Connect with us

দুর্গা পার্বণ

আজও ভিয়েন বসিয়ে হরেক রকম মিষ্টি তৈরি হয় চুঁচড়ার আঢ্যবাড়ির দুর্গাপুজোয়

এই বাড়িতে দেবী শিবদুর্গা রূপে পূজিতা অর্থাৎ তিনি শিবক্রোড়ে অধিষ্ঠিতা এবং তাঁর দুই হাত।

Published

on

শুভদীপ রায় চৌধুরী

শারদীয়া দুর্গাপুজোর প্রসঙ্গ এলেই আপামর মানুষের বেশি করে মনে পড়ে কলকাতার বনেদিবাড়ির পুজোর কথা। বনেদিবাড়ির পুজোয় নানা বৈচিত্র্য, নানা বৈশিষ্ট্য। কোথাও দেবী দশভুজা, কোথাও বা দ্বিভুজা। কোথাও তিনি মহিষাসুরদলনী আবার কোথাও শিবনন্দনী। এ ক্ষেত্রে বলা বাহুল্য যে শুধুমাত্র কলকাতাই নয়, কলকাতার বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় দেবীর যে আরাধনা হয় বহু বছর ধরে, সেখানেও এমন নানা বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।

অতীতে কৃত্তিবাসের রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্র আয়োজিত অকালবোধনের যে বর্ণনা রয়েছে তাতে রয়েছে তিনি ১০৮ নীলপদ্ম নিবেদন করেছিলেন দেবীর পাদপদ্মে। আবার রাজা সুরথ মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরি করে পুজো করেছিলেন মহামায়ার। সুতরাং বলাই যায়, এই দুর্গাপুজোর সূচনা বা উৎপত্তি বহু বছর আগেই। সে যা-ই হোক, হুগলি জেলার চুঁচড়ায় আঢ্য পরিবারের সদস্যরা প্রায় ২৮০ বছর ধরে দেবীর পুজো করে আসছেন। চুঁচড়ার কামারপাড়ায় দেশবন্ধু স্কুল স্টপেজের কাছেই এই আঢ্যবাড়ি।

Loading videos...
আঢ্যবাড়ির দুর্গাদালান।

আঢ্যবাড়ির কথা

কথা হচ্ছিল এই বাড়ির সপ্তমপুরুষ শংকর আঢ্য মহাশয়ের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে এই বনেদি পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল। শংকরবাবু  জানালেন, আঢ্যবাড়ির পূর্বপুরুষরা আদিসপ্তগ্রাম থেকে এসেছিলেন চুঁচড়ায় এবং এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। এই আঢ্য পরিবার মূলত ব্যবসায়ী পরিবার হলেও এই পরিবারের যোগীন্দ্রলাল আঢ্য ওরফে জগু মাস্টার ছিলেন হুগলির স্টেশনমাস্টার। পরবর্তী কালে উচ্চারণ বিভ্রাটে জগু মাস্টার হয়ে যান যদু মাস্টার এবং লোকমুখে প্রচলিত ছড়াও সৃষ্টি হয় – ‘আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি, যদু মাস্টার শ্বশুরবাড়ি…।’

এই আঢ্য পরিবারের প্রাণপুরুষ ছিলেন বদনচন্দ্র আঢ্য মহাশয়, যিনি হুগলির আঢ্যবাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন। বর্তমানে পরিবারের উত্তরসূরিরা নিষ্ঠা সহকারে পুজো করে আসছেন।

আঢ্যবাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথযাত্রার দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। চুঁচড়ার আঢ্যবাড়ির মৃন্ময়ীকে যাঁরা রূপদান করেন তাঁরা বংশপরম্পরায় সেই কাজ করে চলেছেন। তাঁরা আঢ্যবাড়িতে এসে প্রতিমা গড়েন। শুধুমাত্র প্রতিমাশিল্পীই নন, এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে যুক্ত পুরোহিত, ভিয়েনের ঠাকুররাও বংশপরম্পরায় কাজ করে আসছেন। তাঁরাও পুজোর সময় এই বাড়িতে চলে আসেন।

আঢ্যবাড়ির দুর্গাপুজো

আঢ্যবাড়িতে দেবী শিবদুর্গা রূপে পূজিতা অর্থাৎ তিনি শিবক্রোড়ে অধিষ্ঠিতা এবং তাঁর দুই হাত। এক হাতে তিনি বরদাত্রী এবং অপর হাতে তিনি অভয়দায়িনী রূপে বিরাজিতা। সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ অর্থাৎ সপরিবার তিনি বিরাজ করেন আঢ্যবাড়ির পুজোর দালানে। এই বাড়ির বিগ্রহের সাজসজ্জা হয় শোলা ও রাংতা দিয়ে নির্মিত ডাকের সাজে এবং পারিবারিক প্রাচীন স্বর্ণালংকারে দেবীকে সাজিয়ে তোলা হয়।

পুজোর ভোগ।

এই বাড়িতে একটি রীতি এখনও পালন করা হয়। তা হল দুর্গাপুজোর সাত দিন আগে থেকে ভিয়েন বসে। সেখানে তৈরি হয় নানান রকমের মিষ্টান্ন, যেমন প্যারাকী, মিষ্টিগজা, নারকেল নাড়ু, মুগের নাড়ু, সুজির নাড়, বোঁদের নাড়ু ইত্যাদি।

আঢ্যবাড়িতে দেবীর বোধন শুরু হয় মহালয়ার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ তিথিতে। সেই দিন থেকেই বাড়িতে চণ্ডীপাঠ শুরু হয়, যে রীতি আজও অব্যহত রয়েছে। সপ্তমীর দিন সকালে কলাবউ স্নান হয় ষাণ্ডেশ্বর তলার ঘাটে, তার পর দেবীর পুজো শুরু হয়। সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে পুজো হয় এই আঢ্যবাড়িতে। এখানে মন্ত্রে বলিদান হলেও কোনো দিন এই পরিবারে বলিদানপ্রথা ছিল না বলেই উল্লেখ করেন শঙ্করবাবু।

দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর দিন এই বাড়িতে এক মণ আতপচালের নৈবেদ্য দেওয়া হয়। তার সঙ্গে থাকে বিভিন্ন রকমের ফল, মিষ্টি ইত্যাদি। এই বাড়িতে অন্নভোগের রীতি না থাকলেও দেবীকে লুচি, রাধাবল্লভী দেওয়া হয়। সাথে থাকে নানান রকমের ভাজা, হালুয়া, ক্ষীর, জিবেগজা, পদ্ম নিমকি ইত্যাদি নানান রকমের পদ।

আঢ্যবাড়িতে কুমারীপুজো।

অতীতে দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর সন্ধিপূজার সময় বন্দুক দাগানো হত, বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ রয়েছে। আঢ্যবাড়িতে নবমীর দিন হয় কুমারীপুজো এবং হোম-যজ্ঞ।

দুর্গাপুজোর দশমীর দিন দর্পণে প্রতিমা বিসর্জন হওয়ার পর পরিবারের বিবাহিত মহিলারা মাছ-ভাত খান – এই প্রথাই চলে আসছে পরিবারে। তার পর হয় দেবীবরণ এবং কনকাঞ্জলিপ্রথা, অর্থাৎ বাড়ির মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছে বলে তার জন্য কনকাঞ্জলি দেওয়া হয়। তার পর কাঁধে চেপে বিসর্জনের পথে রওনা হন আঢ্যবাড়ির শিবদুর্গা। বিসর্জনের শেষে পরিবারের সদস্যরা ঠাকুরদালানে এসে শান্তিজল গ্রহণ করেন এবং সকলকে মিষ্টিমুখ করানো হয়।

আঢ্যবাড়ির কুলদেবতা

এই বাড়ির কুলদেবতা হলেন শ্রীশ্রীশ্যামরায় জিউ। সকলেই হয়তো বুঝবেন রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ, কিন্তু এই আঢ্যবাড়িতে শুধু কষ্টিপাথরের শ্যামরায়ই অবস্থান করছেন। এই শ্যামরায় জিউ প্রতিষ্ঠিত হন ১৭৩০ সালে আঢ্যবাড়ির একতলার মন্দিরে। এখনও দোল, রাসযাত্রা নিয়মমাফিক পালন করা হলেও জন্মাষ্টমী মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়।

আরও পড়ুন: চোরবাগান চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপূজায় ভোগ রান্না করেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা

এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মায়ের মূর্তি তৈরি হবে না, দেবীঘটেই পূজা হবে আর পালিত হবে সকল নিয়ম। জানালেন শঙ্কর আঢ্য মহাশয়।

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

দঃ ২৪ পরগনা

মা ও শিশুসন্তানদের জন্য কাপড় ও খাবার নিয়ে হাওড়ার বালিতে ‘সহমর্মী’

মৃন্ময়ী ‘মা’ যখন মণ্ডপে ২৫ লক্ষ টাকার গয়নায় সুসজ্জিত, তখন তাঁর সন্তানেরা দু’ মুঠো অন্নের আশায় ঝাড়খণ্ড থেকে এসে বালির ইটভাটায় লড়াই করে চলেছে।

Published

on

বালিতে সহমর্মীর ত্রাণ।

সুব্রত গোস্বামী

রাস্তায় একটা ব্যানারে হঠাৎ চোখ পড়ল। তাতে লেখা – ‘প্রতিমাতেই শুধু মা দুর্গা নন, প্রতি-মাতেই মা দুর্গা’। এই অনুভবেই বিশ্বাসী গড়িয়া সহমর্মী সোসাইটি (Garia Sahamarmi Society)।  

পুজো উপলক্ষ্যে মায়েদের হাতে নতুন কাপড় তুলে দেওয়ার জন্য সহমর্মী হাজির হয়ে গিয়েছিল বালির কিছু ইটভাটা-সহ কাছাকাছি কয়েকটি অঞ্চলে। মৃন্ময়ী ‘মা’ যখন মণ্ডপে ২৫ লক্ষ টাকার গয়নায় সুসজ্জিত, তখন তাঁর সন্তানেরা দু’ মুঠো অন্নের আশায় ঝাড়খণ্ড থেকে এসে বালির ইটভাটায় লড়াই করে চলেছে।

Loading videos...
সহমর্মী পৌঁছে গিয়েছিল বালিতে।

ইটভাটায় গিয়ে যা দেখা গেল, তা কোনো ভাবেই ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ৬ ফুট বাই ৮ ফুট একটা ছোট্ট ঘরে কোনো রকমে এঁরা বাস করছেন। করোনাকালে শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে। শারীরিক দূরত্ববিধি মানা এঁদের কাছে বিলাসিতা।

সেই ছোট্ট ঘরে একটাও জানলা নেই। মেঝেতে পড়ে আছে ছোট্ট শিশুর দল।  দেখলে মনে হয়, আফ্রিকার কোন দেশ থেকে এসেছে। এই আমাদের আধুনিক ভারত! চাঁদের মাটিতে আমরা যখন চন্দ্রযান পাঠাতে ব্যস্ত, তখন আমারই দেশের মানুষের এই চরম দুর্ভোগ।

বালির বিআইভিএ (BIVA), তার পর বিবিএ (BBA), বিএনএস (BNS) ও বিবিএ২ (BBA2) ইটভাটা এবং বিদ্যাসাগর কলোনিতে পৌঁছে গিয়েছিল ‘সহমর্মী’। ‘সহমর্মী’ পৌঁছে গিয়েছিল বেলানগরের ভগবানের ভাণ্ডারে।

বালির ওই সব জায়গায় ইটভাটায় ৫০ জন মহিলার হাতে শাড়ি ও খাবার এবং ১০০ জন শিশুর মুখে খাবার তুলে দেওয়া হল ‘সহমর্মী’র পক্ষ থেকে।

গড়াগাছায় সহমর্মীর ত্রাণ।

শুধুই বালির ইটভাটাই নয়, ‘সহমর্মী’-র আয়োজনে মহাষ্টমীর দিন গড়িয়া গড়াগাছায় ১৪০ জন শিশুর হাতে দুপুরের খাবার তুলে দেওয়া হল। এখানকার ছোট্ট দুগ্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশদের হাতে পুজোর নৈবেদ্য তুলে দিতে পেরে ‘সহমর্মী’ ধন্য ও ঋদ্ধ হল।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

পিতৃমাতৃহীন শিশুদের নিয়ে পুজোর দিনে ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এর অভিনব উদ্যোগ

Continue Reading

কলকাতা

পিতৃমাতৃহীন শিশুদের নিয়ে পুজোর দিনে ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এর অভিনব উদ্যোগ

Published

on

লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস-এর পুজোয় ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এর ছোট্ট শিশুরা।

খবরঅনলাইন ডেস্ক: উৎসব মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দ আরও জোরদার হয়ে ওঠে যখন সঙ্গে থাকে প্রিয়জনেরা! সেই প্রিয়জনদের খোঁজার প্রচেষ্টাতেই ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ (Durga and Friends) একত্রিত করেছে ছোটো ছোটো কিছু পিতৃমাতৃহীন শিশুকে, যারা এক সঙ্গে বড়ো হয়ে উঠছে এই হাউসে।

আর এই ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-কে সঙ্গ দিয়েছেন কিছু বন্ধু যাঁরা এই ছোট্ট বন্ধুদের তাঁদের মা-বাবার অভাব কোনো দিন বুঝতে দেননি।

লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস-এর পুজোয় ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’।

এই মহৎ প্রচেষ্টার সঙ্গে যিনি নিজেকে প্রথম যুক্ত করেছেন তিনি শ্যামসুন্দর জুয়েলার্স-এর পরিচালক মাননীয় রূপক সাহা। এবং তাঁর সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন সত্যেন্দ্রনাথ মিশ্রা, সুরজিৎ কালা সোহো প্রমুখ।

Loading videos...

প্রতি বছর এই খুদে বন্ধুদের সঙ্গে দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট দিন সকলে উপভোগ করেন অঞ্জলি দিয়ে, প্যান্ডেল ঘুরে এবং এক সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন করে।

কিন্তু এই বছরটা একটু আলাদা! করোনার কবল থেকে বাঁচাতে এই বার এগিয়ে এল লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস-এর (Loharuka Green Oasis)  আবাসিকবৃন্দ। এই বছর ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এর ছোট্ট বন্ধুরা আমন্ত্রিত হলেন লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস-এর আবাসিকদের সঙ্গে একটি দিন উপভোগ করার জন্য!

লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস-এ ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’।

আবাসিক প্রাঙ্গণের দুর্গাপূজায় যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়ে খুব খুশি ছোট্ট শিশুরা। তারা আবাসিক প্রাঙ্গণের অন্য শিশুদের সঙ্গে দিনটা কাটাল অঞ্জলি, খেলাধুলা ও খাওয়াদাওয়ার মাধ্যমে। 

আবাসিকদের তরফ থেকে সভাপতি দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী জানালেন, পরবর্তী সময়েও  লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এর পাশে থাকবে।

শারদোৎসব মানেই যে মেলবন্ধন, সেই সত্যি আরও প্রমাণ করে দিলেন লোহারুকা গ্রিন ওয়েসিস-এর আবাসিকরা এবং ‘দুর্গা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

দুর্গাপুজোয় সচেতনতার পরীক্ষায় উতরে গেল কলকাতা

Continue Reading

কলকাতা

দুর্গাপুজোয় সচেতনতার পরীক্ষায় উতরে গেল কলকাতা

পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই, ঘরবন্দি থেকে বা নিদেনপক্ষে পাড়াবন্দি থেকে, এ বার দুর্গাপূজা উদযাপন করল কলকাতা

Published

on

লালাবাগান সর্বজনীনের পুজো, মহানবমীর বিকেলে।

বিশেষ প্রতিনিধি: ভালো ভাবেই পাশ করে গেল কলকাতা (Kolkata) । আশঙ্কা ছিল, বাঙালির সব চেয়ে প্রিয় উৎসব দুর্গাপুজোর টানে কোভিড সংক্রান্ত সব বিধিনিষেধ উড়িয়ে দিয়ে বেসামাল হয়ে যাবে মহানগর। ফলত আরও বাড়বে করোনা সংক্রমণ।

দুর্গাপুজোর এই পাঁচ-ছ’ দিনে করোনা সংক্রমণ বাড়ল কি না, তা বোঝা যাবে দিন কয়েক পর। তবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই, ঘরবন্দি থেকে বা নিদেনপক্ষে পাড়াবন্দি থেকে, এ বার দুর্গাপূজা (Durgapuja 2020) উদযাপন করল কলকাতা।

উত্তর কলকাতার একটি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ।

মহানবমীর বিকেলে আরও এক দফা নগর পরিক্রমায় বেরোনো হল। গন্তব্য ছিল উত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল সেরে দক্ষিণের প্রান্তিক এলাকা।

Loading videos...

কলকাতার অন্যতম প্রাচীন সর্বজনীন পুজো সিমলা ব্যায়াম সমিতি বিবেকানন্দ রোডে। এই পুজো ছাড়াও এই রাস্তায় রয়েছে বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব, চালতাবাগান সর্বজনীনের মতো বেশ প্রাচীন বিখ্যাত সর্বজনীন পুজো।

মহানবমীর বিকেলে বিবেকানন্দ রোড।

মহানবমীর বিকেলে বিবেকানন্দ রোড আর পাঁচটা সাধারণ দিনের থেকেও শুনশান। সব মণ্ডপেই ঝুলছে প্রবেশ নিষেধ বোর্ড। হাতে গোনা কয়েক জন দর্শনার্থী মণ্ডপের বাইরে থেকেই প্রতিমা দর্শন করে চলে যাচ্ছেন। কোনো কোনো প্রতিমার দর্শন হচ্ছে গাড়িতে বসেই। যে হেতু রাস্তায় তেমন ট্রাফিক নেই, তাই পুলিশের বাধাও নেই।

মানিকতলা মোড় পেরিয়ে বাঁ হাতি রাস্তা রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট। একটু যেতেই ডান দিকে পড়ল লালাবাগান সর্বজনীন। গাড়িতে বসেই এমন সুন্দর প্রতিমা দর্শন হবে ভাবাই যায়নি। ওই ব্যস্ত রাস্তায় স্বচ্ছন্দে গাড়ি দাঁড় করানো হল, প্রতিমা দর্শন হল, ছবি তোলা হল অবাধে। ভাবা যায়?

বিবেকানন্দ রোডে বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবের গলি, মহানবমীর বিকেলে।

একটু এগিয়ে লালাবাগান নবাঙ্কুর-এর পুজো, একটু ভিতরে। গাড়ির জন্য রাস্তা বন্ধ। গুটি গুটি পায়ে চলেছেন নামমাত্র দু’-চার জন দর্শনার্থী।

রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে ডান দিকের পথ ধরা হল উলটোডাঙা মোড়ের উদ্দেশে। বাঁ দিকে পড়ে থাকল গৌরীবেড়িয়া সর্বজনীন। অরবিন্দ সেতু পেরিয়ে উলটোডাঙা মোড়গামী এই রাস্তা পুজোয় অগম্য হয়ে যায়। গাড়ি তো দূরের কথা, পায়ে হাঁটাও দায় হয়ে ওঠে।

এই রাস্তার আশেপাশের গলিতে বহু বিখ্যাত পুজো আয়োজিত হয় – কবিরাজ বাগান সর্বজনীন, করবাগান সর্বজনীন, উলটোডাঙা পল্লিশ্রী, তেলেঙ্গাবাগান, শুঁড়ির বাগান সর্বজনীন ইত্যাদি। এই পথ ধরে এই মহানবমীর বিকেলে একেবারে অবাধ যাত্রা। পথে নতুন পোশাক পরে কিছু মানুষ চলেছেন প্রতিমা দর্শনের উদ্দেশ্যে।

ব্যস্ত উলটোডাঙা মোড়ের সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি মহানবমীর বিকেলে।

অন্যান্য বার এই বারোয়ারি পুজোগুলো দেখার জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় উলটোডাঙা মোড়গামী মূল সড়ক থেকেই। এক একটা পুজো দেখা সাঙ্গ করতে সময় লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর এ বার মণ্ডপের পথে ক’ জন হেঁটে চলেছেন, তা বোধহয় গুনে ফেলা সম্ভব।

উত্তরের পুজো কেমন হচ্ছে তার একটা আন্দাজ পাওয়া গেল। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে ফেরার পথে মনে হল একবার রাসবিহারী কানেক্টরে বোসপুকুর শীতলামন্দিরের পুজো দেখে আসা যাক। উনিশ বছর আগে মাটির ভাঁড়ের পুজো করে বিখ্যাত হয়েছিল বোসপুকুর। সেই খ্যাতি তারা আজও ধরে রেখেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এই প্রতিমা দর্শন করতে হয়।

বোসপুকুর শীতলামন্দির, মহানবমীর বিকেলে।

সেই বোসপুকুর শীতলামন্দির অবাক করল। রাসবিহারী কানেক্টরের একেবারে মণ্ডপের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রতিমাদর্শন হল, ছবিও তোলা হল, পুলিশের নজরদারিতেই।

মহাসপ্তমী ও মহানবমীতে মহানগর পরিক্রমা করে বোঝা গেল হাতে গোনা কয়েকটি বিখ্যাত পুজো ছাড়া সর্বজনীন পুজোগুলো এ বার মোটামুটি ফাঁকাই থেকেছে। কলকাতাবাসী এ বার মোটামুটি ভাবে নিজের পাড়ার পুজোটিই দেখেছেন। পাড়ার চৌকাঠ পেরিয়ে দূরে পাড়ি জমাননি। আর যতটুকু অফিস-কাছারি চলছে, পুজোয় তা-ও বন্ধ। তাই এই আনলক পিরিয়ডেও বাস যে ভিড় দেখা যায়, দুর্গাপুজোর এ ক’ দিন তা-ও দেখা গেল না। সারা দিনই বাস একেবারেই ফাঁকা, তাই বেশি রাত পর্যন্ত বাসও চলেনি।

আনলক পিরিয়ডে নানা রকম বাধানিষেধের মধ্যে চলা মেট্রো রেল যত যাত্রী পরিবহণ করেছে, পুজোর দিনগুলোতে তার অর্ধেকও করেনি। মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের হিসেবে, সপ্তমীর দিন তাঁদের পরিষেবা ব্যবহার করেছেন ৩৪ হাজার যাত্রী। অথচ পঞ্চমীর দিন মেট্রোয় যাত্রীসংখ্যা ছিল ৮৪,৮০১ জন। মোটামুটি একই ছবি দেখা গিয়েছে, মহাষ্টমী ও মহানবমীতেও।

এ যেন বনধের চেহারা। মহানবমীর বিকেলে রাসবিহারী কানেক্টর।

মেট্রো আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ট্রেনে বা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কোনো ভিড়ই ছিল না। তা ছাড়া অন্যান্য বারের মতো এ বারে বেশি রাত পর্যন্ত মেট্রো চালানোও হয়নি।

কলকাতার পুজো দর্শনার্থীদের একটা বড়ো অংশ আসেন কলকাতার আশেপাশের জেলা থেকে। এ বার লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় তাঁদেরও বেশির ভাগ মহানগরে আসেননি। পুজোর দিনগুলোতে শহর শুনশান থাকার এটা একটা বড়ো কারণ।

বনেদিবাড়ির পুজোও কলকাতার পুজোর একটা বড়ো আকর্ষণ। কিন্তু শহরের বেশির ভাগ বনেদিবাড়ির পুজোতেও এ বার সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। নিজের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বনেদিবাড়ির পুজো।

দশমীও ম্রিয়মাণ বেশির ভাগ মণ্ডপে। নেই সিঁদুরখেলা, নেই বিসর্জনের শোভাযাত্রাও। সোমবার সকাল থেকেই বিসর্জন শুরু হয়ে গিয়েছে। কোথাও কোথাও তো মণ্ডপচত্বরেই প্রতিমাকে গলিয়ে ফেলা হচ্ছে পাইপের জলের তোড়ে। কোনো কোনো বারোয়ারি কমিটি তো মণ্ডপের সামনেই জলের ব্যবস্থা করে সেখানে প্রতিমা বিসর্জন করছে।

ছবি: শ্রয়ণ সেন

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

নেই সিঁদুরখেলা, শোভাযাত্রা, কোভিডের আবহে রাজ্যে মনখারাপের দশমী

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
দঃ ২৪ পরগনা19 mins ago

কুলতলিতে মহিলা সমবায় সমিতিতে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ, মীমাংসা চেয়ে পাশে দাঁড়াল এপিডিআর

দেশ48 mins ago

ন’মাস পরে দিল্লিতে দৈনিক কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা একশোর নীচে!

বিনোদন1 hour ago

‘তাণ্ডব’-এর নির্মাতা, অভিনেতাকে সম্ভাব্য গ্রেফতারির হাত থেরে সুরক্ষা দেওয়ার আরজি ফেরাল সুপ্রিম কোর্ট

দেশ2 hours ago

২৬ জানুয়ারির হিংসাত্মক ঘটনার জেরে কৃষক বিক্ষোভ থেকে সরে দাঁড়াল দু’টি সংগঠন

বিদেশ3 hours ago

কোভিড-১৯ আটকাতে নাকে নেওয়ার স্প্রে আবিষ্কার করলেন বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা

ঝাড়গ্রাম3 hours ago

তৃণমূলকে ভোট ‘না’ বলে দিন, ঝাড়গ্রামের সভায় বললেন শুভেন্দু অধিকারী

রাজ্য4 hours ago

‘দুয়ারে সরকার’-এর সাফল্যের খতিয়ান প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজ্য5 hours ago

ফের অসুস্থ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

শিল্প-বাণিজ্য9 hours ago

ফের বাড়ল পেট্রোল, ডিজেলের দাম, কলকাতায় নতুন রেকর্ড

ফুটবল2 days ago

বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু ব্রাজিলের ফুটবল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও চার ফুটবলারের

কলকাতা1 day ago

উত্তর কলকাতার অলিতেগলিতে লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাস, সাধারণতন্ত্র দিবসে হেঁটে দেখা

কলকাতা2 days ago

নারকেলডাঙার ছাগলপট্টিতে আগুন, হতাহতের খবর নেই

প্রযুক্তি1 day ago

টিকটক-সহ ৫৯টি চিনা অ্যাপ চিরতরে বন্ধ করে দিল কেন্দ্র

অ্যাডভেঞ্চার2 days ago

হাতে হাত ধরে, জাতীয় সংগীত গেয়ে কে-২ আরোহণ নেপালের দশ শেরপার, দেখুন ভিডিও

রাজ্য10 hours ago

কনকনে উত্তুরে হাওয়া ঢুকছে রাজ্যে, প্রবল শীতের সম্ভাবনা রাজ্য জুড়ে

রাজ্য2 days ago

মেঘ-কুয়াশার যুগলবন্দিতে বাড়ল পারদ, তবে শীত ফিরবে দ্রুত

কেনাকাটা

কেনাকাটা4 days ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা4 days ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা5 days ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা6 days ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা6 days ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা1 week ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা1 week ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

কেনাকাটা2 weeks ago

৯৯ টাকার মধ্যে ব্র্যান্ডেড মেকআপের সামগ্রী

খবর অনলাইন ডেস্ক : ব্র্যান্ডেড সামগ্রী যদি নাগালের মধ্যে এসে যায় তা হলে তো কোনো কথাই নেই। তেমনই বেশ কিছু...

কেনাকাটা3 weeks ago

কয়েকটি ফোল্ডিং আইটেম খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক: এমন অনেক কিছুই থাকে যেগুলি সঙ্গে থাকলে অনেক সুবিধে হত বলে মনে হয়, কিন্তু সব সময় তা পাওয়া...

কেনাকাটা3 weeks ago

রান্নাঘরের কাজ এগুলি সহজ করে দেবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরের কাজ অনেক বেশি সহজ করে দিতে পারে যে সমস্ত জিনিস, তারই কয়েকটির খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

নজরে