প্যারিস চুক্তি ছাড়ার মার্কিন সিদ্ধান্তে বিশ্ব জুড়ে ধিক্কার, সমালোচনা, হতাশা

0
367

ওয়াশিংটন: গরজ বড়ো বালাই। ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কথা দিয়েছিলেন, আমেরিকার স্বার্থ আগে দেখবেন। তাঁর স্লোগান ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। তাঁর যুক্তি, প্যারিস চুক্তি দেশের অর্থনীতির পক্ষে বোঝা। এর ফলে চাকরির সুযোগ কমবে আমেরিকায়, আমেরিকার সার্বভৌমত্ব দুর্বল হবে এবং অন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমেরিকা অনেক অসুবিধাজনক জায়গায় চলে যাবে। এই সব যুক্তিতে প্যারিস চুক্তি ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ধিক্কার, নিন্দা, সমালোচনার ঝড় উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে।

মজার কথা হল, ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন এই সময়ে সঙ্গিহীন ভাবে থাকাটাও কোনো কাজের কথা নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, কেন তিনি এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এলেন তা ব্যক্তিগত ভাবে ব্যাখ্যা করবেন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং কানাডার রাষ্ট্রনেতাদের কাছে। তিনি বলবেন, আমেরিকা পরিবেশরক্ষায়  ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক জোটের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

কী বলল জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি সহ বিভিন্ন মিত্র দেশ

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাখ্যা করার আগেই ইউরোপের তিন দেশ জার্মানি, ফ্রান্স আর ইতালি এক যৌথ বিবৃতি দিয়ে প্যারিস চুক্তির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার কথা জানিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে তাঁরা যে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ তা ওই বিবৃতিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন জার্মানির চান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাকরঁ এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী পাওলো জেন্তিলোনি। তাঁরা বলেছেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি নিয়ে আর ‘নতুন করে আলাপ আলোচনার’ সুযোগ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে তাঁরা দুঃখিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলের মোকাবিলা করতে যে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা গ্রহণ করতে যে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তা ওই নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন। ওই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সব দেশকে এ ব্যাপারে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ জুগিয়েছেন তাঁরা।

জার্মানির চান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেলের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সদস্যরা একটি আলাদা বিবৃতিতে বলেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের ক্ষতি করছে, আমাদের ইউরোপীয়দের ক্ষতি করছে এবং সমগ্র বিশ্বের জনগণের ক্ষতি করছে।” ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাকরঁ এক আলাদা বিবৃতিতে বলেছেন, “আমেরিকা এবং আমাদের এই পৃথিবী গ্রহের পক্ষে এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত।”

আমেরিকার তথাকথিত বন্ধু দেশ ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডাও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এ ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করে ফোনে ট্রাম্পকে বলেছেন, “এই চুক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে।”  রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, রাশিয়া মনে করে প্যারিস চুক্তির কোনো বিকল্প নেই। মেক্সিকোর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ভিনসেন্ট ফক্স বলেছেন, “এই গ্রহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন উনি (ট্রাম্প)।” ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে গভীর ভাবে ব্যথিত পোপ। তিনি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন।

দ্বীপরাষ্ট্রগুলির প্রতিক্রিয়া

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রতলের উচ্চতা ক্রমশই বাড়ছে। এর ফলে সব চেয়ে বেশি বিপন্ন ছোটো ছোটো দ্বীপরাষ্ট্র।  ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে তারা ভীষণ ক্ষুব্ধ। মার্শাল আইল্যান্ডসের প্রেসিডেন্ট হিলডা হাইনে বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা একেবারে বিপদের কিনারায় বসে আছে অর্থাৎ আমাদের মতো দেশগুলো এই সিদ্ধান্তে খুব উদ্বিগ্ন।”

দেশের মধ্যেও প্রবল সমালোচনা

শুধু বিদেশেই নয়, ঘরের মধ্যেও প্রবল ভাবে সমালোচিত হচ্ছেন ট্রাম্প। দু’ বছর আগে যিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে সই করেছিলেন সেই প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই সিদ্ধান্তে রীতিমতো বিরক্ত। তিনি বলেছেন, “এ হল ভবিষ্যতকে নাকচ করা।”

মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা চুক শুমার বলেছেন, “একুশ শতকে সব চেয়ে খারাপ নীতিগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে আমাদের অর্থনীতির, আমাদের পরিবেশের এবং আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাপক ক্ষতি হবে।” মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, “এই মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক ক্ষতি করছে। এই অবস্থায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের এই গ্রহকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার আমাদের নেই।”

বিজ্ঞানীরা কী মনে করেন

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকা যদি সত্যিই সরে যায়, তা হলে আরও গরম হওয়ার দিকে পৃথিবী এগিয়ে যাবে। পৌঁছে যাবে আরও বিপজ্জনক জায়গায়। কারণ, আমাদের এই গ্রহের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমেরিকার দায় অনেকটাই। আমেরিকা সরে গেলে বছরে আরও ৩০০ কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হবে। এই অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বরফের চাদর গলিয়ে ফেলা, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়িয়ে দেওয়া এবং আরও চরম আবহাওয়া তৈরি করার পক্ষে যথেষ্ট বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here