দাদা রথ টানবে ? রশিতে টান দিয়ে মেতেছে শিশুরা

0

IMG_6453

শ্রয়ণ সেন

বাজার যাব বলে বাড়ি থেকে বেরোতেই, ‘দাদা দাদা’ চিৎকার করে ছেঁকে ধরল দু’জন। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। বোঝা যাচ্ছে ভাইবোন। দু’জনের বয়সই দশের কোঠা পেরোয়নি। কী ডিমান্ড তাদের? চাঁদা? কিন্তু সরস্বতী পুজো তো সেই সামনের বছর। ভুল ভাঙল।

দাদা, রথ টানবে?

দু’জনে রথ নিয়ে বেরিয়েছে। আমার কাছে আব্দার, যদি একটু রথের দড়িটা টেনে দিয়ে জগন্নাথের দর্শন করি। তার সাথে যদি দু’চার টাকা দক্ষিণা হিসেবে পাওয়া যায়। আমিও তো আজ থেকে বছর পনেরো আগে এদের মতোই ছিলাম। রথ আর উল্টোরথের দিন বিকেলে নিজের ছোট তিন তলা রথটা নিয়ে বেরোতাম। রথের আগের দিন রাত পর্যন্ত জেগে আমি, মা আর বাবা মিলে রথটা সাজাতাম। সেই সব সুখের দিন এখন স্মৃতি। পড়াশোনার চাপ বাড়ার সাথেসাথেই রথটাও আমার জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে গেছে।

ওদের রথের দড়িটা একটু টেনে দিয়ে আনন্দর ভাগ নিলাম একটু। খুব সুন্দর সাজানো হয়েছে রথটা। দু’টো টাকা দক্ষিণা দিলাম, সেই সঙ্গে পেলাম দু’টো নকুলদানা।

“কী সুন্দর সাজানো হয়েছে! কে সাজিয়েছে?”

“বাবা সাজিয়ে দিয়েছে”— জবাব এল।

“কোথায় থাকিস তোরা?”

পাশের ফ্ল্যাটের দিকে দেখিয়ে বলল, “ওই তো ওখানে তিন তলায়”।

ওদের কথা শুনে অদ্ভুত একটা আনন্দ পেলাম। আজকের নতুন জেনারেশন তো কম্পিউটার আর ভিডিও গেমের আশীর্বাদে এই সব আনন্দ ভুলতে বসেছে। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেপুলেদেরও এখন স্মার্টফোন হাতে ঘুরতে দেখা যায়। সেখানে এই দু’জন সত্যিই ব্যতিক্রম।

না, শুধুমাত্র এরা দু’জন কিন্তু ব্যতিক্রম নয়। একটু এগোতেই আর একটা ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে দু’টো রথ চোখে পড়ল। রথের ছোট্ট মালিকরা কিন্তু আমায় ডাকেনি। আমিই এগিয়ে গেলাম দু’জনের কাছে। এ বার আমি আব্দার করলাম, রথের দড়ি টানব। ওরা সানন্দে রথের দড়ি এগিয়ে দিল আমার দিকে। একটা একটা করে দু’টো রথের দড়িই টানলাম। এক জনের থেকে বাতাসা আর এক জনের থেকে একটা পেঁড়া পেলাম। এরা দু’জনেই ফ্ল্যাটে থাকে, তবে এক জন থাকে দু’তলায় আর একজন গ্রাউণ্ড ফ্লোরে। অর্থাৎ সে ওই ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকারের ছেলে। দেখে খুব ভালো লাগল যে দু’জনের পরিবারের মধ্যে সামাজিক ব্যবধান এদের বন্ধুত্বে কোনও বাধা সৃষ্টি করেনি। অন্তত আজ, এই রথের দিনে।

ঘণ্টাখানেক বাড়ির বাইরে ছিলাম। বাচ্চাদের টানা কত যে রথ দেখলাম গুনে উঠতে পারলাম না। যারা রথ টানছে সবার বয়সই কিন্তু দশের আশেপাশে। সবার পরিবারের সামাজিক অবস্থা এক নয়, কিন্তু রথের দিন সে সব ব্যবধান মুছে গেছে।

আজকালকার ছেলেপুলেরা নিজের জগৎ নিয়েই থাকে। অবশ্য এর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী তাদের অভিভাবকরা। পড়াশোনার চাপ তো আছেই। অভিভাবকদের চাপ, তাদের সন্তানদের স্কুলে র‍্যাঙ্ক করতেই হবে। শুধু তা-ই নয়, চৌকশ হতে হবে। আঁকা শিখতে হবে, পারলে গান বা আবৃত্তি, সাঁতার তো মাস্ট, আর ক্যারাটেটাই বা বাদ থাকে কেন। আর খেলাধুলা যদি করতেই হয়, তা হলে নিয়ম করে শিখতে হবে, হতে হবে সৌরভ গাঙ্গুলি। জীবনের এই ইঁদুর দৌড়ে তারা সত্যিই এখন ব্যতিব্যস্ত। সে ভাবে কোনও অবকাশ তাদের জীবনে নেই। যেটুকু অবসর পায়,  তাতে মাঠে গিয়ে বল নিয়ে এলোপাথাড়ি ছোটা বা ব্যাট নিয়ে বল পেটানোর সময়ই হয় না। তাই অবসরটুকু কাটে ঘরেতেই, কম্পিউটার আর ভিডিও গেমস নিয়ে। এমনকি কান্নাকাটি করলে বাবা-মারা, তাদের ভোলানোর বদলে নিজেদের স্মার্টফোন ধরিয়ে দেন তাদের হাতে। বাইরের জগৎ সত্যিই আজ অচেনা এই ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়ের কাছে।

তাই রথের দিনের এই দৃশ্য সত্যিই ব্যতিক্রম। সমস্ত অবশ্যকর্তব্য থেকে একটা দিনের ছুটি। তাকে চেটেপুটে ভোগ করে নিতে চায় তারা।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন