রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা

কেরলের মহাপ্লাবনের পরে খুব স্বাভাবিক ভাবেই কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চিন্তিত। এ রকম বন্যা কি আমাদের রাজ্যে হতে পারে?

এ ব্যাপারেই এখানে আমরা বিশ্লেষণ করব। তবে তার আগে বলি, খুব সচরাচর না হলেও, অল্প সময়ের অতি বৃষ্টির ইতিহাস কলকাতারও রয়েছে। ১৯৯৯-এর সেপ্টেম্বরের একটা দিন এ রকমই কিছু ঘটেছিল। মাত্র ১৬ ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছিল শহর কলকাতায়। এত বৃষ্টির চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না কলকাতার। ফলে শহরের কিছু কিছু অঞ্চলে তার পরের পাঁচ দিন নৌকা চলেছিল।

ঠিক তার পরের বছরের কথা ভাবুন। ২০০০-এর সেই বিখ্যাত বন্যা এখনও অনেকের মনেই টাটকা। রাজ্যের ইতিহাসে ও রকম বন্যা খুব একটা নেই। ১৯৭৮-এর পরেই সব থেকে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল রাজ্য। প্রাণ হারিয়েছিলেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। তবে এখন নিকাশি এবং সেচ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। ফলে জল জমার সমস্যা আগের থেকে কিছুটা কমেছে।

kerala floods pinarai vijayan
বন্যার গ্রাসে কেরল। ছবি: টুইটার
আরও পড়ুন মসজিদ জলের তলায়, ইদের নমাজ কেরলের মন্দিরে

কিন্তু যে প্রশ্নটা আসে তা হল কী ভবে এই ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ল কেরল? উন্নয়নের সূচকে কেরল কতটা এগিয়ে আমরা সবাই জানি। পরিবেশকে বিশেষ ক্ষতি না করেই কেরল আজ এত উন্নত।

তবুও কেন এই ঘটনা?

এর পেছনে কয়েকটা কারণ আমরা ধরে নিতে পারি।

১)  মেঘ ভাঙা বর্ষণ, বা ক্লাউড বার্স্ট ভারতের বিভিন্ন জায়গায় হয়, বিশেষ করে পাহাড়ি জায়গায়। কেরলের পার্বত্য অঞ্চলেও ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এ বার সম্ভবত সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক বার মেঘ ভাঙার ঘটনা ঘটেছে।

২) তামিলনাড়ু-কেরল সীমান্ত জুড়ে রয়েছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, যা ৯ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত উঠেছে। এই পাহাড়শ্রেণির ফলে আরব সাগর থেকে ধেয়ে আসা জলীয় বাষ্প ভরা বাতাস তামিলনাড়ুতে চলে যেতে না পেরে, ভেঙে পড়েছে কেরলের পার্বত্য অঞ্চলে।

৩) ৮ আগস্ট থেকে তার পরের দশ দিন গোটা রাজ্যেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি চলেছে। কিন্তু সমতলের থেকে পাহাড়ে বৃষ্টির তীব্রতা অনেকটাই বেশি ছিল। পাহাড়ে যা বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, তার পাঁচ গুণ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

৪) এক দিকে পাহাড় এবং এক দিকে সমুদ্র থাকার ফলে কেরলে উপকূলবর্তী সমতলভূমি খুবই সরু। ফলে পাহাড় থেকে যে জল তোড়ে নেমেছে সেটা ছড়িয়ে যেতে পারেনি। অল্প জায়গা দিয়ে প্রচুর পরিমাণে জল তোড়ে বেরোনোর ফলে এই বিপর্যয় হয়েছে।

আরও পড়ুন কেরল ভাসছে বন্যায়, জার্মানি সফরে মন্ত্রী, উঠল পদত্যাগের দাবি
kerala floods bengali
চলছে ত্রাণের কাজ। ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
এ বার কেরল এবং এ রাজ্যের বন্যাপ্রবণ জেলাগুলির মধ্যে একটা তুলনা

কেরলের মোট ক্ষেত্রফল ৩৯ হাজার বর্গ কিলোমিটারের আশেপাশে। অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের যে জেলাগুলি সব থেকে বেশি বন্যাপ্রবণ (দুই মেদিনীপুর, দুই বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া, বীরভূম, নদিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং মুর্শিদাবাদ)  তার মোট ক্ষেত্রফল ৪৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার। কেরলের জনসংখ্যা যেখানে ৩ কোটি ৪০ লক্ষ তখন পশ্চিমবঙ্গের এই জেলাগুলিতে মোট জনসংখ্যা ৪ কোটি ৮০ লক্ষ। কিন্তু অতীত ঘেঁটে দেখা গিয়েছে বন্যার কবলে পড়েছে এই সব অঞ্চলের মোট ৩২ লক্ষ বর্গ কিমি অঞ্চল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩ কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষ।

সুতরাং তুল্যমূল্য বিচারে আমরা দেখব কেরলের যতটা অঞ্চল বন্যার গ্রাসে, দক্ষিণবঙ্গের ঠিক ততটা অঞ্চলই অতীতে বন্যার কবলে পড়েছে। অথচ কেরলের বন্যার ভয়াবহতা অনেকটা বেশি। এর কারণ-

১) বহু বছরে এ রকম বিপর্যয় দেখেনি কেরল। এ রকম বিপর্যয় হতে পারে সেটা আন্দাজ করতে পারেনি। ফলে বিপর্যয়ের প্রস্তুতিতে কিছু খামতি ছিল।

২) প্রস্তুতি যদি থাকেও, এত অল্প সময়ের মধ্যে এত পরিমাণে বৃষ্টি সহ্য করা শুধু ভারত কেন, অন্য দেশের প্রশাসনের কাছেও খুব চাপের।

আরও পড়ুন পরিবেশ রক্ষায় এখনই সতর্ক না হলে কেরলের পুনরাবৃত্তি হবে এই দুই রাজ্যেও, সতর্কতা মাধব গাডগিলের
তা হলে কলকাতার কী হবে?

কলকাতার মানুষদের কী কোনো দিন এ রকম বিপদের সম্মুখীন হতে হবে? এর জন্য কলকাতার আবহাওয়ার দিকটা একটি বিচার করতে হবে।

অতীতে মাঝেমধ্যে ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তবুও কলকাতায় ২৪ ঘণ্টায় তিনশো মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে।

১) কলকাতা একেবারে সমতল অঞ্চলে অবস্থিত এবং শহরের কাছাকাছি কোনো পাহাড় নেই। এর ফলে একনাগাড়ে অত বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। তবে পশ্চিমাঞ্চলের শহর বিশেষত বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামে এ রকম বৃষ্টি হতেও পারে। কিছু দিন আগেও হয়েছিল। তার কারণ ছোটোনাগপুর পাহাড়। এই পাহাড়ে জলীয় বাষ্প ধাক্কা খেয়েই অত পরিমাণ বৃষ্টি দিয়েছে এই শহরগুলিকে।

২) সমুদ্রের কাছে অবস্থিত নয় কলকাতা। ফলে মুম্বইয়ে যেমন সামুদ্রিক কারণে প্রবল বৃষ্টি হয়, কলকাতায় সেই সম্ভবনা নেই।

৩) কলকাতায় বৃষ্টি কম হওয়ার জন্য দূষণও একটা বড়ো কারণ।

আবার অঘটন একদমই ঘটবে না সেটাও বলা যায় না। নিম্নচাপ, মৌসুমী অক্ষরেখা, অনুকূল বায়ুপ্রবাহের ফলে এ রকম বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেও যেতে পারে।

kerala floods
বানভাসি কোচির উপকণ্ঠের আলুভা। ছবি: টুইটার
আরও পড়ুন কেরলের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ালেন রাজ্যের সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা
এ রকম বিপর্যয় যদি ঘটে যায়, তা হলে আমাদের কী পদক্ষেপ নিতে হবে?

১) সাধারণ মানুষকে আগে থেকে সচেতন করার জন্য জাতীয় এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে আরও বেশি করে দায়িত্ব নিতে হবে।

২) সব সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।

৩) জল নিকাশি ব্যবস্থার দিকে ভালো করে নজর দিতে হবে পৌরসভাগুলিকে। নদী, নালার দিকে নজর দিতে হবে সেচ দফতরকে।

৪) বাঁধগুলির অবস্থা কেমন, তার ব্যাপারে রাজ্য সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করতে চলতে হবে বাঁধ কর্তৃপক্ষের।

৫) সচেতনার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে আরও ভালো ভাবে ব্যবহার করতে হবে।

৬) নিজের এলাকাকে পরিষ্কার রাখতে হবে। নদী-নালা গুলি দিয়ে জল বেরিয়ে যায়। দয়া করে এখানে প্লাস্টিক ফেলে জল যাওয়ার পথকে আটকে দেবেন না।

শেষে একটা কথাই বলতে হয়। কেরলের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশে আগে হয়েছে। চেন্নাই, উত্তরাখণ্ড, অসম এমনকি আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও। তবুও এই ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না হয় সেটাই কাম্য। বৃষ্টি হবে, ঝড় হবে, ঘূর্ণিঝড় হবে, ভূমিকম্প হবে। তবুও আগে থেকে তৈরি থাকলে মানুষের প্রাণ হয়তো আমরা বাঁচাতে পারি।

(লেখক: বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা ওয়েদার আল্টিমার কর্ণধার)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন