শুভদীপ রায় চৌধুরী

দুর্গার আরাধনা বহু দিন ধরেই চলে আসছে এ দেশে। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের তন্ত্রসারে দুর্গাপুজোর বিবরণ রয়েছে। এই গ্রন্থে দেবীর যে ধ্যান রয়েছে সেখানে তিনি চতুর্ভূজা, সিংহবাহিনী, শঙ্খ-চক্র-ধনুর্বাণধারিণী, মরকতবর্ণা। এই তন্ত্রসার গ্রন্থেই রয়েছে দেবী দুর্গার ‘মহিষমর্দিনী’ মন্ত্র। মহিষমর্দিনী দেবীর দেহকান্তি মরকতমণির ন্যায়, ইনি মণিময় মুকুট ও কুণ্ডল দ্বারা শোভামানা, ত্রিনয়না এবং মহিষের মস্তকে উপবিষ্টা।

আবার দেবীভাগবতের মতে, পরমাব্রহ্মরূপিণী প্রকৃতি দুর্গা, রাধা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও সাবিত্রী – এই পঞ্চবিধ রূপ ধারণ করেছিলেন। প্রকৃতির প্রধান অংশরূপিণী কমলানয়না কালী, দুর্গার ললাট থেকে শুম্ভ-নিশুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধকালে আবির্ভূতা হয়েছিলেন। তিনি দুর্গার অর্ধাংশরূপিণী হলেও তেজে ও গুণে তাঁরই সমতুল্যা। তিনি কোটি সূর্যসম উজ্জ্বল বিগ্রহধারিণী, সমস্ত শক্তির মধ্যে প্রধান বলস্বরূপা ও পরম বলবতী।

আরও পড়ুন: দুর্গাপুজোয় দেবীর চক্ষুদানের সময় প্রতীকী বলিদান হয় চুঁচুড়ার মণ্ডল পরিবারে

প্রসঙ্গত দেবীদুর্গার নানা রূপের মধ্যে বনদুর্গার নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। শুভ কাজে কোথাও কোথাও এই দুর্গার পুজো হয়ে থাকে। বনদুর্গাও তন্ত্রের দেবী। বনদুর্গা মদমত্তা, তাঁর মহালোচন অঘূর্ণিত তাঁর মুখমণ্ডল ভীষণাকার, মস্তকে জটাভার, গলদেশে নরকপালের মালা। বস্তুতপক্ষে এই বনদেবীর উল্লেখ আমরা আরও বেশি পাই চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে, কারণ দেবী চণ্ডীর প্রকৃত নাম ‘অভয়া’, তাই চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের অপর নাম ‘অভয়ামঙ্গল’। এখানে দেবী মহিষাসুর বিনাশিনী নন, এখানে তিনি বন্যদেবী বিন্ধ্যবাসিনী। তিনি বনের পশুদের অভয় দান করেন অর্থাৎ তিনি পশুদের রক্ষাকারিণী। এই ‘অভয়া’ অর্থাৎ যিনি ভক্তের ভয় দূর করেন সেই বন্যদেবীর থেকেই শারদীয়া দুর্গাপুজোয় অভয়াদুর্গা মূর্তির উৎপত্তি। এখানে তিনি দশভূজা নন, তিনি দ্বিভূজা এবং পদতলে সিংহ রয়েছেন। এমন বিগ্রহ বহু প্রাচীন বনেদিবাড়িতেই দেখা যায় যেখানে বছরের পর বছর পুজো হয়ে আসছে ধারাবাহিক ভাবে।

আবার অপর এক যুক্তিতে দেবীর সঙ্গে যখন মহিষাসুরের প্রবল সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তখন মহিষাসুর মায়ার দ্বারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তখনও তিনি দেবীকে পরাজিত করতে পারছিলেন না। যখন দেখলেন যে দেবী দুর্গার কাছে তাঁর পরাজয় নিশ্চিত, তখন তিনি করজোড়ে মিনতি করলেন এবং ক্ষমাভিক্ষা করলেন। তখন দেবী দুর্গা আপন রূপ ধারণ করে মহিষাসুরকে অভয়দান করলেন। সেই থেকেই মায়ের এমন অভয়রূপ।

তেমনই এক বনেদিবাড়ি রয়েছে মধ্য কলকাতার কলুটোলা অঞ্চলে, যেখানে মায়ের  অভয়ারূপের আরাধনা হয়। এই অঞ্চলের দেবেন্দ্র মল্লিক স্ট্রিট ও ফিয়ার্স লেনের সংযোগস্থলেই বসবাস করেন ধর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দুর্গাদালানেই আজও পুজো পেয়ে আসছেন অভয়ারূপী মা দুর্গা।

এই পরিবারের আদি নিবাস ছিল চন্দননগরের সরিষাপাড়ায়। ইংরেজদের সঙ্গে লবণ ও চিনির ব্যবসা করার জন্য সেই অঞ্চল থেকে কলকাতায় চলে আসেন ধরবাড়ির আদিপুরুষ সাফুল্যরাম ধর। ব্যবসায় প্রভূত অর্থ লাভ করেই তিনি কলুটোলায় ২০ কাঠা জমির ওপর তিনমহলা বাড়ি নির্মাণ করেন। এই তিনমহলা বাড়ির মধ্যে একটি বসতবাড়ি, একটি দোলবাড়ি এবং একটি ঠাকুরবাড়ি। এই দোলবাড়ি ও ঠাকুরবাড়িতেই ছিল ঝাড়বাতির আলোয় সাজানো সাবেকি সাজসজ্জা, যেখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে কাননদেবী পর্যন্ত বিখ্যাত সব মানুষের পা পড়েছিল।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাফুল্যরাম ধরের পঞ্চমপুরুষ পূর্ণচন্দ্র ধরের বসতবাড়িতে (৩২এ ফিয়ার্স লেন) ১৮৭১ সালের শুরুর দিকে এসেছিলেন ভগবান শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, এক চৈতন্যসভায়। সে দিন আত্মহারা অবস্থায় চৈতন্য-আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে ঠাকুর সমাধিস্থ হয়েছিলেন। ওই আসনটি বর্তমানে না থাকলেও এখনও স্থানটি সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে এই পবিত্রস্থানটিতে দুর্গাপুজোর সময় হোম করা হয়।

বলা বাহুল্য ধরবাড়ির সদস্যদের আদিপরিচয় ব্যবসায়ী হলেও পরবর্তী কালে দু’টি প্রখ্যাত ব্রিটিশ কোম্পানি বেনিয়ান হিসাবে এই পরিবারের কর্তাদের নিয়োগ করেন এবং এঁদের দ্বারাই বহু আত্মীয়পরিজনের চাকরি হয়েছিল ওই কোম্পানিদু’টিতে। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় এই পরিবারের গয়নাগাটি, আসবাবপত্র, ধনসম্পত্তি লুট হয়ে গেলে তখন ওই কোম্পানিদু’টির সাহায্যেই ধরবাড়ির তৎকালীন বংশধরেরা ঘুরে দাঁড়ান।

ধরবাড়ির আদি নিবাস চন্দননগরে মায়ের পুজো হত ঘটে। কৃষ্ণচন্দ্র ধর ১৮৬০ সালে কলকাতায় মূর্তিপুজোর প্রচলন করলেন। সোজা রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে পুজোর সূচনা হয় বলেই জানালেন পরিবারের সদস্য অসীম কুমার ধর। তার পর এক শুভদিন দেখে মায়ের মৃন্ময়ীরূপ গড়ার কাজ শুরু হয় ঠাকুরদালানেই। ধরবাড়ির ঠাকুরদালানে দেবী একচালায়, ডাকের সাজে সজ্জিতা এবং দ্বিভুজা। কোনো মহিষাসুর নেই, মায়ের পদতলে দু’টি সিংহ। মা সৌম্য, শান্তস্নিগ্ধ রূপে বিরাজ করেন। এই পরিবারের একচালার বিগ্রহের চালচিত্রে মহাদেব, রাধাকৃষ্ণ এবং নবদুর্গার বিভিন্ন রূপ অঙ্কিত থাকে এবং দেবীর দুই পাশে থাকেন দুই সহচরী জয়া এবং বিজয়া।

প্রতিপদ তিথিতেই বোধন শুরু হয়, সেই দিন থেকেই চণ্ডীপাঠ, আরতি শুরু হয়ে যায়। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস হয়। সপ্তমীর দিন সকালে মতিলাল শীল ঘাটে নবপত্রিকা স্নান করানো হয়। মহাষ্টমীর দিন বাড়ির মহিলারা ধুনো পোড়ানোয় যোগ দেন এবং ধরবাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণবমতে, ‘বৃহৎনান্দীকেশ্বর’ পুরাণ মতে। সন্ধিপূজায় মাসকলাই বলিদান হয় এবং মহানবমীর দিন কুমারীপুজো ও সধবাপুজো হয়। পুজো করেন বাড়ির সধবা মহিলারাই।

এই বাড়ির পুজোর সময় চালের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। সঙ্গে থাকে নানা রকমের ফল, লুচি, কচুরি, পাঁচ রকমের ভাজা, নারকেলনাড়ু, মালপোয়া, দই, ক্ষীর, গজা, মুগের নাড়ু ইত্যাদি। ধর পরিবারের সদস্যরা বোধন থেকে মহাষ্টমী পর্যন্ত নিরামিষ আহার করেন। মহানবমীর দিন পুজো শেষ হলে ব্রাহ্মণদের মৎস্যমুখ করিয়ে তবে পরিবারের সদস্যরা মৎস্যমুখ করেন।

দশমীর দিন বরণের পর কনকাঞ্জলি দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। প্রাচীন রীতি মেনে আজও ধরবাড়ির দেবী কাঁধে করে বিসর্জনে যান। বাড়ির বয়ঃজেষ্ঠ্য সদস্যরা দেবীর সামনে চামর দোলাতে দোলাতে ঘাট অবধি যান। বিসর্জন শেষে বাড়ি ফিরে নতুন কাপড় পরে শান্তির জল গ্রহণ করেন পরিবারের সদস্যরা। এই ভাবেই শেষ হয় কলুটোলার ধরবাড়ির পুজো।

এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে বাইরের দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানালেন ধরবাড়ির বধূ শর্মিষ্ঠা ধর।   

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন