মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

শুরু হওয়ার পর দিন থেকে জল থই থই, না হয় কাদা প্যাচপ্যাচে কলকাতা। সব মিলিয়ে কলকাতা-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গকে যেন আকাশটা ব্যঙ্গ করে বলছিল ‘আহা রে বাংলা’! সোমবার সকাল গড়িয়ে দুপুর নামতেই লম্বা বিরতির পর সূর্যের মুখ দেখল মহানগর। ব্যাস! শীতের চেনা ছন্দে ফেরার পালা। আকাশের মুখ ভার হওয়ায় যা কিছু হয়নি সপ্তাহান্তে, তার সবটা না হলেও যতটা পারা যায়, উসুল করে নিতে হবে সোমবার সন্ধের মধ্যেই। আহারে বাংলার এটাই তো শেষ দিন।

কেউ কলেজ কেটে, কেউ বা অফিস থেকে হাফ ছুটি বাগিয়ে চলে এসেছেন নিউ টাউন মেলাপ্রাঙ্গণে। তিন বছরে পা দেওয়া এই মেলা কিন্তু ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় শহরের সব প্রান্তের মানুষের কাছেই। এমনকি শহরতলির মানুষের কাছেও। পানিহাটির মৌসুমি মণ্ডল থেকে বিরাটির অতনু হাজরা সব্বাই কিন্তু তক্কে তক্কে ছিলেন, আকাশ ভালো থাকলে আজ এক বার আসবেনই।

মেলার যে দিকটায় সারি সারি মিষ্টির স্টল, শুরুটা সেখান থেকে করব বলে এগিয়েছি, ধারের স্টল থেকে বিক্রেতা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “দিদি, মোহিনী নেই, আগে থেকে বলে দিলাম”। সবে বলতে যাব, “আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, আমি তো…”, পেছন থেকে রীতিমতো হাহাকার শোনা গেল, “সে কী! আজ সারা দিন আসবে না?” ততক্ষণে স্টলের গায়ের লেখাটা পড়ে ফেলতে পেরেছি,- ফেলু মোদক। ও-পাশ থেকে চটজলদি উত্তর এসে গেছে, ১২টায় স্টল খুলেছিলেন। ৪০০ পিস মোহিনী সন্দেশ দুপুর ২টোর মধ্যে শেষ। পরের লট আসতে আসতে সন্ধে হয়ে যাবে। নলিন চন্দ্র, অধর চন্দ্র, হিন্দুস্থান সুইটস্‌, এ-দিক ও-দিক ছড়িয়ে রয়েছে রকমারি মিষ্টির স্টল। কোনো স্টলে রাতারাতি সব্বার প্রিয় হয়ে উঠেছে তুলসী রসগোল্লা। ‘পিঠে বিলাসি’র স্টলে নানা রকমের পাটিসাপটা, চকোলেট ফ্লেভার, ম্যাঙ্গো ফ্লেভার।

মেলার অন্য দিকে পা রাখতে না রাখতেই রোল-বিরিয়ানি-চাপ মেশানো গন্ধটা নাকে এল। তিনখানা বড়ো বড়ো হল জুড়ে দেশি বিদেশি খাবারের দোকান। কে নেই তাতে? আলিবাবা, নিজাম, গ্লোবাল গ্রিল, হাকা, ও ক্যালকাটা!, আপনজন, বিগ বস, জিশান। রুশ আর জাপানি রসনা চেখে দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে মেলায়। তবে চাইনিজ কিংবা কন্টিনেন্টালের চাইতে মোগলাই খানা কিন্তু ঢের বেশি ভিড় টানছে। হাক্কা কিংবা গ্রেভি চাউমিন-চিলিচিকেন তরুণ প্রজন্মকে বেশি টানে, সে রকমই জানতাম এত দিন। কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের সুদেষ্ণা, সায়নী, অয়ন্তিকারা কিন্তু কাবাবের লাইনেই। ভোজনবিলাসী বাঙালির মনে (জিভে) ধরেছে কোয়েলের ডিমের ঝাল দিয়ে পরোটা।

মেলার আরেকটা দিক চোখেই পড়েনি এতক্ষণ। নানা স্বাদের আচার, বড়ি, তিলের নাড়ু, মোরব্বা নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন বিক্রেতারা। স্বনির্ভরগোষ্ঠীর মাটির কাপ, কাঠের হাতা চামচের স্টল নজর কেড়েছে সবার। আরে! ও-দিকে এত ভিড় যে! ওমা ইয়া বড়ো বালতিতে রুই, কাতলা আরও কত কত মাছ। রাজ্যের মৎস্যচাষ দফতরের স্টলে জলের রুপোলি ফসলের জলকেলি দেখতে ভিড় করেছে ‘মেছো’ বাঙালির দল। ফিরতি পথে আবার পড়ল উঠোন জোরা মিষ্টির দোকান। এক তরুণ মন্ত্রমুগ্ধ গলায় ফোনে কাকে যেন বলছে, “আমি এখন যেখানে আছি, পুরো মাঠটাই মিষ্টির।” প্রথম প্রেমে সাড়া পেলে ঠিক এমনটাই হয় না চোখ মুখের অবস্থা?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here