অশোক কুমার কুণ্ডু:

গ্রামিক মানুষ বলে গাজন। গা-সুদ্দু মানুষ ভেঙে এসে জমে গাজন মেলায়। কথায় বলে না, এসো জন, বসো জন। চটের শরীরে পাড়ি সুতোয় দুই-চার ফোঁড়ে বাক্যবন্ধ, আমন্ত্রণের। আসনের শরীরে লেখা নিমন্ত্রণ, ‘আসুন বসুন জল–পান।’ এখানে জল-খাবার খান, শেষে শালির হাতে এক খিলি পান – ‘গুয়া পান খাইয়ো বন্ধু, হদিসটুকু থুইয়ো’ – এটি অহমিয়া স্বাদের।

অবিশ্যি পণ্ডিতেরা, নাগরিক ভাষাতাত্ত্বিকেরা বাতলে দিলেন গর্জন থেকে গাজন এসেছে। এ যে দেখি উলটো রীতি। আমি মানি না। বিশ্বাস করি, আগে গ্রামের জন্ম হয়েছে। পরে গড়ে উঠেছে নগর। ভূমিপুত্র/পুত্রীদের সংস্কৃতি নিয়েই তো নগর-সংস্কৃতির মজ্জা-হাড়। গর্জন তো তৎসম শব্দ। নিরক্ষর গ্রামীণ মন এ শব্দ পাবে কোথায়? সংস্কৃত পণ্ডিতমশাইরা (তাঁরাও আমার শ্রদ্ধেয়), ‘বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই’রা বহু যুগ ধরে এই প্রান্তবাসীদের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে রেখেছিল দো-চালা থেকে। তা হলে যুক্তাক্ষর কেমন করে পয়দা করে থাকবে — গর্জন > গাজন?? বরং গাজন বা গাঁজন থেকে সংস্কৃতায়ন করেছেন বুদ্ধিজীবীরা, শ্রদ্ধেয় নাগরিক ভাষাতাত্ত্বিকেরা।

থাক, ভাষা নিয়ে এ সব চুলোচুলি, কুটকুচালি। বরং শিবশম্ভু বলে বেরিয়ে পড়ি বঙ্গের কোনো একটা গাজনে। নাকি অনেক গাজনে? উপায় নেই। কারণ গাজন বাংলা বছরের শেষে, ওই একটি দিনেই হয়ে থাকে। তবে তথ্য হিসাবে একটু ভুল হয়ে গেল। সংশোধন করে নিই।

গাজন উৎসব, মেলা শুরু হয় চৈত্র সংক্রান্তির দিন। বৈশাখে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনও গাজন হয়। জ্যৈষ্ঠেও বিশেষ দিনে গাজন মেলা হয়। উত্তরবঙ্গের গাজন/চড়ক যেমন চৈত্র সংক্রান্তির দিন হয়ে থাকে, তেমনই আবার বৈশাখে বা জ্যৈষ্ঠের বিশেষ পুণ্য দিনেও হয়ে থাকে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গাজন পরিচালন করেন দেয়াসি/পণ্ডিত, যাঁরা অন্ত্যজ শ্রেণির ‘ব্রাহ্মণ’, জন্মসূত্রে নয়, সামাজিক মান্যতায়। এঁদের দেওয়া সময় মোতাবেক পালিত হয় গাজন উৎসব। এক জন দেয়াসি/পণ্ডিত একই মাসে একাধিক গাজন অর্গানাইজ করান। ফলে, ব্যস্ত শল্যচিকিৎসকের মতো এঁরা ‘ডেট’ দেন গ্রাম-গ্রামান্তরে, নিজের গাজন-ব্যস্ততা বুঝে।

সংখ্যালঘু ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দল অত্যাচার-অবহেলা করেছে এই সংখ্যাগুরু লোকায়ত প্রান্তবাসীদের। ফলে জমিদারবাড়ির নাটমঞ্চ, চার-চালা থেকে দূরে বনে-বাদাড়ে, প্রান্তবাসীর উঠোনে, খোলা মুক্তমঞ্চে, আকাশের নীচে জন্ম নিয়েছে লোকায়ত ধর্মের ‘ঈশ্বর’। নানান নাম তাঁর – পাঁচু ঠাকুর, মনসা, ঈশান রায়, বুড়ো রায় ইত্যাদি। ব্রাহ্মণের আমদানি গেল কমে। তখন লোকায়ত চালচিত্রে উড়ে এসে জুড়ে বসল শোষক পুরোহিতকুল। ব্যাস পিছিয়ে গেল, করজোড়ে মেনে নিল প্রান্তবাসীরা।

কিন্তু ব্রাহ্মণের ঘাপলার দগদগে ঘায়ের আবহমান কালের স্মৃতিচিহ্ন থেকে গেল গাজনে। ব্যোমভোলা শিব মুচকি হাসল। শুরু হয়ে গেল অধিক সন্ন্যাসীতে জমাটি গাজন। প্রান্তবাসী থাকল, তবে পৈতাধারীর আজ্ঞাবহ হয়ে। গাজনের আগে এক পক্ষ কাল প্রান্তবাসীরা নিজ গোত্র ত্যাগ করে অর্থাৎ দুলে, বাগদি, কেওট প্রভৃতি যোগদানকারীরা শিবগোত্রে পৌঁছে যায়, এক গাছা সাদা পাড়ি সুতো গলায় পরে। এ তো ব্রাহ্মণেরই অবাক বিধান। গাজন শেষে ওই সুতো খুলে নিজ গোত্রে, যাও ফিরে যাও আপন ঘরে। থেকে যাও বছরকাল অন্ত্যজ চাটাইয়ে।

আবার দেখো, সুসজ্জিত রুপো বা পিতলের পালকি হাতে মন্দির থেকে বের হবে ব্রাহ্মণ। হেঁটে যাবে ভক্ত/ভোক্তা অন্ত্যজ শ্রেণির পিঠে পা দিয়ে। প্রান্তবাসীরা শুদ্ধ বস্ত্রে, গলায় সুতোর কাছা দিয়ে, হাতে বেতের ছড়ি নিয়ে, ‘ভোলেবাবার চরণে সেবা লাগে’, কোরাসে গাইতে গাইতে লাইন দিয়ে মৃত্তিকার ওপরে শুয়ে পড়বে। তাদের মেরুদণ্ডের ওপর পা ফেলে ব্রাহ্মণ মন্দির সংলগ্ন মাঠে এসে, সেখানে পোঁতা চড়ক কাঠের গোড়ায় পুষ্প-বিল্বপত্র দেবেন। এবং চড়ক কাঠের শরীরে এঁকে দেবেন হিটলারের প্রতীক স্বস্তিকা।

ওহ! বলা হয়নি। ব্রাহ্মণ প্রান্তবাসীর পিঠ সিঁড়ি করে হাঁটার আগে, সহকারী ব্রাহ্মণ ‘আমপাতা ঝিরিঝিরি’ করে ছিটিয়ে দেবে শান্তিজল ওরফে গঙ্গাপানি। মানুষের পিঠে পুণ্যবান ব্রাহ্মণের পদছাপ – এ তো যে কোনো উৎসবের পয়লা পাপ। এ পাপ ধর্মের ফাঁসবন্দি।

পশ্চিম মেদিনীপুরের রামজীবনপুর এক প্রাচীন জনপদ। কামারপুর চটির বাঁয়ে, মানে দক্ষিণে গড় মান্দারন। পাক্কি সড়ক চলেছে হাজিপুর-রামজীবনপুর হয়ে খিরপাই পেরিয়ে শ্রীনগর (কাশ্মীরের নয়)। এই শ্রীনগরের আগেই রয়েছে গাজনতলা। শিবমন্দির, রক্ষাকালী – প্রতি বছর গাজন উৎসব হয়। বেশ পুরোনো গাজন। কোনো ঝামেলা নেই। এক বার ঘটল সমূহ সামাজিক বিপদ। ব্রাহ্মণরা বলে বসল, “গাজন/চড়ক করো মাঠে। দুলে-বাগদি-ডোম… অন্তেবাসীরা মন্দিরে ঢুকতে পারবে না।” ব্যাস, ধুন্ধুমার ব্যাপার, পুলিশ এল, পঞ্চায়েত এল। ফলে প্রশাসন বনাম গাজন। সে বিশাল কেচ্ছা। আপাতত শান্তি কল্যাণ।

আরও গাজন নিয়ে কেচ্ছাকাহিনি শোনাই। উচ্চপ্রজননশীল ধানের চাষ চৈত্রে, বোরো ধান, জল লাগে প্রচুর। কিন্তু পুকুর একটাই, ছোট্টো। ওটিই শিবের পুকুর। ওই শিবের পুকুর থেকে সেচের জল নিলে পড়ে থাকে কাদা-পাঁক। এতে শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা স্নান করবে কেমন করে? ব্যাস, লেগে গেল পড়শিদের মারামারি। খবর পেয়ে ছুটে গেলাম। কলকাতা থেকে বেশ দূর, গ্রামের নাম নাকালী-ভাজনা। শেষ পর্যন্ত মামলা গড়িয়েছিল কোর্টে।

ব্রিটিশ পারেনি বন্ধ করতে এই উৎসবের প্রাচীন বীভৎস পরম্পরা। সে সময় অমৃতবাজার পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। বিখ্যাত গাজন। চৈত্র সংক্রান্তির ভোরে। লোকালয়টি ‘ধাপার মাঠ’। পচাগলা নরমুণ্ড নিয়ে নাচ। একই দৃশ্য করিমগঞ্জে, তবে তা বন্ধ। কিন্তু রমরমিয়ে চলছে কুড়মুনের (বর্ধমান) গাজন। দোসর সোনাপলাশি গ্রাম। তবে কুড়মুনের গাজনের সেরা উৎসব রাতে – আলোর রোশনাই, বাংলার বাজি। চালানি নয়, দেশজ মানুষের তৈরি। আগুন নিয়ে খেলা।

চড়কের ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিই। চড়ক আসলে লম্বা একটি শাল গাছ। ডালপালা কেটে শুধু কাণ্ডর গোড়াটা মজবুত করে পোঁতা গাজনতলায়। কাণ্ডটি কেটে তার মাথায় একটা গোঁজ ঢোকানো থাকে। তার ভিতরে ঢোকানো হয় অত্যন্ত ভারী একটি আয়তাকার ফ্রেম। এর দু’ দিকে ঝোলে দু’টি দড়ি। এক প্রান্তে সন্ন্যাসীর লোহার শলাকা ফুঁড়ে, বেঁধে দিয়ে অন্য প্রান্তের দড়ি ধরে ঘোরানো হয়। কোথাও আবার বিশেষ কেরামতি। দু’ প্রান্তে দু’ জন শিবভক্তের পিঠে শলাকা বেঁধে ঝোলানো হয় এবং ঘোরানো হয়।

গাজন-পাটা, চড়ক, দেলঠাকুর – এ সবই কাঠের। চড়কের কথা বলা হয়েছে। এ বার কয়ে নিই গাজন-পাটা ও দেলঠাকুরের কথা।

গাজন-পাটা আয়তাকার কাঠের পাটা। মানুষ শুতে পারে এমনই লম্বা। তার ওপর গজাল (পেরেকের বাপ) পোঁতা। নদি/দিঘি/পুকুরে স্নান সেরে প্রধান ভক্ত ওই পাটার ছুঁচলো দিকে শুয়ে পড়বে। ভক্তরা পাটা-সহ ওই প্রধান ভক্তকে কাঁধে করে মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়ে আসবে। স্নান সেরে এক দল শ্বেত বস্ত্র পরিহিত সন্ন্যাসী তাঁকে অনুসরণ করবেন। থাকবেন গ্রামবাসীরাও। এ দৃশ্য দেখা যায় আকছার। বিষ্ণুপুরের মল্লেশ্বরের গাজনে দেখা যায়। দেখেছি পুরুলিয়ার লহরিয়ায়।

দেলঠাকুর পশ্চিমবঙ্গের ভক্তদের নয়। এটি মূলত পুব বাংলায়। প্রথমে নজরে পড়ে অসমের গুয়াহাটিতে, বাস্তুচ্যুত বাঙালিদের গাজনে। অনেক ঘুরে, ভোলাবাবার আশীর্বাদে খোঁজ পেয়ে যাই রাজাপুর গ্রামে, থানা গাইঘাটা। কাঞ্চিরাম সরকারের বাড়িতে অতিথি হই। পেয়ে যাই দেলঠাকুরের পাটা-কাঠ। সমগ্র জনপদে উঠে এসেছে রাজশাহি-পাবনার অসংখ্য পরিবার। মানুষ তো একা বাঁচে না, পরিবার পরিজন থাকলেই আসে লোকায়ত দেবদেবী। এই দেল বা দেলঠাকুর নিত্য পুজো পান একক পরিবারের ঠাকুরঘরে, যিনি এই দেলঠাকুরের মালিক। গাজনে তিনি সবিশেষ পূজিত, সম্মানিত।

নৌকার গড়নে খুব বড়ো লম্বা একটা কাঠ। তাতেই কুঁদে কেটে ১৫টি দেবদেবী। লোকায়ত বুকের সাহস অসীম। ব্রাহ্মণ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করে একই কাষ্ঠ-বেদীতে নির্মাণ করেছে শ্রীকৃষ্ণের পুতনা বধ, মনসা (জোড়া সাপ), নরসিংহের হিরণ্যকশিপু বধ, ভক্ত প্রহ্লাদ, হরিচাঁদ, শান্তিমা, বীণা হাতে নারদ, গাঁজার কল্কে নিয়ে শিবঠাকুর, শঙ্খ হাতে ভগীরথের গঙ্গা আবাহন, শিবের বাহন ষাঁড়, বামন অবতার, বরাহ (জলমগ্ন পৃথিবীকে দাঁতে ধরে বাঁচায়)…। এত সুন্দর লোকশিল্প, লৌকিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর সহাবস্থান, আমার গাজন দেখার দু’ দশকের অভিজ্ঞতায় বিরল। এই দারু-ভাস্কর্যের শিল্পীর নাম মনোরঞ্জন কর্মকার। অনেক চেষ্টা করেও খোঁজ পাইনি এই শিল্পীর।

‘জিভ ফোঁড়া’, ‘ভুরু ফোঁড়া’, ‘পিঠে ফোঁড়া’ — গাজনের মেলায় ‘বান ফোঁড়া’ নামেই পরিচিত। এগুলি দুই বঙ্গের সন্ন্যাসীদের কাছে জলভাত। আসলে এই বান হল সরু লোহার রড। জোড়া বান, খুব মোটা রড দু’ প্রান্তে দু’ জনের জিভে বিদ্ধ – হুগলির মিগা-চাতরা গ্রামে (দু’টি গ্রামের নাম জুড়ে একটা ‘ডাক’), মহকুমা আরামবাগ, দেখেছিলাম। আজ আর কারও বুকের পাটা নেই ওটা করার।

আরামবাগের উত্তরে পুইন-কাচগড়িয়ার (দু’টি গ্রাম-নাম মিশে একটা ‘ডাক’) গাজন বিখ্যাত। কাচগড়িয়ার রামদা-শয্যা ভয়ংকর। দু’টি বাঁশ সমান্তরাল ভাবে বেঁধে তার ওপরে এক ফুট দূরত্বে মোট সাতটি রামদা খাড়া বাঁধা। ধারালো দিকেই লম্বালম্বি শুয়ে পড়েন ভক্তরা। রামদা-শয্যার মিছিল চলে এক শিবমন্দির থেকে অন্য আর একটি শিবমন্দিরে। সেখানে পৌঁছে যাত্রা শেষ। কারও পিঠ কাটে না। আর একটি কসরত বন্ধ হয়ে গিয়েছে – ‘বাবুই ফোঁড়া’। বাঁশের ধারালো ও তীক্ষ্ণ মুখের কঞ্চিটি কাঁধের নিকটতম অংশে ফুটিয়ে দেওয়া।

এ সব ভয়াবহ রক্তপাত বাদ দিলে এখানে বিকেলে সঙের অনুষ্ঠান অপূর্ব। সঙের বিষয়বস্তু সাধারণত পৌরাণিক। নিত্য গ্রাম্য রাজনীতিও থাকে। কিন্তু গেল বছর নতুন জিনিস দেখলাম। দুই ভাই, ক্লাস ফোর ও ফাইভ, নতুন নারকেল কাঠির ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করছে গাজনতলা। বাচ্চা দু’টোর বুকে-পিঠে পোস্টার। লাল আলতায় লেখা ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’। সুন্দর অভিলাষ। কিন্তু এ পরিকল্পনা তো বাচ্চা দু’টোর নয়। ওদের বাবার সঙ্গে আলাপ হল। তিনি নরেন্দ্র মোদীর ভক্ত। তাঁরই পরিকল্পনা। আপত্তি নেই। তবে শিবমন্দিরের সামনে পলিটিক্যাল বিষয়বস্তু নিয়ে সঙে তাপমাত্রা না চড়লেই মঙ্গল।

গাজনের গান নিয়ে দু’ কথা কয়ে নিই এ বেলা। গাজনে আছে সঙের গান। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে। বোলান, গম্ভীরা তো নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং গঙ্গা পেরিয়ে মালদা ও আরও কিছু জেলায় ছড়িয়ে আছে। গাজনে মুখোশ নিয়ে বের হতে দেখেছি রায়গঞ্জের শ্মশানে। শ্মশানেই চড়ক-মেলা বসে। চড়ক-কাঠ পুঁতে সন্ন্যাসী ঘোরে। নদিয়ার আদম-গাদনের চড়ক মেলা বেশ জমাটি। গান ও অভিনয়ের এক অপূর্ব ব্লেন্ডিং। গাজনে ‘হাজরা বাবা’র আবির্ভাব নিশুত রাতের অন্ধকারে। তিনি প্রধান ভক্তের হাত থেকে বিশেষ খাদ্যবস্তু-সহ পাত্রটি নেন। ‘হাজরা বাবা’ হল ভূত। গাজনমেলায় ভূত! অদ্ভুত বিস্ময়। শিবের গাজন। শ্মশানচারী শিবের সঙ্গী হিসাবে ভূত থাকবে না তো কি রাজ্যপাল থাকবেন?

গাজনে ‘ফুল-খেলা’, ‘হিন্দোল’, ‘হাকুণ্ড’ নিয়ে দু’ চারটি তথ্য।

‘ফুল-খেলা’ — লম্বা গর্ত। এক ফুট গভীর, সাত-আট লম্বা গর্তে জ্বলন্ত কাঠকয়লার আংরা বিছিয়ে দেওয়া হয়। এবং তার ওপর দিয়ে ভক্ত সন্ন্যাসীরা হেঁটে যান।

‘হিন্দোল’ — বাঁশে বাঁধা সন্ন্যাসীর পা। ঝুলন্ত সন্ন্যাসীর-ভক্তের মুখ নীচের দিকে ঝোলে। নীচে একটি গর্তে আগুন জ্বলে। সন্ন্যাসি-ভক্তের গোটা শরীরটিকে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো দোল দেওয়া হয়। মাথাটি আগুনের কুণ্ড পার হয়ে এ-দিক ও-দিক করে।

‘হাকুণ্ড’ — লম্বা সার দিয়ে সন্ন্যাসীরা বসে। তাদের জিভে ফোঁড়া লম্বা শলাকা। রক্ত-লালা ঝরছে। প্রত্যেক জনের সামনে গর্তে জ্বলন্ত কাঠকয়লার আগুন। তার সামনে হাঁড়ির মধ্যে জাগ-পিদিম, সামনে পিছনে এয়োস্ত্রী। সন্ন্যাসীর কোলে ওই অবস্থায় শিশুপুত্র (কন্যা নয়) বসে। তার মঙ্গল হবে।

অনুরূপ দৃশ্যও দেখা যায়। ভয়ংকরও বটে। চড়ক-কাঠে ঝুলন্ত-ঘুরন্ত সন্ন্যাসী। শিশুপুত্রকে বুকে ধরে ওই ঝুলন্ত সন্ন্যাসী ঘুরছে। মরা বিকেলের আলো, সন্ধ্যাতারার উদয়, বিপুল জমায়েত, মানুষের চিৎকার, ঢাকের আওয়াজ – সব মিলিয়ে এই পরিবেশ শিশুর কাছে ভয়াবহ। সে চিলচিৎকার জোড়ে। হয়তো পেচ্ছাপও করে ফেলে। দড়ি ছিঁড়ে পড়লে শিবের সাধ্য নেই ওই শিশুটিকে বাঁচায়।

গাজন নিয়ে দশ কাহন হল। এ বার ছেদ টানি। তার আগে জানিয়ে রাখি পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় ওড়িশার বহরাগোড়ার গাজনও বিখ্যাত। সাক্ষী সুবর্ণরেখা নদী। পাঁচ মাইল দূরের মহুলডাঙরির (ঝাড়খণ্ড, ইস্ট সিংভূম) গাজনও সুন্দর। এখানেও সুবর্ণরেখা। এখানকার গাজনমেলায় ছৌ নাচের শিল্পী আসে ময়ূরভঞ্জ থেকে। এদের ছৌ শান্ত রসের। পুরুলিয়ার মতো লাফঝাঁপওয়ালা বীররসের নয়। ঝাড়খণ্ডের রানিবহালের গাজনও সুন্দর। চার দিকে পাহাড়-টিলা। গাজনমেলার দৃশ্যপটে এই পাহাড়-টিলা যুক্ত করে অতিরিক্ত সৌন্দর্য। এই আমার গাজন-অভিজ্ঞতা, ভোলেবাবার কৃপায়, পাঠক-করতলে নিবেদিত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here