রমজানের শেষে এল খুশির ঈদ

0

শাকিলা খাতুন

মাসব্যাপী রমজান শেষ। বৃহস্পতিবার ঈদ-উল-ফিতর, খুশির ঈদ।

উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে। ইসলাম-এ কঠোর অনুশাসন থাকলেও বৈরাগ্য নেই। পৃথিবীর আর সমস্ত জনজাতির মতোই উৎসব পালনের রীতিনীতির কথা মহানবী বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বের প্রায় সমস্ত জাতি আনন্দ-উৎসব প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি দিবস পালন করে। নিজের ধর্মের কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা, জন্ম বা মৃত্যুদিনকে কেন্দ্র করে তা নির্ধারিত হয়। মুসলিম শাস্ত্রে অর্থাৎ ইসলামে মহানবী হজরত মহম্মদ (সঃ) দু’টি খুশির ঈদ পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলিমদের পরবের সমস্ত প্রথা, রীতিনীতি চান্দ্রমাস অনুযায়ী চালিত হয়। শবে বরাত পরবের চান্দ্রমাস শাবান — রমজানের প্রস্তুতির মাস। ঈদ-উল-ফিতর-কে ফিতরা দান করার ঈদ-ও বলা হয়। প্রত্যেককে অবশ্যই ফিতরা দিতে হয়। যাঁর সামান্য আয়, তাঁকেও ওই ফিতরার সামান্য অর্থ দান করতেই হয় এবং সেটা ঈদের নামাজের আগে দেওয়াই কর্তব্য। ঈদ-উল-ফিতর উৎসব সম্পর্কে জানতে হলে রমজানের কথা জেনে নিতে হবে। তা না হলে গোটা বিষয়টাই অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

শাবান চান্দ্রমাস শেষে রমজান মাস। চাঁদ দেখে রোজা আরম্ভ হয়। এক মাস চলে নির্জলা উপবাস। রোজা (সিয়াম) হল ইসলামের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের অন্যতম। বাকিগুলি হল নামাজ, কালেমা, যাকাত এবং হজ। ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠারও পূর্বে রোজা বিভিন্ন মানবমণ্ডলীর জন্য ফরজ বা অবশ্যকর্তব্য রূপে বিবেচিত হত। হিজরত-এর দ্বিতীয় বর্ষে রোজা মুসলিমদের জন্য ফরজ হয়। বারোটি মাসের মধ্যে সব চেয়ে পুণ্যের মাস হল এই রমজান মাস। এই মাসের একটি রাত লায়লাতুল-কদর রূপে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মহত্ব অপরিসীম। রমজান মাসে পবিত্র কুরান অবতীর্ণ হয়েছিল। প্রত্যেক ইমানদারের জন্য রমজানের রোজা অবশ্য করণীয়। অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে কাজাহ অর্থাৎ অসুস্থ বা সফরে থাকার দিন ক’টি অন্য সময়ে উপবাস করে এক মাস পূরণ করতে হয়। তা ছাড়া একেবারে অক্ষম, কঠিন রোগগ্রস্ত হয়ে অপারগ হলে এক জন অভাবী মানুষকে খাবার দান করতে হয়। রাতের কৃষ্ণরেখা দেখা থেকে ঊষার শুভ্ররেখা স্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হওয়া পর্যন্ত পানাহার করা যায়।

রমজান মাস আসে ক্ষুধাতৃষ্ণার কষ্ট অনুধাবন করার শিক্ষা নিয়ে, কষ্ট অনুভব করে দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্যই রোজা। রোজা করা ও শেষ করার মধ্য দিয়ে সময়ানুবর্তিতা শেখা যায়। উপবাস শুরুর আগে যে খাওয়া তাকে সেহরি আর সন্ধ্যায় মাগরিবের আজান শুনে যে খাবার দিয়ে উপবাস ভঙ্গ হয়, তাকে ইফতার বলে। নির্জলা উপবাস বা রোজা করতে হয় এক চান্দ্রমাস। কখনও তিরিশ দিন কখনও বা ঊনত্রিশ দিন রোজা চলে। রমজানে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকাই নয়, অশ্লীল কথাবার্তা, গালিগালাজ, পরচর্চা-পরনিন্দা সহ সমস্ত রকম কুকর্ম করা থেকেই তো বটেই, সেই সব চিন্তা থেকেও নিজেকে মুক্ত রাখতে বলা হয়েছে।

অন্য দিকে আছে রমজানের আনন্দ। ঈদ-উল-ফিতর-এর প্রস্তুতিপর্ব। ছোটরাও আগ্রহ আর অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে আনন্দের সঙ্গে রোজা করে। সেহরি আর ইফতারের জন্য নানা রকম সুস্বাদু খাবার তৈরি হয়। ইফতার সাজানো হয় বিভিন্ন রকমের ফল, ঠান্ডা পানীয়, শরবত-ছোলা, তেলেভাজা কখনও বা পরোটা, বিরিয়ানি, স্পেশাল হালিম দিয়ে। খেজুর খেয়েও উপবাস শেষ করার প্রথা আছে। রমজান শুরুর দিন সন্ধ্যার পর আরম্ভ হয় তারাবিহ -– রাতের বিশেষ নামাজ, যা সারা রমজান মাস ধরে চলে।mehe

রমজান শেষ হলে শাওয়াল চান্দ্রমাসের প্রথম তারিখে অর্থাৎ চাঁদ দেখা গেলে ঈদ-উল-ফিতর, মুসলিমের প্রধান উৎসব পালিত হয়। দীর্ঘ এক মাস রোজা করার পর আসে ঈদ-উল-ফিতর, শান্তি ও সম্প্রীতির মিলনোৎসব। ঈদ হল বিশ্বাসী মানুষের পুরস্কার। শাব্দিক অর্থে ঈদ মানে খুশি হলেও প্রকৃত অর্থে ঈদের আরও নানান তাৎপর্য আছে। আল্লাহর স্মরণ ও শ্রেষ্ঠত্বকে সামনে রেখে সম্মিলিত ভাবে আনন্দের পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। ইসলাম আনন্দের প্রতি আগ্রহকে অবহেলা করে না, বরং উৎসব উদযাপনে পরস্পরের মধ্যে আদানপ্রদান বাড়ে, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার ব্যবস্থা ও অবস্থা তৈরি হয়। তাই নবী (সঃ) মুসলিমদের উৎসব উদযাপনে অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যে ভাবে প্রাচীন যুগে অর্থাৎ সেই সময়কার আরব সমাজে পরব পালিত হত, সে ভাবে নয়। কী ভাবে ? হাদিস-এ উল্লেখ আছে, মহানবী মদিনায় উপস্থিত হয়ে দেখেন ওখানকার জনগোষ্ঠী দু’টি উৎসব পালন করে, ওই উৎসব উপলক্ষে আনন্দ-অনুষ্ঠান চলে। উৎসব দু’টি হল শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ এবং বসন্ত পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান’  উৎসবের উদযাপনরীতি ছিল ইসলামের পরিপন্থী। শ্রেণিবৈষম্য ও ঐশ্বর্যের অহমিকায় পূর্ণ ওই দু’টি উৎসব ছ’ দিন ধরে চলত। বারোটি দিন বিভিন্ন শ্রেণির জন্য পৃথক ভাবে ভাগ করে দেওয়া হত। হতদরিদ্র ও নিঃস্বদের পরবে যোগদানের কোনও অধিকার ছিল না। ইসলাম সাম্যবাদী। শ্রেণিবৈষম্য-নির্ভর ও শালীনতা-বিবর্জিত উৎসবের জায়গায় মহানবী দু’টি পরব ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদ-উল-আযহা বা কুরবানির ঈদ উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।namaz

রমজান শেষে নতুন চাঁদ দেখে সকালে মসজিদে মসজিদে, ঈদগাহ-এর মাঠে নামাজ অর্থাৎ বিশেষ প্রার্থনা করেন মুসলিমরা। প্রেম, ভালোবাসা, মিলন, ঐক্য, সংহতির উৎসব ঈদ। ঈদের নামাজে পুরুষদের বেশি দেখা গেলেও মহিলাদের নামাজের অধিকার আছে সমান ভাবে। কিন্তু নারী, পুরুষ এক সঙ্গে জামাত বা প্রার্থনায় দাঁড়ায় না। ধনীদরিদ্র নির্বিশেষে নিজেদের সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরে এক সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে। প্রার্থনা শেষে ঈদ মিলন হয়। পরস্পর আলিঙ্গন ও শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। তিন দিন ধরে চলতে থাকে কোলাকুলি এবং শুভেচ্ছা বিনিময়। প্রত্যেকের বাড়িতে নানা ধরনের উপাদেয় খাবারের পাশাপাশি তৈরি হয় বিশেষ রেসিপি -– সিমাই-লাচ্ছা, ফিরনি, বিরিয়ানি, আরও নানা রকম পদ। সমস্ত রকম বিদ্বেষ ভুলে মোবারকবাদ জানানো হয়, যাতে সৌহার্দ্য বজায় থাকে, ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। এবং এক সর্বাঙ্গসুন্দর সমাজ গঠিত হতে পারে। এটাই ঈদ-উল-ফিতর-এর বিশেষ লক্ষ্য ও তাৎপর্য।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন