kaththokra
কাঠঠোকরা।
তপন মল্লিক চৌধুরী

কলকাতা আর তার আশেপাশের আকাশ থেকে ৬০টিরও বেশি প্রজাতির পাখি উধাও হয়ে গিয়েছে। রাক্ষুসে কাক, বড়ো হাড়গিলে, রেড ব্রেস্টেড ম্যারগান সার, রাজহাঁস, কালো ঈগল, ফিয়ার, সাকসাল, বালিহাঁস এদের মধ্যে অন্যতম।

কলকাতার ‘ঝাড়ুদার’ নামে পরিচিত, পুরসভার প্রথম প্রতীক বড়ো হাড়গিলে কি আর দেখতে পান? নোংরা-আবর্জনা খেয়ে শহর পরিষ্কার রাখাই ছিল এদের কাজ। আকাশচুম্বি অট্টালিকার জন্য চলাফেরায় বাধা পেয়ে ফি বছর কমতির দিকে শীতের অতিথিরা। আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রতি বছর কমছে তাদের সংখ্যা। পাকা খেজুর আর রসের লোভে বছরের বেশ কয়েক মাস ফিঙে, বুলবুলি, বাঁশপাতি, গাংশালিক-সহ আরও কত পাখি ওড়াউড়ি করত। খাবার হিসাবে ওদের পেটে ঢুকত  রসের টানে আসা মৌমাছি, বোলতা, ভীমরুল, পিঁপড়ে প্রভৃতি পোকামাকড়। টালি-ভাটা আর কুয়ো তৈরির চারি পোড়াতে খেজুর গাছ সাফ হয়ে গিয়েছে কলকাতা ও শহরতলি থেকে। পাখিদের খাবারে পড়েছে টান। খাবার আর আশ্রয় এই দু’য়ের ভরসা বট অশ্বত্থ, পিপুল, ডুমুর। সকাল থেকে সন্ধে, কত রকমের পাখি আনাগোনা করত ওই সব গাছে। কোকিল, ফটিকজল, রামগঙ্গা, কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরি, গাংশালিক, দেশি পাওয়ে, কানাকুয়ো, হরিয়াল, ঘুঘু খাবারের জন্যই এই সব গাছের ডালে এস বসত। দন্ডচারী বর্গসহ অন্য বহু জাতের পাখিদের খাদ্যের প্রধান ভরসা হল বাংলার এই উদ্ভিদকুল।

dahuk
ডাহুক।

কলকাতাতেই এক সময় ছিল প্রচুর আমগাছ। ডালে লাল পিঁপড়ে, কাঠ পিঁপড়ে, পোষকপোকা, শ্যামাপোকা, লেদাপোকা, খেতে দিনের বেলা কত রকম পাখি ডালের উপর ওৎ পেতে বসে থাকত। কেবল গাছ কাটা নয়, বিষ তেল স্প্রে করে বন্ধু-শত্রু সব পোকাই তো নিধন করা হয়েছে, পাখিরাও উধাও হয়ে গিয়েছে খাবারের অভাবে। গাছের পাকা পেঁপে, পেয়ারা খেতে কত ধরনের পাখি উড়ে আসত মধ্যবিত্তের এক চিলতে বাগানে। এখন মধ্যবিত্ত আর পেপে-পেয়ারা বাগান করে না। তার জায়গায় দখল নিয়েছে শৌখিন বাহারি গাছ। আর যাঁরাও বা করেন তাঁরাও স্বার্থপর, কাঁচা থাকতেই ফল পেড়ে চালের ড্রামে কিংবা কার্বাইডে পাকিয়ে নেন। পাখিরাই বা এই নিষ্ঠুরতা কী ভাবে সহ্য করবে! আকাশশেওড়ার পাকা ফল বড়ো প্রিয় বুলবুলি, সাহেব বুলবুলি জাতের পাখিদের। এখন কি আর সে সব গাছ আছে? পাখিরাও নেই। ব্যাপক হারে কীটনাশকের ব্যবহার পাখিদের জীবনে ডেকে নিয়ে এসেছে গভীর সংকট। এক দিকে পোকামাকড় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় যেমন খাবার-দাবারের অভাব ঘটিয়েছে, অন্য দিকে কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়ায় বহুপাখির ডিমের খোসা এত পাতলা হয়ে গেল যে তা দিতে গেলেই ডিম ভেঙে যায়। পাখির বংশবিস্তারেই ঘটল ব্যাঘাত।

শহর কলকাতা ও আশপাশের ঝিল-বিল-নালা-নর্দমা অধিকাংশ মজে গিয়েছে। যেগুলো বেঁচে আছে সেগুলোর সংস্কার হয় না ঠিকমতো। মাছের সংখ্যাও কমেছে দারুণ হারে। বর্ষায় জল জমলে এত বেশি সংখ্যক মাছ আমরাই ধরে নিই যে পাখিদের ভাগ্যে কিছু জোটে না। এ শহরে তাদের বেঁচে থাকাটাই দায়। কোঁচবক, গোবক, ছোট করচে বক, পানকৌড়ি, ডাহুক, মাছরাঙা, জলপিপি, বাটান, কাদাখোঁচা, পানপায়রা প্রভৃতি জাতের দলচারী পাখির জীবনযাপন সংকটের মুখে। কাদাশামুকখোল, গগনবেড়, সারস, কাস্তেচোরা প্রমুখদের আর দেখা মেলে না।  যে দু-চার প্রজাতির পাখি চোখে পড়ছে সেগুলিও খুব তাড়াতাড়ি উধাও হয়ে যাবে।

machhranga
মাছরাঙা।

প্রোমোটারদের সৌজন্যে কলকাতা ও তার আশাপাশে ভাঙা পাঁচিল, পোড়োবাড়ি, পুরোনো কড়িবরগা-কার্নিশযুক্ত বাড়ি এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর সেই জন্যই গোলপায়রা, আলবিল, পেঁচা, ঘুঘু, ঝুটশালিক, দেশি পাওয়ে, দোয়েল সহজে চোখে পড়ে না। শহরে বাসা তৈরির পছন্দসই জায়গা হারিয়ে যাওয়ায় ওই সব পাখির জীবন-সংকট চরমে পৌঁছে যায়। এ কথা মানতেই হবে যে আগের মতো শালিক-চড়ুই আর চোখে পড়ে না। কেবলমাত্র কলকাতা বা আশপাশ কেন, শহরতলি এমনকি জেলাশহর থেকে যে হারে বনভূমি উচ্ছেদ, জলাভূমি বোঁজানো, গাছকাটা পড়ছে তার চেয়ে ঢের গুণ বেশি বেড়েছে মানুষ, ঘরবাড়ি, হাটবাজার, যানবাহন, আলোর তাণ্ডব, শব্দবিভীষিকা। নির্জনতা না থাকায়, নিরাপত্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায়, খাবারের সংকট দেখা দেওয়ায় প্রথমে সংখ্যায় কমতে থাকে পাখি, তার পর একদিন লোপ পেয়ে যায়। এ ভাবেই কলকাতা ও তার আশপাশ থেকে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে কমপক্ষে ৬০ প্রজাতির পাখি। অথচ বছর কুড়ি আগেও এই শহর আর তার আশপাশে ছিল ২০৮টি প্রজাতির পাখি, এমনই হিসেব বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থার। পূর্ব কলকাতার লবণ হ্রদ এলাকায় প্রায় ৮০টি প্রজাতির পরিযায়ী সমেত ২৮৪ প্রজাতির পাখির আনাগোনা ছিল তিরিশ বছর আগেও, জানাচ্ছে পরিবেশ প্রেমী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘প্রকৃতি সংসদ’। প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি হারিয়ে যাচ্ছে কলকাতা থেকে, অথচ আমরা আশ্চর্য রকম ভাবে উদাসীন, কোনো হেলদোল নেই আমাদের মানসিকতায়। আমরা নির্লিপ্ত, উন্নাসিক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here