payel samanta
পায়েল সামন্ত

‘হয়তো মেলাতে বসেই আপনি এ-লেখাটি পড়ছেন। না হলে মেলাতে আসার সময় এখনো আছে।’ সৈয়দ মুজতবা আলির কথার রেশ ধরে বলতে গিয়েও ঠিক বলতে পারছি না যেন। কারণ, বাড়বাড়ন্ত দামের ফুলকপি, মটরশুঁটিতে হাত না দিতে পেরে এমনিতেই শীতে হাত কামড়াচ্ছে বাঙালি। তার মধ্যে দুনিয়ার মেলা আর উৎসব নিয়ে হাজির হয়েছে পৌষের ক্যালেন্ডার। চারদিকে খরচ আর খরচ! তার ওপরে মেলা?

কিন্তু এই তো ক’দিনের শীত! খরচের ধাক্কা সামলাতে তবে কি বাঙালি শীতের মেলায় যাবে না! চলুন না মথুরাপুর! গেলে বুঝবেন, মেলা মানে শুধুই খরচের ধাক্কা নয়!

‘ওএলএক্স’-এর হাত ধরে ‘হাফ প্রাইস’-এ পুরনো (তথাকথিত টার্মে ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’) জিনিস কেনার অভ্যেস বাঙালির চালু হয়েছে। মেলায় গিয়ে তেমনি পুরনো জিনিস কম দামে কেনার সুযোগ থাকলে নিশ্চয়ই আর দুঃখ থাকবে না। মথুরাপুরের দক্ষিণ বিষ্ণুপুর গ্রামে পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হয় এমনই সব পুরনো জিনিসপত্রের মেলা, সবাই বলে ভাঙা জিনিসের মেলা। আদতে এই মেলা পৌষ সংক্রান্তির মেলা যা চলে প্রায় এক মাস ধরে। সঙ্গে চলে মথুরাপুর গ্রামীণ বইমেলাও। সেটা দেখে নিতে ভুলবেন না যেন।

ভাঙা জিনিসের এই মেলা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। অনেকের মতে, গঙ্গাসাগরের পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এটিই সবচেয়ে বড় মেলা। বহু বছর ধরেই ওই গ্রামে হয়ে আসছে এমন বিচিত্র মেলা। ভিড় করেন আশেপাশের গ্রাম থেকে পুরনো জিনিসে আগ্রহী মানুষজন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় জিনিস, তার সবই আছে। তবে কোনওটাই নতুন নয়, সবই সেকেন্ড হ্যান্ড গোত্রের। কী চান আপনি! ইলেকট্রনিক গুডস থেকে বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি কি নেই!

অদ্ভূত শুনতে লাগলেও এটা সত্যি। শিয়ালদহ থেকে ১৫ টাকা খরচ করে টিকিট কাটুন মথুরাপুর রোডের। ব্যাস, স্টেশন থেকে ১০ মিনিট হেঁটে পৌঁছে যান পুরনো এই মেলায়। ঝাঁ চকচকে শহুরে মেলার ছাপ যে এখানে মিলবে না, সেটা তো আপনি ধরে নিয়েই আসবেন। কিন্তু পৌঁছে দেখবেন তথাকথিত গ্রামের মেলার ছাপও অনেকটাই মিসিং। রয়েছে রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন রাইড, অঢেল পসরা।

কথিত আছে, নবদ্বীপ থেকে শ্রাচৈতন্য ওড়িশা রওনা দেওয়ার কালে মকর সংক্রান্তির দিনই এই স্থানে রাত্রিবাস করেছিলেন। তখন এখান দিয়ে গঙ্গা বইত। আজ গঙ্গা এখানে না থাকলেও রয়ে গিয়েছে ইতিহাস। তাই পৌষ সংক্রান্তির পূণ্যদিনে এখানকার মহাশ্মশান সংলগ্ন পবিত্র পুকুরটিতে চলে পুণ্যার্থীদের স্নান পর্ব। সেই উপলক্ষ্যেই এই মেলার আয়োজন।

কিন্তু কালচক্রে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ভাঙাচোরা পুরনো জিনিসপত্রের মেলায় পরিণত হয়েছে এই সংক্রান্তির মেলা। এখানে দেখা মিলবে— বাতিল আস্ত কম্পিউটার, তার কি-বোর্ড, মনিটর, এমনকি টেবিলও! পুরনো ক্যালকুলেটর, রেফ্রিজারেটর, মাইক্রোওয়েভ, টোস্টার, সাউন্ডবক্স এমনকী ভ্যাকুয়াম ক্লিনারও! ফেলে দেওয়া তক্তোপোশ, বাতিল কার্পেট, শয্যার খাট থেকে বহু ব্যবহারে জীর্ণ বাচ্চাদের কাঠের দোলনাও মজুত এই মেলাতে। আছে হাতলভাঙা প্যারামবুলেটর, সাদাকালো ছোটো মোবাইল, রং চটা স্যুইচবোর্ড, কাঁচে দাগওয়ালা রিচার্জেবল টর্চও। সংগ্রহগুলো খুঁটিয়ে দেখলে প্রশংসা করতেই হয়! গেরস্থালির জিনিসে পাবেন বইপত্র, ফুলদানি, ধূপদানি, আয়না থেকে বঁটি বা কাঁচি ছুরিও। বোঝাই যায়, বিক্রেতারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসব সংগ্রহ করেছেন।

শখের বস্তু খুঁজছেন, দামের জন্য কুলোতে পারছেন না? খুঁজে দেখুন, ক্যামেরা, টিভি, পুতুল থেকে শুরু করে বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাওয়া টেপ রেকর্ডার, ঝাড় লন্ঠনও আছে। এমপিথ্রি নামের বস্তুটি বাজারে এসে যাওয়ায় সব বাড়িতেই বাতিলের তালিকায় চলে গিয়েছে টেপ রেকর্ডার। সেই স্মৃতিটাই আরেকবার ঝালিয়ে নিতে পারেন সেকেলে দামি দামি টেপ রেকর্ডারগুলো দেখে দেখে। না কিনলেও দেখবেন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এমন অনেক কিছুই আমাদের বাতিল হয়ে গেছে। মেলায় ঘুরলে দেখবেন টেপ রেকর্ডার, টাইপ রাইটারের সংখ্যাই এখানে বেশি। আবার হালফিলের স্মার্টফোন থেকে ফেলে আসা আদিযুগের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট মোবাইল ফোনেরও দেখা পাবেন। ফ্যানের তিনরকম ভাগই মিলবে— সিলিং, টেবিল ও স্ট্যান্ড। মোট কথা, যেন সব পেয়েছির আসর!

এ তালিকা যে শেষ হওয়ার নয়, তা আশা করি বুঝেছেন। কাজেই বেরিয়ে পড়ুন মথুরাপুর। এই খরচের বাজারে বলুন, মন চলো মথুরাপুর।

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here