মৃণাল মাহাত

ছিল ঠাকুর, এখন শত্রু।
পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম এলাকার অবস্থাটা খানিকটা এইরকমই।
এই প্রতিবেদক ছোটোবেলায় দেখেছেন, নব্বই এর দশকে হাতি সারাবছরে দুই থেকে তিনবার আসত।ধানপাকার সময়ে মূলত বেশি দেখা যেত। তাই ওই সময় হাতি ঢুকলেই এলাকায় একটা উৎসব লেগে যেত। ছেলে বুড়ো হাতি তাড়াতে যেতেন উৎসবের মত করে। গ্রামের মেয়ে  বউরা শাখ বাজিয়ে অভ্যর্থনা জানাতেন হাতি ঠাকুরের পালকে। তাদের বিশ্বাস ছিল, হাতির আগমনে খুব একটা ক্ষতি হবে না ফসলের। যতটা ফসল নষ্ট করবে, তার বহুগুন ফিরিয়ে দেবে ঠাকুর।
আর আজ?  জঙ্গলমহল এলাকার চাষিদের কাছে অন্যতম প্রধান শত্রু হাতি। আগে তিনবার আসত, এখন বছরে তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বার আসে। সেদিনকার ভক্তি আজ আতঙ্ক, বিভীষিকায় রূপান্তরিত। হাজার হাজার একরের ফসল নষ্ট করে ফেলছে নিমেষে। চাষিদের তিনচার মাসের পরিশ্রম মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন এলাকায় হাতি ঢুকলেই একটা সাজসাজ রব পড়ে যায়। বাস্তবিকই একটা রণসাজ বলা চলে। গ্রামের ইয়ং ব্রিগেড হুলা, পোড়া মবিল,সার্চলাইট, ভেঁপু বাশি, ছোটো ছোটো ত্রিশুল নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকে। কোনো মতেই মাঠে নামতে দেওয়া যাবে না। এর ফলে হাতি মানুষের সংঘাত বাড়ছে। বাড়ছে হাতির আক্রমণে প্রানহানির সংখ্যা। প্রায়দিনই মৃত্যুর খবর আসছে। বাড়ছে ‘ মানুষ ও পশুর’ সংঘাত। বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। কিন্তু কেন?
শালবনি ব্লকের বাসিন্দা তরুণ রেঞ্জার বিনয় মাহাত বলেন, দক্ষিণবঙ্গ মূলত বন্য হাতিদের স্বাভাবিক বাসস্থান নয়। এরা ‘মাইগ্রেটারি’। দলমা থেকেই হাতিরা আসা যাওয়া করে দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহল নামক এলাকায়। আগে দু একবার আসত,  আবার ফিরে যেত দলমা পাহাড়ে। কিন্তু, গত দু দশকে ঝাড়খণ্ডের দলমার সংলগ্ন এলাকায় দ্রুত গতিতে শিল্পায়ন হয়েছে, এখনও হচ্ছে। হয়েছে নতুন নতুন খনি। এর ফলে হাতির বাসস্থানে কোপ পড়েছে। বনভূমির পরিমাণ প্রচুর পরিমাণে কমে গেছে। খাবার নেই। অন্যদিকে জঙ্গলমহলের এই এলাকায় কৃষিকাজের পরিমাণ খুব বেড়েছে। সারাবছরই কিছু না কিছু ফসল থাকছে মাঠে। এর ফলে হাতির দল স্বাভাবিক ভাবেই আর দলমায় ফিরে যেতে চাইছে না।কারণ সেখানে না আছে পর্যাপ্ত খাবার, না আছে শান্তিতে বসবাস করার পরিবেশ।
মেদিনীপুরের বিশিষ্ট ওয়াইল্ড ফটোগ্রাফার রাকেশ সিংহ দেব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ম্যান-অ্যানিম্যাল সংঘাত খুবই উদ্বেগজনক।হাতি সমস্যা মোকাবিলা প্রশাসন,বন দফতর ও সাধারণ মানুষের কাছে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৬-৮৭ সাল থেকে দক্ষিণবঙ্গে হাতিদের আসাযাওয়া শুরু। হাতিরা মূলত দলমা থেকে ঝাড়গ্রাম ডিভিসন এর নয়াগ্রাম ব্লক দিয়ে দক্ষিণবঙ্গে ঢোকে। সেখান থেকে খড়গপুর, মেদিনীপুর, রূপনারায়ণ,পাঞ্চেত ডিভিসন হয়ে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার দিকে চলে যায়। প্রায় তিনশটির মত গ্রাম এখন হাতি উপদ্রুত। রাকেশবাবু বলেন, সম্প্রতি হাতি যাতায়াতের পথে ওড়িশা সরকার ইলেকট্রিক বেড়া দেওয়ায় হাতিরা আর দলমায় ফিরে যেতে পারছে না। এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরও ভাবা উচিত।
হাতি মোকাবিলার জন্য বন দফতর কী ভাবছে?


বন দফতর সূত্রে জানা গেছে, হাতিকে জঙ্গলে আটকে রাখার জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাতিদের বসবাসের জন্য বেলপাহাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে ময়ূরঝর্না প্রকল্প। যদিও হাতি সেখানে থাকতেই চায়না। অতীতে জঙ্গল সংলগ্ন গ্রামগুলিতে বনদফতরের পক্ষ থেকে ইলেকট্রিক বেড়া দেওয়া হয়, যাতে ছেঁকা খেয়ে হাতি আবার বনে ফিরে আসে, কিন্তু ইলেকট্রিক শক খেয়ে বেশ কয়েকটি হাতি মারা যাওয়ায় এই প্রকল্পও ব্যর্থ হয়। পরবর্তীকালে বনের মধ্যেই হাতিদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে বাঁশ এর মতো কয়েক প্রকার কাঁটা জাতীয় গাছ রোপন করা হয়। কিন্তু এতদসত্বেও গ্রামগুলিতে হাতিদের অনুপ্রবেশ আটকানো যায়নি।শস্য ও জীবনহানি চলছেই। বর্তমানে বনদফতর হুলা বানানোর সরঞ্জাম, পোড়া মবিল, চকোলেট বোম দিয়ে সাহায্য করছে, যাতে গ্রামবাসীরা হাতি তাড়াতে পারেন। দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে হুলা পাটিও নিয়োগ করা হয়েছে প্রতিটি রেঞ্জ এলাকায়। কিন্তু আসল সমস্যা কাটছে না কিছুতেই। গ্রামবাসীদের অভিযোগ ফসল নষ্ট করলে বনদফতর থেকে যে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়, তা ক্ষতির তুলনায় খুবই নগন্য। ঠিক সময়েও পাওয়া যায় না।


মোটকথা বনদফতর থেকে ২০১০-১১ সালে সমীক্ষা করে যে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল, সেখানে বলা ছিল এক দশকের মধ্যে জঙ্গলমহল স্থায়ীভাবে হাতির এলাকায়  পরিণত হবে। আর দলমায় ফিরে যাবে না। সেই সময় আসার আগে থেকেই জঙ্গলমহল পুরোদস্তুর হাতিজোনে পরিণত হয়েছে। তাহলে সুন্দরবনের বাঘের মতোই কি হাতিকে নিয়ে বসবাস করতে হবে এলাকার মানুষকে। সেই আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে জঙ্গলমহলের আকাশে।

ছবি: লেখক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন