আমবাঙালির আম-চেতনায় আমের উৎসব

0
361
পায়েল সামন্ত

বসন্ত পার হয়ে গ্রীষ্ম এলেই আমের জন্য মনকেমন শুরু হয়ে যায়। কাউন্টডাউন শুরু হয় ঝড়ে ঝরে পড়া কাঁচা আমের বাজারে আগমন থেকে। গরম বাড়লে আম পাকে, আর বাজার রঙিন ও সুগন্ধী হয়ে ওঠে আমের পসরায়। তবে আমবাঙালির আমচেতনা হিমসাগর আর ল্যাংড়াতেই মূলত সীমাবদ্ধ। গোলাপখাস, ফজলি বা দশেরি-চৌসা কমবেশি পাওয়া গেলেও বাকি আমের প্রজাতি সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা নেই বললেই চলে। তাই আম নিয়ে জ্ঞানগম্যি বাড়াতে চলে আসুন মিলনমেলার মাঠে। ১৫ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত সেখানে চলছে বাংলার আমের মেলা।

মিলনমেলার পরিচিতি এখন বেড়েছে বইমেলার সূত্রে। ময়দানের ধুলো ছেড়ে এই কংক্রিট-শাসিত মাঠে কলকাতা পুস্তক মেলা আসার পর মানুষজনের যাতায়াত বেড়েছে। তারই একটি ২ নং প্যাভিলিয়েন তিন দিন ধরে যেন খোলা রয়েছে আমের অভিধান, আমের এ টু জেড প্রদর্শনী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতর এবং ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অফ কমার্সের উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলায় অতিথি বিভিন্ন জেলার আম। অতিথি বলাই শ্রেয়, যে হেতু এ সব আম কলকাতার বাজারে জ্যান্ত শিঙি মাছ বা বিচেকলার মতোই বিরল।

প্যাভিলিয়নের ভিতর চোখ বন্ধ করে পা রাখতে পারেন। নানা আমের মিশেলে তৈরি হওয়া এক স্বর্গীয় সৌরভে স্নায়ু অবশ হয়ে আসবে, মনে হবে আপনার হৃদয়বনে আম্রপালির নৃত্য এই বুঝি আরম্ভ হল! একের পর এক স্টলে নানা আকারের, নানা রঙের, নানা গন্ধের আম। না, দেখে স্বাদটা বোঝার উপায় নেই অবশ্য।

আমের এই বঙ্গীয় সমাবেশে মালদা ও মুর্শিদাবাদের প্রতিনিধিরা সভামঞ্চের মূল বক্তার মতো নেতৃস্থানীয়। এই দুই জেলার আমের পসরা দেখার মতো। আপনি কি জানেন, এক ধরনের আম রয়েছে, যার নাম চম্পা? একটা আমের নাম রানি? প্রথম আমটি পছন্দ ছিল নবাবের, দ্বিতীয় আমটি বেগমদের প্রিয়। চম্পার দাম প্রতি কেজি ১০০ টাকা, রানির তার অর্ধেক। রানি ভবানীর স্নেহধন্য আম ভবানীর দাম ৬০ টাকা কেজি। কালোপাহাড়, চিনিচম্পা, দিলপসন্দ — যে কোনও একটা আম নিয়ে নাকের কাছে ধরুন, দেখবেন আলাদা আলাদা গন্ধে সে আপনাকে ডাকছে। এই তিন ধরনের আমের দাম প্রতি কেজি ১০০ টাকা। দাউদিবাগের আমের নাম দাউদি, ৮০ টাকা কেজি।

ফরাক্কা থেকে এসেছেন সুলেমান শেখ। নিজের বাগানে সন্তানের মতো আম লালন-পালন করেন। তাঁর একমুখ হাসি। জানালেন, ভালোই সাড়া পেয়েছেন। সব চেয়ে বড় কথা, নিজের গাছের আম এ ভাবে বড়ো জায়গায় হাজির করতে পেরে তিনি বেশি খুশি। সুলেমানের কাঞ্চনভোগ, অমৃতভোগ, পেরা নাকি অমৃতসমান, এমনই দাবি মুর্শিদাবাদের এই আমচাষির।

ধনেখালি বললে যেমন তাঁত, কৃষ্ণনগর বললে যেমন সরপুরিয়া, তেমনই মালদা নামের সঙ্গে যেন আমের প্রাণের যোগ। পৃথিবী জুড়ে যেখানকার আম বিখ্যাত, সেখানকার মানুষেরা শুধু খোসা ছাড়িয়ে, আঁটি চুষে আম খাওয়ায় বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখবেন কেন। মালদার ধানতলার মলি দাস এসেছেন গোপালভোগ আর হিমসাগরের আমসত্ত্ব নিয়ে। গোপালভোগের আমসত্ত্বের দাম চড়া, ২০০ গ্রামের দাম ২৫০ টাকা। আমসি ১০০ গ্রাম ৩০ টাকা। রয়েছে আমপান্না, আমের আচারও।

অন্যান্য জেলা মালদা-মুর্শিদাবাদকে ওয়াকওভার দিয়ে বসে আছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। হুগলির বলাগড় থেকে এসেছেন সুব্রত কর্মকার, অসীম মালিক। হুগলি ভেজিটেবল গ্রোয়ারস প্রোডিউসার কোম্পানি-র এই দুই সদস্য একটা অদ্ভুত আম হাতে তুলে দিলেন। নাম তার সুবর্ণরেখা। এর বৈশিষ্ট্য, বোঁটা প্যাঁচানো। খুব কম ফলে, দাম ১০০ টাকা কেজি। রাজভোগ বলে আর একটা আমের সুন্দর গন্ধ, দাম একই। বাঁকুড়ার সুব্রত মণ্ডল এনেছেন মল্লিকা। না, ফুল নয়, আমই বটে। শুষ্ক আবহাওয়ায় বাড়ে বলে এর আঁশ বেশি, কিন্তু মিষ্টি এমন যে চিনিকেও নাকি লজ্জা দেবে! ১০০ টাকা দিলে এক কেজি পাবেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে এসেছে কিষাণভোগ। বিশাল আকার, ভগবান কৃষ্ণের ভোগ্য। সরিখাস নামের এক ধরনের আম নাকি মিল্কশেকের জন্য উপযোগী। দামের দৌড়ে সবাইকে হারিয়ে দেবে নদিয়ার গঙ্গাযমুনা। চমক দেবে তার বৈশিষ্ট্যে। শান্তিপুর থেকে আসা গৌতম ভৌমিক জানান, এই আমের তিন রকমের রং। নদিয়ায় মাত্র দুটি-তিনটি গাছ আছে। তাই দাম প্রতি কেজি ২৫০ টাকা।

গরম এলেই মিষ্টির দোকানে আমের জন্য আদরের আসন পাতা হয়। মেলায় তাই হাজির মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক ও কেকের ব্যবসায়ীরাও। নলিনচন্দ্র দাসের সম্ভারে এ বারের আকর্ষণ দই, কুলফি, ছানার পায়েস, জলভরা, মালাই রোল। রিষড়ার ফেলু মোদকের চমক আমের গুজিয়া। মাংসের সঙ্গে আমের মিশেল হলে কেমন লাগে, তার নমুনা হাজির করেছে মিয়ো আমোরে। পদের নাম আম আচারি চিকেন। অনেকে চেটেপুটে খাচ্ছেন দেখে মনে হল, স্বাদে খাসা। ৪০ টাকার দেদার বিকোচ্ছে ম্যাঙ্গো মুস।

আয়োজন বেশ বড়ো হলেও সেই নিরিখে দর্শকের আগমন কম। ডানলপের দীপক হালদারের বক্তব্য, সে ভাবে প্রচারই হয় না। তাই অনেকে আসতে পারেন না। তা ছাড়া স্টলের সংখ্যাও বেশ কম। আর একটু বেশি হলে ভালো হত। সিঁথির আলপনা দাস আম কিনবেন বলে ব্যাগ নিয়ে এসেছেন। বললেন, আমের আইসক্রিম ও দই খেয়েছি। বেশ লেগেছে। একই রকম আম খেয়ে অভ্যেস, দেখি অন্য আমে স্বাদ বদল হয় কিনা। তিনিই বলেছেন, বন্ধুরা, ম্যাঙ্গো লিন খেয়ে আসতে পারেন, কাঁচা আম, পাকা আম আর আমের জেলি দিয়ে তৈরি!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here