chariot of mayra house of kashinagar
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

তখনকার দিনে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে রক্ষণশীল পরিবারের কর্তারা সখ-আহ্লাদ পূরণ করার জন্য অন্য উপায় খুঁজতেন। বেশির ভাগ বাড়ি পুজোপাব্বণকেই বেছে নিত। সেই ভাবে শুরু ময়রাবাড়ির রথ উৎসব। দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে মথুরাপুর স্টেশন থেকে রায়দিঘি সড়কপথে অটো, ট্রেকার বা বাসে কাশীনগর গ্রাম। এই গ্রামে বিখ্যাত ‘জগন্নাথ বাড়ি’র কর্তা মতিলাল ময়রা ১৩৩৮-এ জগন্নাথদেবকে নিজ গৃহে প্রতিষ্ঠা করেন।

এক বা দুই নয়। একবারে ষোলো চূড়ার রথ, সাজানো থাকত ছোটো ছোটো ঘণ্টিতে। আর সেই রথ যখন চলত তখন মনে হত জগন্নাথদেব যেন পায়ে নূপুর পরে চলেছেন। সেই নিক্বণধ্বনি বাড়ির মানুষজনের মনে গেঁথে গিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এক এক করে খুলে গিয়েছে ঘণ্টি। ক্রমে মিলিয়ে গিয়েছিল সেই ধ্বনি। ময়রাবাড়ির এই রথ উৎসব যখন ২০০৬ সালে ৭৫ বছরে পড়ল সেই বছর আবার সাজানো হয়েছিল। বাড়িসূত্রে জানা গিয়েছে, সেই সাজানো এখনও থাকে তবে উৎসবের পরে ঘণ্টি খুলে রাখা হয়।

রথের রশিতে টান পড়লে মনে হত যেন কেউ ছমছম করে যাচ্ছেন। রাতে কান পাতলে আজও মনে হয় কেউ নূপুর পরে চলেছে। কিন্তু বাড়ির আরাধ্য দেবতা তো শান্তশিষ্ট। তিনি এক জায়গায় আসীন। তবে এ কীসের ধ্বনি? ছম-ছম-ছম। এমনটাই মনে হয় ময়রাবাড়িতে আজও।

lord jagannath's chariot of kashinagarজগন্নাথদেব প্রতিষ্ঠা হল ২১ ফুট উঁচু রথে। কিন্তু এত বড়ো রথ থাকবে কোথায়? উপায় বাতলে দিলেন তৎকালীন জমিদার বরদাপ্রসাদ রায়চৌধুরী। জায়গা দিলেন থাকার আর পথ দিলেন রথ চলার। রক্ষণশীল বাড়ির ঠাটবাট বজায় রাখতে মতিলালবাবু একা জগন্নাথকেই প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন। রথযাত্রার পরে দেবতা থাকবেন কোথায়? সখ্য পাতানো হল এলাকার গঙ্গাবিষ্ণু ঘরামির (রায়) সঙ্গে। মাসির বাড়ি পাতানো হয়ে গেল। রথ গিয়ে দাঁড়াল তেলিপুকুরের ধারে আর দেবতা চলে যান মাসির ঘরে।

সেই থেকে ময়রাবাড়ির বিরল উৎসব একা জগন্নাথ ঘিরে। এই বছর উৎসব ৮৭ বছরে পা দিল, জানালেন বাড়ির সদস্য কৃষ্ণপদবাবুর ভাইপো পার্থ ময়রা। ঘনঘোর আকাশের মধ্যে হইহই করে রথ বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। সঙ্গে চলল নামসংকীর্তন সহযোগে ভক্তের দল। এক দিনের জমজমাট এই মেলায় কৃষ্ণচন্দ্রপুর, বাপুলিবাজার, কৌতলা, সুধিরহাট, চাঁদপাশা, অর্জুনতলা, পুরন্দরপুর থেকে বহু মানুষ এই উৎসবে যোগ দিয়েছেন। ময়রাবাড়ির জগন্নাথ খেতে ভালোবাসেন ক্ষীরের সন্দেশ, নারকেলনাড়ু। মাসির বাড়ি থেকে ফিরে নিজের বাড়িতে আহার করেন পাঁচ রকম ভাজা, নানা তরকারির সঙ্গে গব্যঘৃতের লুচি। এই আহারের পদ নিয়ে আরও এক আনন্দের বন্যা বয়ে যায় বাড়িতে।

ছবি: পার্থ ময়রা

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here