গণেশের সৃষ্টি কী ভাবে হল? জেনে নেওয়া যাক নানা কাহিনি

0

পাপিয়া মিত্র

পার্বতী-পুত্র লম্বোদর বা গণেশ প্রধানত ভারতের পশ্চিমাংশের আরাধ্য দেবতা হলেও ভারতের নানা স্থানে এই পুজোর প্রচলন আছে। এখন এই বঙ্গেও ধুমধাম করে পুজো হচ্ছে গণেশের। পাড়ার অলিতেগলিতে গণেশপুজো ছড়িয়ে গিয়েছে। আমাদের জাতীয় উৎসবের সূচনা এই গণেশপুজো দিয়েই।

হিন্দু ধর্মের মানুষের কাছে মূলত প্রধান ব্যবসায়িক-দেবতা হলেও গণেশ আমাদের কাছে এক বিঘ্নবিনাশকারী দেবতা। নারদের কথায়, প্রণম্য শিরসা দেবং গৌরীপুত্রং বিনয়কম্‌। ভক্তবাসং স্মরেত্রিতমায়ুঃ কামার্থসিদ্ধয়ে।। ইনি ভক্তের কামনা-বাসনা মিটিয়ে দেন।

গণপতি বা গণেশ মূলত লৌকিক দেবতা। ভারতীয় বিভিন্ন পুরাণ সাহিত্যে গজমুণ্ডধারী গণেশের জন্মবৃত্তান্তও নানা ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

শিবপুরাণের কাহিনি  

শিবপুরাণ মতে, একদিন পার্বতী কোনো এক পুকুরে স্নানে নামার আগে কাদা দিয়ে একটি পুতুল তৈরি করে তাতে প্রাণ দেন। তাঁকে নজরদারির কাজে দাঁড় করিয়ে বলে যান যেন কেউ পুকুরের দিকে না যায়। হঠাৎ সেখানে মহাদেব উপস্থিত হলে সেই পুতুল তাঁকে চিনতে না পারায় ত্রিশূলের আঘাতে তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করেন। পার্বতী ফিরে এসে তা দেখে রাগে বিশ্বসংসার ধ্বংস করতে উদ্যত হন। সৃষ্টি রসাতলে যেতে বসেছে দেখে দেবতারা অস্থির হয়ে একটি একদন্তী হস্তীমুণ্ড এনে পুতুলের মাথায় বসিয়ে দিলেন। সেই থেকে কাদার পুতুল শিবপুত্র ‘গণেশ’ নাম নিলেন।

বরাহপুরাণের কাহিনি  

বরাহপুরাণ মতে, পরমাসুন্দরী উমার মুখদর্শনে প্রীত হয়ে মহাদেবের হাসি থেকে এক অনিন্দ্যসুন্দর কুমারের জন্ম হয়। সেই কুমারের রূপে জগৎসংসার এমনকি দেবী উমাও মোহিত হয়ে পড়লে স্বয়ং মহাদেবও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন। অভিশাপ দেন, হস্তীমুখ, লম্বোদর হওয়ার।

লিঙ্গপুরাণের মত

পাশাপাশি লিঙ্গপুরাণ জানাচ্ছে, দৈত্যদের অত্যাচারে দেবতারা অতিষ্ট হয়ে মহাদেবের শরণ নিলে তিনি পার্বতীর গর্ভে অধিষ্ঠান করে গজমুণ্ড গণেশ রূপে জন্ম নেন। অসুর-দৈত্যদের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করেন।

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের কাহিনি

আবার ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ মতে, কৃষ্ণ অবতার রূপে পার্বতীপুত্র গণেশ হয়ে জন্ম নিলেন। কিন্তু শনির দৃষ্টিতে মাথা খসে গেলে নিজের সুদর্শন চক্র দিয়ে হস্তীমুণ্ড ছেদন করে নিজ-অবতারের স্কন্ধে স্থাপন করেন। দেবস্থিত যে সব স্থানে বিষ্ণুর দশ অবতারের ছবি বা মূর্তি ব্যবহার হয়, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে গণেশ বা জগন্নাথ থাকেন।

স্কন্দপুরাণের কথা

আবার অবাক হতে হয় স্কন্দপুরাণের কথা শুনলে। পার্বতীর গর্ভাবস্থার সময় সিন্দুর দৈত্য গর্ভে প্রবেশ করে সন্তানকে মুণ্ডহীন করে দেওয়ায় গণেশ কবন্ধ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। তখন নারদের পরামর্শে ওই শিশু-গণেশ নিজেই গজাসুরের মুণ্ডু নিজের কাঁধে বসিয়ে নেন।

বৃহদ্ধর্মপুরাণ কী বলে

একই ভাবে বৃহদ্ধর্মপুরাণ জানায়, পার্বতী পুত্রকামনা করলে শিব লালপাড় শাড়ির আঁচল দিয়ে একটি পুতুল তৈরি করেন। কিন্তু তাঁর হাত থেকে পড়ে পুতুলটির মুণ্ড খসে যায়। শিবের নির্দেশে নন্দী দেবরাজ ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাজিত করে তাঁর বাহন ঐরাবতের মুণ্ড কেটে ওই পুতুলে বসিয়ে দেন। ওই হস্তীমুণ্ড যুক্ত পুতুলই গণেশ।

হিন্দু ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রে গণেশই একমাত্র দেবতা যিনি যে কোনো পূজার আগে পূজিত হন। সঙ্কটনাশক এই দেবতা সম্বন্ধে নারদ, গণপতির ১২টি নামের উল্লেখ করেছেন। প্রথমং বক্রতুণ্ডং চ একদন্তং দ্বিতীয়কম্‌। তৃতীয়ং কৃষ্ণপিঙ্গাক্ষং গজবক্রং চতুর্থকম্‌।। লম্বোদরম পঞ্চমং চ ষষ্ঠং বিকটমেব চ। সপ্তমং বিঘ্নরাজেন্দ্র ধুম্রবর্ণ তথাষ্টমম্‌।। নবমং ভালচন্দ্রং চ দশম তু বিনায়কম্‌। একদশম গণপতিং দ্বাদশং তু গজাননম্‌।। সারা বছর ধরে এই নাম স্মরণ করলে সকল বিপদআপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.