papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

লালনীলসবুজের মেলা নিয়ে পৌষমেলা। হরেক কিসিমের, হরেক মানুষের, হারানো দিনের ফিরে পাওয়া এই মেলা। লালমাটির ধুলোওড়া শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা বহু বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। এ বারের শীতকালীন এই মেলাউৎসবে আমার মতো নতুন মুখ অনেকেই।

লোকমুখে শুনে শুনে খানিক আমিও ক্লান্ত যে শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা এখনও দেখা হয়নি। তাই স্রেফ একটা টেলিফোনের হুজুগে মেতে ভোর সাড়ে ছটাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম চারচাকাতে। মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্ত দ্বারে। মনে ছিল উত্তেজনা, আবার কিছুটা ধুকপুকুনি, শরীরটা ভাল নয়। খানিক বিশ্রাম নিতে নিতে যখন পৌঁছলাম তখন মাথায় অগ্নিদেব। প্রশাসনিক আঁটসাঁট চারধার। যাই হোক জামবনি বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি একরাতের জন্য একটা জায়গা মেলায় নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করলাম। একরাতের বাসস্থান থেকে জানা গেল পাঁচফোড়ন, পঞ্চব্যঞ্জন, আতিথ্য, ঘরে বাইরে, আমার কুটিরের হেঁশেল ঘর সহ নানা আবদার মেটানোর আহারের ব্যবস্থা। নামের আদরে কবির জয়গান। মনে মনে আওড়ে চলি এই আকাশে আমার মুক্তি।

কিছু দূর এগোতে চার চাকার গতি কমলো। চালক শামিম জানিয়ে দিল পার্কিং-এর জন্য লাইন দিতে হবে। অগত্যা আবার সেই দুর্বল শরীর নিয়ে আমি ভয় করব না ভয় করব না মন্ত্র জপতে জপতে হাঁটি হাঁটি পা পা। এক নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলাম। ধুলো উড়ছে, ওড়ারই কথা। মানুষের ধর্ম চটি ঘষে হাঁটা। নানা পসরার রঙিন ছবিতে মনে হয় বসন্তের আবাহন এখনই। শীতকালীন এই উৎসবে পিঠেপুলির চাহিদা বড় বেশি। ধোঁয়া ওঠা ফিসফ্রাইতে কামড় বসাতেই মনে পড়ে গেল বাড়িতে না বলে আসা দম্পতির প্রেমকথা। পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে কান পাততেই হল। ধায় যেন মোর সকল ভালবাসা প্রভু তোমার পানে, মন ছুটে গেল গানের দিকে।

শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের তৈরি হাতের কাজের দোকানে দাঁড়িয়ে কিছু কথা শোনা গেল। ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গায় সানাইয়ের বাদন। বৈতালিকের দল গৌরপ্রাঙ্গণ মুখরিত করেছে আজি যত তারা তব আকাশে। মনে মনে ভাবি, রবিকবির জায়গা, এ যে আমার পিতৃভূমি! এ বার থেকে মন চাইলেই ছুটে আসবো। মানুষ যতই রটাক না কেন হুজুগের দল তুলল ঝোলা চলল ভোলা। না, আমার মেলা দেখে ঘুরে মনে হয়েছে নবীনের দল তো আসবেই, কিন্তু ওই যে শত শত মাঝবয়সি, বা বেশ বৃদ্ধ যাঁরা, বহু প্রাক্তনী তাঁরা শুধুই প্রাণের টানে ছুটে আসেন। উত্তরায়ণ, ছাতিমতলা, আম্রকুঞ্জ, উপাসনা গৃহ, জহরবেদি সহ নানা জায়গাতে তাঁরা সেই অনুভূতিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে রামচন্দ্র বিদ্যাভাগিসের কাছে থেকে ব্রাহ্মমত গ্রহণ করেছিলেন ৬ পৌষ, ১২৫০ বঙ্গাব্দে। এই কারণে শান্তিনিকেতনের পৌষ উৎসব। কালের নিয়মে তার রূপ বদল হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাউল, শিল্পী, পসারিরা এসেছেন নিজেদের সম্ভার নিয়ে। বছরের শ্রেষ্ঠ গুণটিতে রূপ দিয়ে বিকিকিনির হাটে লাভের মুখ দেখার আশা করেন। মহামিলনের পুণ্যতীর্থে বিদেশি-স্বদেশি এক হয়ে যায়। তিন দিনের মেলা এই প্রথম ছ’দিনের জন্য চালু হল। আদিবাসী নৃত্যের পাশাপাশি ছৌ নাচ মানুষ টেনেছে বেশ। দিনের নানা সময় অনুষ্ঠান চলেছে। সঙ্গে ধামাকুলো, পটপাত্র, শাড়ির ছন্দে গয়না কেনা, হাতাখুন্তি, খোলবাদাম, পিতজাহাট, সরুচাকলি, আস্কে পিঠের পাশাপাশি কৃষিকাজের নানা কথায় ইলেক্ট্রনিক্সের সমাগম উজ্জ্বল।

শিল্পী সুধীরঞ্জনের আল্পনা

আমিও হুজুগে মেতে চলে এসেছিলাম উৎসবে যোগ দিতে। মনে আশা ছিল ৩২ বছর আগে দেখা দিদিবন্ধুর দেখা যদি পাই। ফোনে কথা সেই মতো হয়েছিল। মুঠোফোন থাকলেও মেলায় টাওয়ার থাকে না। কথা হয়েছিল প্রাণের টান যদি থাকে তাহলে দেখা হবে। কুড়ির কোঠায় থাকা আমরাও আজ মাঝবয়সী। দিনের শেষে এই মেলাপ্রাঙ্গণ মিলিয়ে দিয়েছিল আমাদের দুজনকে। আরও একটি আশা ছিল আলপনার কারিগর সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের শৈলি নিজের চোখে ছুঁয়ে দেখা। সে আশাও পূর্ণ করল আমার পিতৃভূমি। এই ভূমি অন্তর পূর্ণ করার জন্য ব্যাকুল। দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here