকা, বলা ভালো কৃষিজমিভিত্তিক এলাকাতে গ্রাস করেছে এই গ্যাস। কৃষি কাজে অনেক ক্ষেত্রে অ্যামোনিয়া-ভিত্তিক সার ব্যবহার করেন চাষিরা। সেখান থেকেই এই গ্যাস নির্গত হয়। পাশাপাশি পশুর বর্জ্য পদার্থ থেকেও এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের ২০১৪-এর একটি রিপোর্টে জানা গিয়েছে ভারতে প্রতি হেক্টরে ১৬৫ কেজি সার ব্যবহার করা হয়। স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর এই অ্যামোনিয়া গ্যাস। এক দিকে ফুসফুস এবং শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি যেমন করে তেমনি জলও দূষিত করে তোলে। এই জল পান করলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।

ভারতের পাশাপাশি এই অ্যামোনিয়া-দূষণের সমস্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং ইউরোপের কিছু দেশে। ২০০২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত অ্যামোনিয়া দূষণের মাত্রা কতটা বেড়েছে সে ব্যাপারে নাসার একটি বিশেষ ধরনের উপগ্রহ-চিত্রের সাহায্যে গবেষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণার নেতৃত্বে থাকা বিজ্ঞানী জুইং ওয়ার্নার বলেন,  “সারা বিশ্বে কৃষিজমির ওপরে অ্যামোনিয়া গ্যাসের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। নির্গত হওয়া অ্যামোনিয়ার সঙ্গে যদি কারখানা থেকে নির্গত দূষিত পদার্থ মিশে যায় তা হলে এরোসল নামক একটি পদার্থ তৈরি হয় যেটা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর।”

সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, “ইউরোপের কিছু দেশ ছাড়া অ্যামোনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর পাশাপাশি অবশিষ্ট ধান পড়ানোর ফলে অ্যামোনিয়া দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।” নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিনয় আনেজার মতে, মোট অ্যামোনিয়ার মাত্র তিরিশ শতাংশই চাষের কাজে লাগে বাকি সত্তর শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়।

আনেজার মতে, “পশুর বর্জ্য পদার্থ থেকে নির্গত অ্যামোনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সেটা ইউরোপে করা হয়, সার থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে সে ব্যাপারে গবেষণা চলছে।” তিনি আরও বলেন, “অ্যামোনিয়ায় যে অক্সাইড রয়েছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে, বাকিটা বাতাসে ভেসে যায়।” উল্লেখ্য, নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাসায়নিক গ্যাস অ্যামোনিয়া। আনেজা আরও বলেন, “নাইট্রোজেন হচ্ছে পরবর্তী কার্বন। কার্বনের ফলে শিল্প বিপ্লব হয়েছিল, নাইট্রোজেনের ফলে হল কৃষি বিপ্লব। কিন্তু এই নাইট্রোজেনের ব্যবহার যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তা হলে এমন সমস্যা হবে যা কার্বনের অতি ব্যবহারের ফলে হয়েছিল।”

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জানা গিয়েছে যে ভারত এবং চিনে অ্যামোনিয়া-দূষণ মূলত কৃষিকাজ এবং পশুর বর্জ্য থেকেই ছড়ায়, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে এই দূষণ ছড়ায় মূলত ‘অ্যাসিড রেন’ আটকানোর পন্থা থেকে।

অ্যামোনিয়া দূষণে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মেরিল্যান্ডের গবেষণায় জানা গিয়েছে বিশ্বের অন্য প্রান্তের তুলনায় ভারতে অ্যামোনিয়া নির্গত হওয়ার হার কমই। এই ব্যাপারটা কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক। নয়াদিল্লির ‘সেন্টার ফর সায়ান্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এর অধ্যাপক চন্দ্র ভূষণের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত হওয়া সালফার ডাইঅক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইডের সঙ্গে মিশে যায় অ্যামোনিয়া। এর ফলে তৈরি হয় ধোঁয়াশা, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর।

তিনি আরও বলেন, “পঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের মধ্যে অবস্থিত হওয়ার ফলে দিল্লির দূষণের জন্য কিছুটা দায়ী করা যায় এই সব রাজ্য থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া গ্যাসকেও।”

অ্যামোনিয়া গ্যাসের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যে সংস্থাটি লড়ছে সেই ইন্ডিয়ান নাইট্রোজেন গ্রুপের প্রধান যশ আবরলের মতে, এই মুহূর্তে অ্যামোনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো নীতি নেই ভারতের। এই রকম কোনো নীতি যাতে তৈরি করা যায় সে ব্যাপারে চেষ্টা চালাচ্ছে এই সংস্থাটি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here