payel samanta
পায়েল সামন্ত

‘মৎস্য ধরিব, খাইব সুখে।’ বাঙালির এই চিরন্তন ইচ্ছেটি বুকে চেপে আজকাল অবশ্য বলতে ইচ্ছে করে, ‘না ধরে শুধু খেতে পেলেই হয় তো!’ তাই নয় কি! তাহলে তো পয়লা মাঘ আদিসপ্তগ্রামের কাছে কৃষ্ণপুরের মাছের মেলায় আপনাকে আসতেই হচ্ছে!

শহরের বাজারে মৎস্যকুলের অবস্থা অনেকটা লাশকাটা ঘরের মতো। সেই সব ঘুরে অনেকেই জানতে চান, কৃষ্ণপুর কোথায়? শরৎচন্দ্রের জন্মস্থান দেবানন্দপুর থেকে খুব কাছেই কৃষ্ণপুর। জিটি রোড ধরে আদিসপ্তগ্রাম থেকে দেবানন্দপুর মোড়ে পৌঁছতে পারলেই কৃষ্ণপুর যাওয়ার লালমাটির অপ্রশস্ত রাস্তা আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। আবার ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে ভাঙা রাস্তায় অটো ছোটে দুরন্ত। মিনিট ১৫তেই অটো কৃষ্ণপুর ওরফে কেষ্টপুরে নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে হাফ কিমি হাঁটলেই রঘুনাথ দাস গোস্বামীর শ্রীপাট, বৈষ্ণবদের মিলনক্ষেত্র। অটোচালকের মুখেই শুনতে পাবেন হাঁকডাক— মাছের মেলা, মাছের মেলা!

সে প্রায় ৫০০ বছর আগেকার কথা। কথিত আছে, কেষ্টপুরের রঘুনাথ দাস গোস্বামী কৃষ্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন এই পয়লা মাঘের দিনটিতে। তার সঙ্গেই মেলার জন্ম জড়িয়ে। গল্পটা বলি। কৃষ্ণপুরের কাছেই সপ্তগ্রাম বন্দর। সপ্তগ্রামের রাজা ছিলেন হিরণ্যদাস মজুমদার। রাজার ভাইপো রঘুনাথ ছিলেন ধর্মকর্মে নিবেদিত প্রাণ। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পায়ে হেঁটে চলে যান পুরী। সেখানেই নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ পান তিনি। এরপর কেষ্টপুরে ফিরে তিনি মহাপ্রভুর দেওয়া কৃষ্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। দিনটা ছিল সেই পয়লা মাঘ। সেই থেকেই পয়লা মাঘ বসছে মেলা। কিন্তু বৈষ্ণবদের মেলার সঙ্গে মাছ নামক বস্তুটি জড়িত কীভাবে?

পরম বৈষ্ণব রঘুনাথ দাস যে অচিরেই জনপ্রিয় হয়েছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে তাঁর খ্যাতি নাম-যশেরও বৃদ্ধি ঘটে। সে সময় তাঁর ভক্তির পরীক্ষা নিতে এই শ্রীপাটেই হাজির হয়েছিলেন ৭০০ বৈষ্ণব। অসময়ে তাঁদের আবদারটিও ছিল ভারী চমকপ্রদ। ৭০০ বৈষ্ণবের অন্নগ্রহণের জন্য স্রেফ ইলিশ মাছের ঝোল আর আমের টকই লাগবে মাত্র। কৃষ্ণভক্ত রঘুনাথের প্রার্থনায় জমিদারবাড়ির পুকুরেই ধরা পড়েছিল জোড়া ইলিশ। মাঘের শীতে বাগানের গাছেও মিলেছিল আমের দেখা। ভক্তির এমন জয় হয়তো অনেক প্রহ্লাদের কথাই আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে! মহাভারতেও শ্রীকৃষ্ণ ভক্তিমতী দ্রৌপদীকে দুর্বাসা এন্ড কোংয়ের ক্ষুধানিবারণে সাহায্য করেছিলেন স্রেফ শাকান্ন দিয়ে। বলা ভাল, এই ঘোর কলিতেও সেই ভক্তির জোরেই আজও চলে আসছে মাছের মেলা।

মৎস্যজীবী, মৎস্যপ্রেমী আর মৎস্যলোভীদের এমন জমজমাট আসর খুব একটা দেখা যায় না বাংলায়। মাছের আগে অবশ্য মন চলে যাবে, শ্রীপাটের ভেতরের নামসংকীর্তনে, সেখানে ভক্তরা গোল হয়ে বসে। শ্রীপাটের পিছনে বাঁশবন আগলে রেখেছে একটা মাঠ। তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গতিহীন, মজে যাওয়া সরস্বতী নদী। একসময়ের সমৃদ্ধ বাণিজ্যক্ষেত্র সপ্তগ্রামের অনেক কথা মজে যাওয়া সরস্বতীর কচুরিপানায় চাপা পড়ে আছে। চর পড়েছে তার বুকে, সেখানে চড়ুইভাতির দল। গ্রাম থেকে আসা বিক্রেতারা চারপাশে বসে। সেখানে উপলক্ষ্য মাছ হলেও শিশুর প্লাস্টিকের খেলনা, চুলের ফিতে সবই মজুত। মেলার গ্রামীণ চেহারাটা আজও অটুট।

 শ্রীপাটের দ্বার টপকে আঁশটে গন্ধে শীতের রোদ মেখে ঘুরতে আপনার ভালোই লাগবে। প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে বসে পড়েছেন মাছ বিক্রেতারা। পেল্লাই বটিতে অতিকায় মাছের ধড়-মুণ্ড আলাদা হচ্ছে নিমেষে। কি নেই সেখানে! ২০-২৫ কিলোর সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প থেকে শুরু করে নাইলন টিকা, হালুয়া, ভেটকি, ভোলা, মাগুর, চিংড়ি, কালবোস, মৌরলা, পুঁটির চেনা ভিড়ে বেশ নজরকাড়া উপস্থিতি হলুদ ঘি সমৃদ্ধ সামুদ্রিক কাঁকড়াদের। সমুদ্র, নদী, খালবিলের মাছের অনেক প্রজাতিই আপনাকে চমকে দেবে। পাঁকাল, বান, পাঙ্গাস, রূপচাঁদা, কাঁচকি, বাঁশপাতা, খলসে, ফাসা, ন্যাদোসের অফবিট ঝলক মনে করিয়ে দেবে বাংলার সেইসব হারিয়ে যাওয়া মাছেদের কথা। শহরের বাজারে কৃত্রিম আলোর তলায় বরফের বিছানায় লাস্যময়ীর মতো শুয়ে থাকা ইলিশ,গুরজালি,পাবদা,আড়,ট্যাংরার বিলাসী প্রদর্শনী আপনাকে কতটা সুখী করে? এখানে এলে সে সুখের পারদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে প্রতি মুহূর্তে। শাল, শোল, বোয়াল, ল্যাটা, খয়রা, চ্যাংয়ের রাজ্যে আপনার মন হারিয়েও যেতে পারে বইকি! মনে পড়ে যাবে, শৈশবে কবে মায়ের হাতের রান্নায় বাতাসি, পুঁটি, চ্যালাদের স্বাদ পেয়েছিলেন!

মেলা থেকে মাছ কিনে অনেকেই কৃষ্ণপুর দেবানন্দপুরের আমবাগানে কলাবাগানে হাজির হন।উদ্দেশ্য জমিয়ে মৎস্য সহযোগে মহাভোজ। প্রথমতঃ মাছ, দ্বিতীয়ত মাছ, শেষ পর্যন্ত মাছের এই মেলাকে সার্থক করতে এলাকার বাড়িতে বাড়িতে অতিথিদের ভিড়। মাছ কেনার পাশাপাশি নানা ধরনের মাছ দেখার সুবর্ণ সুযোগ কি আর সবসময় পাওয়া যায়? কাজেই, বাজারের থলে্ হাতে বেরিয়ে পড়ুন পয়লা মাঘের মাছের মেলায়।

খেয়াল করে দেখবেন, শ্রীপাটের মাছদোকানি আর ক্রেতার দরাদরির মাঝে হরির নামগান মিশে যায় চাপা কান্নার মতো। সঙ্গে মানুষের আনন্দও। তবে ব্যাগ হাতে মৎস্যপ্রেমীদের হামলে পড়ার মধ্যে একটা সদম্ভ ঘোষণা লক্ষ্যণীয়— এ শ্রীপাটের মেলার মাছ বাবা! এর স্বাদই আলাদা!

ছবি: লেখক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন