ম্যানগ্রোভ রোপণের পাশাপাশি গাছ কাটা আটকাতে আরও সচেষ্ট হোক প্রশাসন, চাইছে সুন্দরবন

    আরও পড়ুন

    উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুন্দরবন: ১৪ জুলাই বনমহোৎসব পালন করা হবে অন্য বছরের মতো এ বছরেও। তবে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ বসানোর পাশাপাশি সেগুলোকে রক্ষা করতে না পারলে সুন্দরবন শেষ হয়ে যাবে। শুধু ঘূর্ণিঝড় নয়, অরণ্য কেটে মাছের ভেড়ি তৈরি এবং বেলাগাম বনসম্পদ পাচারে বিপন্নতা বেড়েছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের। এমনটাই মনে করছেন সুন্দরবনবাসীদের একাংশ এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

    একাংশের অভিযোগ, বাণিজ্যিক কারণে অরণ্য ধ্বংস করা এবং পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ না হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। আয়লা, উম্পুন, বুলবুল, ইয়াসের জেরে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভের বড়োসড়ো ক্ষতি হয়ে গেছে বলে আশঙ্কা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনেরও। উদ্বিগ্ন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

    Loading videos...

    গত বছর উম্পুনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল অরণ্যের। ক্ষতপূরণে বনসৃজনের উদ্যোগী হয় প্রশাসন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে পাঁচ কোটি ম্যানগ্রোভ লাগানো হয়েছে। ওই কাজ হয়েছে বন দফতরের সহযোগিতায় ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের মধ্যে দিয়ে। এ বারের ইয়াস পরবর্তী পর্যায়ে ৫ কোটি ম‍্যানগ্ৰোভ লাগানোর উদ্দেশ্য জোর কদমে কাজ করছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা বণবিভাগ। ইতিমধ্যে ১৩টি নার্সারির মাধ্যমে গাছ তৈরি এবং সমস্ত প্ল্যানটেশন এরিয়ায় মাটি কাটার কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে জানালেন জেলা বন আধিকারিক (ডিএফও) মিলন মণ্ডল।

    - Advertisement -

    এক দিকে সরকারি উদ্যোগে সুন্দরবনকে বাঁচাতে ম্যানগ্রোভের চারা তৈরি করে বসানো হচ্ছে সুন্দরবনে, অন্য দিকে একদল অসাধু মানুষ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবাধে ম্যানগ্রোভ কেটে অরণ্য ধ্বংস করে মেছোভেড়ি, হোটেল, নার্সিং হোম তৈরি করে চলেছেন বলে অভিযোগ। আর এই ধরনের সংবাদ প্রকাশ্যে এলে প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না বলে অভিযোগ অরণ্যবাসীর।

    তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রশাসনের আধিকারিকদের একাংশও। জানা যায়,ইয়াসের পরে কুলতলির দেউলবাড়ি দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কাঁটামারি কাঠমিলের কাছে ম্যানগ্রোভ কেটে রীতিমতো বিম দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়। একই ভাবে কুলতলির মেরিগঞ্জ- ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ম্যানগ্রোভ কেটে নার্সিংহোম তৈরি করা হচ্ছে। মেরীগঞ্জ ১, মৈপীঠ, গুড়গুড়িয়া-সহ কুলতলির একাধিক জায়গায় ম্যানগ্রোভ কেটে মাছের ভেড়ি বানানোর অভিযোগ রয়েছে। একই রকম ভাবে রায়দিঘির নগেন্দ্রপুর, কঙ্কনদিঘি-সহ বহু গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ম্যানগ্রোভ কেটে মাছের ভেড়ি বানানো হচ্ছে। বাসন্তীর ভরতগড়, আনন্দাবাদ ও ভাঙনখালি এলাকায় ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে তৈরি হয়েছে বেআইনি মেছোভেড়ি।

    [ম্যানগ্রোভ নিধন করে পাকাবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ। ফাইল ছবি]

    পুলিশ ও প্রশাসন অনেক জায়গায় খবর পেয়ে বেআইনি মেছোভেড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর পরেও থেমে নেই এই বৃক্ষনিধন, দাবি সুন্দর বনবাসীর একাংশের। সম্প্রতি রায়দিঘি, বাসন্তী, ভরতগড়, আনন্দাবাদ, ভাঙনখালি, কুলতলি, মৈপীঠ, ঠাকুরান, বনি ক্যাম্প,মেরিগঞ্জ, ভুবনেশ্বরী ও মাতলা নদীর চরে ম্যানগ্রোভ কেটে বেআইনি ভাবে মেছোভেড়ি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অনেক জায়গায় গাছ কেটে কাট ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় আবার অরণ্য কেটে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে।

    জেলা বন আধিকারিক বলেন, জেলার বিভিন্ন ব্লক মিলিয়ে ইতিমধ্যেই ৫ কোটি ম্যানগ্রোভ লাগানো হয়েছে। তার ছবি-সহ তথ্যপ্রমাণ আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছি। আর এ বারেও লাগানোর কাজ চলছে।

    রাজ্যের প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “আমার বাড়ি সুন্দরবনের নদী তীরবর্তী রায়দিঘির কুমড়োপাড়া এলাকায়। কোথাও ম্যানগ্রোভের ছিটেফোঁটাও লাগানো হয়নি। সবটাই স্রেফ প্রচার। প্রতিনিয়ত ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করা হচ্ছে। মানুষ যেমন সচেতন নন, তেমন প্রশাসনও নির্বিকার। আমি একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি”।

    রাজ্যের বর্তমান সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী বঙ্কিম চন্দ্র হাজরা বলেন, “সুন্দরবন ধ্বংস করে মেছো ভেড়ি বানানো কখনোই বরদাস্ত করা হবে না। আর ম্যানগ্রোভ বসানো নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে”।

    ডিএফও মিলন মণ্ডল বলেন, জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখছে। যেখানে ম্যানগ্রোভ নষ্ট হয়েছে, সেই সব জায়গায় আবার নতুন করে গাছ লাগানো হবে। আগামী তিন বছরের জন্য রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ধরা আছে।

    ১৯৯১ কোস্টাল রেগুলেশন আইন অনুযায়ী নদী তীরবর্তী এলাকায় হোটেল ও রিসর্ট তৈরি নিষিদ্ধ। কিন্তু তা না মেনেই সুন্দরবন ধ্বংস করেই চলছে এই সব। তাই বন মহোৎসবের পাশাপাশি সুন্দরবনকে বাঁচাতে সরকারের আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন বনপ্রেমী মানুষজন।

    আরও পড়তে পারেন: ২০৩০-এ পৃথিবীতে ভয়াবহ বন্যার কারণ হবে চাঁদ, জানাল নাসা

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

    - Advertisement -

    আপডেট খবর