Laxmi Puja

সমীর মাহাত, ঝাড়গ্রাম: জঙ্গল মহলের লোকাচারে লক্ষ্মীর ব্রত হয় এক মাস ধরে। শস্যভর্তি ধানগাছ ‘লক্ষ্মী’ রূপে ঘরে আসে সমস্ত ফসল ঘরে আসার পর। লোকসংস্কৃতিতে একে বলা হয় ‘ঠাকুর আনা’।

টোটেম গোষ্ঠীর জনজাতিরা কোনো কালেই মূর্তি পুজোয় বিশ্বাসী নয়। প্রকৃতি ও বৃক্ষ পুজোয় এদের সব ক’টি ধর্মীয় ভাবাবেগ জড়িত। ‘ঠাকুর আনা’ লক্ষ্মীপুজোর নামান্তর হলেও এখানেও পুজো করা হয় ধানগাছকে। কী এই ঠাকুর আনা?

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পরের বৃহস্পতিবার থেকে এই লোকসংস্কৃতির ধারক-বাহকেরা প্রতি বৃহস্পতিবার খামার থেকে শস্যঘর পর্যন্ত আলপনা দেয়। তার আগে খামার পৈলা (নতুন মাটি দিয়ে পুজো করে মেরামত) সেরে নেওয়া হয়। কোজাগরীর পরের অমাবস্যাতে আবার এই সমাজের বৃহৎ বাঁদনা পরব (গো মাতার পুজা) রয়েছে। বৃহস্পতিবারের আলপনা দেওয়া চলতেই থাকে। এসে পড়ে ধান কাটা বা ফসল তোলার কাজ। এই সময় জমির একটি পুষ্ট ধানগাছকে না কেটে চুলের বিনুনির মতো করে দা দিয়ে মাটি খুঁড়ে চুপিসারে পুঁতে রাখা হয়। জমির সমস্ত ফসল খামারে আসার পর, শেষে এই ধানগাছটিকে সাঁঝের বেলা বাড়ির পুরুষেরা পুজো করে নিয়ে আসে। এই পুজোয় কোনো মন্ত্র বা পুরোহিত লাগে না। গাছটি ঘরে আনার সময় কথা বলা নিষিদ্ধ।

মাটি-সহ সেটাকে পুজো করে প্রথমে খামারের ধানের গাদার তলায় পিঁড়িতে রাখা হয়। পরে তা ঘরের ধান গোলাঘরেও কেউ কেউ রেখে দেয়। অনেক সময় পৌষ সংক্রান্তির সময় টুসু পরবেও এই ঠাকুর ঘরে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাচীন কৃষি সভ্যতার হাত ধরে এই পুজো চলে আসছে। আবার লক্ষ্মী নিয়ে নানা তথ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অনেকে মনে করেণ এই নামের সম্পদ ও ঐশ্বর্যাশালী কোনো জঙ্গল কন্যা ছিলেন। এই নিয়ে, পূর্বা সেনগুপ্তের ‘অমৃত কথা’ ‘শ্রীলক্ষ্মী’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, ঋগ্বেদে মা লক্ষ্মীদেবীকে ‘শ্রী’ নামে একাধিক বার পাওয়া গিয়েছে। ‘শতপথ ব্রাহ্মণের কাহিনি’তে বলা হয়েছে, ঋষি প্রজাপতি তপস্যা করে লক্ষ্মীকে পান। তাঁকে দেখে দেবতারা আদেখলাপনা শুরু করে প্রজাতির দ্বারস্থ হন। লক্ষ্মীকে খুন করে তাঁর সব কিছু লুণ্ঠন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ঋষি বলেন, পুরুষেরা নারীকে খুন করতে পারে না। ফলে এক প্রকার জোর করে দেবতারা দেবীর সমস্ত কিছু কুক্ষিগত করেন। অগ্নি নেন অন্ন, সোম হন রাজা, বরুণ সাম্রাজ্যে, মিত্র নেন ক্ষাত্র শক্তি, ইন্দ্র নেন বল, বৃহস্পতি নেন ব্রহ্ম বিদ্যা ও সবিতা নেন রাষ্ট্র।

বিশেষজ্ঞ বিমল মাহাত বলেন, ‘ঠাকুর আনা’ হল শস্য দেবীর পুজা, আগে শস্যই ছিল সম্পদ। তবে ‘ঠাকুর আনা’ হয়ে গেলে বৃহস্পতিবারে আর আলপনা বা পুজো হয় না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here