সন্তোষ সেন ও বঙ্কিম দত্ত

দিনটা ছিল ২৫ মার্চ, শুক্রবার। বিকেল চারটায় নৈহাটি সেন্ট লুকস স্কুলের সামনে মিলিত হয়ে স্কুলপড়ুয়া, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকশিক্ষিকাদের নিয়ে প্রায় ৮০ জনের এক বর্ণাঢ্য পদযাত্রা চলল অরবিন্দ রোড ধরে মহাকালীতলা মন্দির প্রাঙ্গণ পর্যন্ত। মহাকালীতলায় জমায়েত চলে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত।

প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা অবস্থানে কবি সুনীতি মুখোপাধ্যায়ের পরিবেশ বিষয়ক একটি অনবদ্য কবিতা পাঠ করলেন শিল্পবিতান সংস্থার মহুয়া ঘোষ। ‘জুভেনাইল অ্যাসোসিয়েশন’-এর শিল্পীরা দু’টো মনোজ্ঞ গান পরিবেশন করেন। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে বিদ্যালয়ে পাঠরত চার চিত্রশিল্পী তাদের শিক্ষক নিরুপম ঘোষের তত্ত্বাবধানে পরিবেশের ওপর চারটি অনুপম ছবি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে নিপুণ ভঙ্গিমায়।

আজকের সময়ের এটাই দাবি – বিপর্যস্ত প্রকৃতি-পরিবেশ মেরামতির আওয়াজ তুলে পথে নামতে হবে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের তাঁদের শিল্প-সাহিত্য, গান, কবিতার ডালি সাজিয়ে। আজকের দিনের নাটকের বিষয় হয়ে উঠুক আমাদের ও পরবর্তী প্রজন্মকে এক সুস্থ সুন্দর নির্মল পরিবেশ উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার। ছোটোরা গান গাইবে, গিটার ও বাদ্যযন্ত্রে তুলবে সুর। তাদের লেখনী গর্জে উঠবে বেঁচে থাকার দাবিতে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বক্তৃতা করেন ‘পরিপ্রশ্ন’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক অরূপ ঘোষ, এফএফএফ (FFF, Fridays For Future) নৈহাটির পক্ষ থেকে ছাত্রবন্ধু কৌস্তভ বসু, অধ্যাপিকা ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী নৌসন বাবাখান, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক ত্রিদীপ দস্তিদার, ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক রুমেলা দেব এবং গণবিজ্ঞান আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব ও পরিপ্রশ্নের প্রধান সম্পাদক বঙ্কিম দত্ত।

নৈহাটির এই সফল অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় ২৭ মার্চ রবিবার কল্যাণী মেন স্টেশনের উল্টো দিকে পথসভা ও জমায়েতের আয়োজন করা হয় বিকেল পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। এই পথসভায় কল্যাণীর আলাইপুর গ্রামের ‘প্রচেষ্টা কোচিং সেন্টার’-এর ১৫ জন ছাত্রছাত্রী তাদের হাতে লেখা পোস্টার নিয়ে হাজির ছিল। ছাত্রীরা মাত্র দু’ দিনের অনুশীলনে তিনটি গান সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করে। তার মধ্যে কবি বিপুল চক্রবর্তীর লেখা ও তাপস মৌলিকের সুর দেওয়া গান – “গায়ে গায়ে থাকা হোক/ পায়ে পায়ে থাকা হোক/ আর-বার, চলো খুঁজি, প্রিয় পৃথিবীকে” বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। পরিবেশকে সুস্থ রাখার দাবিতে তিন জন ছাত্র মিলে তিনটি কবিতা নিপুণ ভাবে উপস্থাপনা করে। কবি সুনীতি মুখোপাধ্যায়ের কবিতা “ও মানুষ শোনো” প্রাঞ্জল ভাবে পরিবেশন করেন বাচিকশিল্পী অসীমা রায় এবং পরিবেশ বিষয়ক আরও একটি কবিতা সাবলীল ও সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেন বাচিকশিল্পী ইলা চট্টোপাধ্যায়।

এই জমায়েতে প্রারম্ভিক বক্তৃতা করেন বিজ্ঞান শিক্ষক ও পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সন্তোষ সেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঝে মাঝে বক্তব্য রাখেন শিক্ষক ও সমাজকর্মী সুদীপ রায়, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জগদীশ মণ্ডল, ছাত্রদের পক্ষ থেকে কৌস্তভ বসু ও সৃজন সেন এবং ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক শুভ্রদীপ অধিকারী। দু’টি অনুষ্ঠানেই সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সন্তোষ সেন।

নৈহাটি ও কল্যাণীতে এ বারের অনুষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে ছিল বিগত তিরিশ বছর ধরে বিজ্ঞান ও পরিবেশ নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে কাজ করে যাওয়া  নৈহাটি ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড কালচার (NISC), নৈহাটি জুভেনাইল অ্যাসোসিয়েশন ও ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার (নৈহাটি চ্যাপ্টার)।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগের বিগত দু’ বছর ধরে পথ চলায় পা মিলিয়েছেন নৈহাটি-হালিশহর-কল্যাণীর বেশ কয়েকটি বিজ্ঞান ও সামাজিক সংগঠন। গঙ্গার ও-পার থেকে সাড়া দিয়েছেন চিনসুরা সায়েন্স ক্লাব। ব্যক্তিগত স্তরেও অনেকে এগিয়ে এসেছেন। আমরা আশা রাখি, পথ চলতে চলতে আগামী দিনে আরও অনেক সংগঠন ও ব্যক্তি এই উদ্যোগে শামিল হবেন।

বিশ্ব জুড়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের নানা দিক, প্রকৃতি-পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও পুনরুৎপাদনের যে দাবি আন্তর্জাতিক স্তরেই সরবে ধ্বনিত হচ্ছে, বিশেষ করে সারা পৃথিবীব্যাপী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এগিয়ে আসছে সামনের সারিতে, বড়োরা অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিতর্ক নিয়েও এই আন্দোলনে শামিল হচ্ছেন, নৈহাটি ও কল্যাণীতে বিভিন্ন বক্তা এই বিষয়গুলোকেই জোরের সঙ্গে সামনে আনেন। তাঁদের বক্তব্যের মূল নির্যাস সংক্ষেপে তুলে দিলাম।

আজ যা কিছু নির্মাণ করা হচ্ছে – সে রাস্তা থেকে সেতু, আবাসন থেকে হাসপাতাল, সব কিছুই ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ড’ এই ছাপ লাগিয়ে হাজির আমাদের সামনে। কারখানা স্থাপন হোক বা খনি খনন, এ সবের জন্য যে জোর তৎপরতা তা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হিসেবে বেশির ভাগ মানুষের কাছে স্বীকৃত। অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর জিনিস তৈরি হচ্ছে অপরিমিত পরিমাণে। ভোগ্যপণ্যের অবিরাম উৎপাদন ও ব্যবহারে প্রতি দিন জমছে পাহাড় পরিমাণ বর্জ্য। উন্নয়নের করাতে কাটা পড়ছে প্রকৃতি।

স্বল্পসংখ্যক মানুষ এই সর্বনাশা কর্মকাণ্ডের কারিগর তাদের পাহাড় প্রমাণ মুনাফার স্বার্থেই। আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে, বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়-সহ গ্রামের গরিব খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষজন ও কৃষকসমাজকে। প্রাণ-অপ্রাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে প্রকৃতি বিপর্যয়ের কারণে অণুজীব-সহ তামাম বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা সব চেয়ে বেশি। আমরা এর মধ্যেই ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির পর্যায়ে ঢুকে গেছি। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে দানবীয় ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, সাইক্লোন, টাইফুনের সংখ্যা ও তীব্রতা দু’টোই বাড়ছে। অসময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত, বন্যা- প্লাবন ঘনঘন বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহ আর খরা, দাবানল। কৃষি উৎপাদনের ওপর নেমে আসছে সর্বনাশা প্রভাব। চাষের জমি ও কৃষিশস্য জলের তলায় চলে যাওয়ায় কৃষকরা বারবার সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশে দেশে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি হিসেব বলছে, আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে উদ্বাস্তু মিছিলে নাম লেখাবেন কম করে দেড়শো কোটি মানুষ।

সারা পৃথিবী জুড়ে সংবেদনশীল মানুষ, প্রধানত নবীন প্রজন্ম বুঝে নিতে চাইছে তাদের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার হক, খুঁজে নিতে চাইছে প্রাণ-প্রকৃতির সুসম্পর্কের নির্দিষ্ট রূপটি। নির্দিষ্ট দাবি সামনে রেখে তাদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার দাবিতে আগের বারের মতো এ বছরেও ২৫ মার্চ তারা বিশ্ব জুড়ে আহ্বান করেছিল বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘট।

পৃথিবীজোড়া এই উদ্যোগের পাশে আপনাকে চাই, আপনাদের চাই। চাই সারা বছর। কারণ ধর্মঘট যদি হয় সচেতনতা প্রসারপর্ব, তার পর থেকে যাবে দাবি আদায়পর্ব। আমাদের সরব দাবি হয়ে উঠুক আমজনতারই দাবি। আগামী দিনে রাজনীতিতে এ সব প্রশ্ন হয়ে উঠুক সব চেয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচ্য। সভ্যতাই যেখানে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে, সেখানে আর সব কিছুই কবিগুরুর থেকে ঋণ নিয়ে বলা যায়, “শুধু হাসি খেলা প্রমোদেরও মেলা শুধু মিছে কথা ছলনা”। এই সব নিয়ে সর্বস্তরে চর্চা হোক।

পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূউষ্ণায়ন, বরফের গলন, সমুদ্রজলের উচ্চতা ও উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া – এ সবের হাত ধরে মানবসভ্যতার চিরতরে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার মতো বিষয়গুলি উঠে আসুক আমাদের দৈনন্দিন আলাপচারিতায়, আড্ডায়। পরিবেশ বাঁচানোর দাবিতে সরব হয়ে উঠুক সামাজিক আন্দোলন ও জনতার রাজনীতি। এটাই কেবল মানবসভ্যতার রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে, বাঁচিয়ে দিতে পারে বিলুপ্তির হাত থেকে।

তাই আমাদের ও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ সুন্দর নির্মল পরিবেশ রেখে যাওয়ার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে পথে নামাটা আজ খুব জরুরি। আসুন জীবনের জয়গান গাই।

আরও পড়তে পারেন

গরিফায় ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’-এর তৃতীয় প্রচার কর্মসূচিতে ‘জীবনের জয়গান’

পরিবেশের বিপর্যয় মানে সভ্যতার বিলুপ্তি – এই আওয়াজ তুলে সংঘবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে কল্যাণীতে প্রচার কর্মসূচি

পরিবেশ রক্ষার দাবিতে নৈহাটিতে ‘পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ’ আয়োজিত অবস্থান বিক্ষোভ

পাহাড় বাঁচাতে অযোধ্যা পাহাড়ে ‘প্রকৃতি বাঁচাও ও আদিবাসী বাঁচাও’ মঞ্চের উদ্যোগে জনচেতনা র‍্যালি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন