‘শিব বলে পার্বতী/তুমি হইলা যুবতী/আমি হইলাম জটাধারী…

0
312
charak festival
তপন মল্লিক চৌধুরী

মেলা বাংলাদেশের লৌকিক ও জনপ্রিয় উৎসব। এ দেশে মেলার উৎপত্তি মূলত গ্রাম-সংস্কৃতি থেকে। গবেষকদের মতে, বাংলায় নানান ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান ও উৎসবের সূত্র ধরেই মেলার উৎপত্তি। সে দিক দিয়ে এ দেশের মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরেরও বেশি। প্রাচীন পর্যায়ের উৎসব ও কৃত্যানুষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে জীবনধারণের আহার্য কৃষিশস্য এবং বিশেষ করে কৃষির সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত রোদ ও বৃষ্টির কথা। প্রাচীন বাংলার মানুষ চাঁদ ও সূর্যকে বুড়োবুড়ি নামে অভিহিত করেছে এবং এর ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়েছে বুড়োবুড়ির মেলা। উল্লেখ্য, এই মেলা পরবর্তীতে সূর্যমেলা, সূর্য ঠাকুরের ব্রত, চৈত্রসংক্রান্তি  ব্রতর মেলা, চড়কমেলা ও শিবের গাজনমেলায় রূপ নিয়েছে।

নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের জয় কামনা করে সে বছর পয়লা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে নববর্ষ আর মকর সংক্রান্তি বা চৈত্রসংক্রান্তি কোথাও কোথাও মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামেগঞ্জে আয়োজিত হয় নীলপূজা বা চড়কপূজা। কেউ বলে শিবের গাজন। চড়কমেলায় বাণ-বঁড়শি ফুঁড়ে মানত পূর্ণ করে এক দল বিশ্বাসী মানুষ। চড়কমেলার মধ্যেই বিশাল মেলার আয়োজন হয় বিভিন্ন স্থানে। এ সময়ের লোকাচারগুলোও উপভোগ্য।

gajan festival pic 1
গাজনে বাণ ফোঁড়া।

‘শিব বলে পার্বতী/তুমি হইলা যুবতী/আমি হইলাম জটাধারী/তাতে তোমার ক্ষতি কি?’

হর-পার্বতী বা শিব-দুর্গা সেজে দু’জন লোক গান গেয়ে গেয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গে থাকে ভরা চৈত্রের রোদ পোড়া একদল দুরন্ত কিশোর। দলে থাকে একজন শিব ও দু`জন সখী। সখীদের পায়ে থাকে ঘুঙুর। তাদের সঙ্গে থাকে ঢোল-কাঁসরসহ বাদক। সখীরা গান ও বাজনার তালে তালে নাচে। এদের নীল পাগলের দলও বলা হয়, আবার অষ্টকের দলও বলা হয়। এরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাজনের গান গায় এবং নাচ-গান পরিবেশন করে। বিনিময়ে দান হিসেবে যা কিছু পাওয়া যায় তা দিয়ে হয় পুজো। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে যা চড়ক সংক্রান্তির মেলা নামে পরিচিত।

বাংলার হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুতত্বপূর্ণ লোক-উৎসব এটি। চৈত্রের শেষ দিন এই পুজো অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু প্রস্তুতি চলে এক মাস আগে থেকে। সমাজের সাধারণ লোকদের মধ্যে এই অনুষ্ঠানের প্রচলন খুব প্রাচীন নয়। তবে পাশুপত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীন কালে এই উৎসব প্রচলিত ছিল। ভূমিকেন্দ্রিক সভ্যতার এই দেশে ফসলের উর্বরতা প্রার্থনা থেকে এই পুজোর উৎপত্তি বলে উল্লেখ আছে। উর্বরতা শুধু জমিতে নয়, ঘরেও। যে কারণে চড়কের গাছ যে আঙ্গিকে পোঁতা হয়, তা পুরুষাঙ্গের আকৃতি বলেই ধরা হয়। এ জন্য চড়কগাছ যে দিন পুকুর থেকে ওঠানো হয় সে দিন যে সব বিবাহিত মহিলার সন্তান হয় না তাদের ওই পুকুরে স্নান করানো হয় সন্তান হওয়ার প্রত্যাশায়। চড়ক ঘোরার বিষয়টি চান্দ্র মাসের পরিচয় বহন করে।

gajan festival pic 2
গাজনে দণ্ডি কাটা।

আধি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল, নাম চিত্রা। চিত্রার নামানুসারে এক নক্ষত্রের নাম করা হয় চিত্রা। চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ। তাই হিন্দু ধর্মে চৈত্র মাসের বিশেষ স্থান। চৈত্র মাসের শেষ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বসে বিধাতাকে তুষ্ট করার নানান আয়োজন। এর মধ্যে সব চেয়ে অভিনব ও প্রাচীন আয়োজন চড়কপুজো, সেই সঙ্গে মেলা। চড়কপুজোর ১০-১২ দিন আগে থেকে বিভিন্ন এলাকার পূজারিদের মধ্যে ৪০-৫০ জন সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত হয়ে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিব-গৌরীসহ নৃত্যগীত করে মাগন করেন। চড়কপূজা পর্যন্ত তারা পবিত্রতার সঙ্গে সন্ন্যাসব্রত পালন করে ও নিরামিষ খায়, সারা দিন উপবাস পালন করে। চড়কপুজোর দু’ দিন আগে থেকে পূজারিরা শ্মশানে গিয়ে পুজো-অর্চনা করে ও শেষে গৌরীর বিয়ে, গৌরী নাচ ও বিভিন্ন গান গেয়ে ঢাকের বাজনায় সরগরম করে গোটা এলাকা প্রদক্ষিণ করে। চৈত্র মাসের শেষ দিন পূজারিরা পুজো করে পান বাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রণ জানায়। দিঘি বা পুকুর থেকে চড়কগাছ তুলে আনা হয়। তার পর মাঠে গাছ পুঁতে দেওয়া হয়। গাছের চূড়া থেকে প্রায় কোমর পর্যন্ত আড়াআড়ি চারটি পাখার মতো করে বাঁধা হয় চারটি মোটা বাঁশ এবং তাতে যুক্ত করা হয় মোটা-লম্বা দড়ি। এই সময় শিব ও কালীর নৃত্য হয়। নৃত্য শেষে ওই পুকুর বা দিঘিতে স্নান করে সন্ন্যাসীদের জিব ও নাকে গহনা গেঁথে দেওয়া হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়কগাছ ঘোরানো হয়। দেবতার পূজা-অর্চনা শেষে দুপুরে মূল সন্ন্যাসী চার জনের (কখনও এক বা দু’ জন) পিঠে লোহার দু’টি বড়শি গেঁথে দড়িতে বেঁধে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়।

চড়কপুজো মূলত নীলপুজো নামেই পরিচিত। গম্ভীরা বা শিবের গাজন এই চড়ক পুজোরই রকমফের। চড়কপুজো চৈত্রসংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিবসে পালিত হয়। পতিত ব্রাহ্মণ এ পুজোর পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন। পুজোর বিশেষ অনুষঙ্গ হল শিবের পুজো। একটা সাজানো কাঠ তাতে লালসালু প্যাঁচানো, সিঁদূর মাখানো থাকে মাথার দিকটায়। এই পাট বা শিবকে একজন মাথায় নেয় আর বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। এর সামনে কোনো গর্ভবতী মহিলা পড়লে তার বিপদের আশঙ্কা থাকে বলে মনে করা হয়। এ সব পুজোর মূলে রয়েছে ভূতপ্রেত ও পুনর্জন্মের ওপর বিশ্বাস। এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রাচীন কৌমসমাজে প্রচলিত ছিল। এই পুজোতে বা উৎসবে বহু ধরনের দৈহিক যন্ত্রণা ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। চড়কগাছে ভক্ত বা সন্ন্যাসীকে লোহার হুড়কো দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। তার পিঠে, হাতে, পায়ে, জিবে এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ-শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনও কখনও লোহার শলাকা তার জিভে ফুঁড়ে দেওয়া হয়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এই নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনও তা প্রচলিত রয়েছে। আধুনিকতার অভিঘাতে ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলির চারিত্রিক পরিবর্তন হচ্ছে। তার পরও মেলা শ্রেণিহীন উৎসব। এর কোনো বিকল্প নেই। গ্রামবংলার মেলার এই আবেদন মনে হয় শেষ হওয়ার নয় কখনও।

ছবি সৌজন্যে ফ্লিকার

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here