চক্রতীর্থে জমে উঠেছে নন্দাস্নান, জমজমাট মেলা চলবে সাত দিন

0
294

পাপিয়া মিত্র:

ঠা ঠা রোদ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে হুগলির বাঁশবেড়িয়ার সনাতন সরকার। চার দিকে স্নানার্থী গিজগিজ করছে। ছোটো বড়ো সকলেই এসেছেন মহাশ্মশানের চক্রকুণ্ডে স্নান সারতে। একই কারণে তাঁরও আসা। তবে সঙ্গীসাথি কেউ নেই। পাঁজিপুথি দেখে ভোররাতেই ট্রেন ধরেছেন।

শীত রেখে যায় উষ্ণতা। রেখে যায় বেলাশেষের গান। ফাগুন কানে কানে যতই বিদায়মন্ত্র দিক না কেন বসন্তের উৎসব যেন শেষ হয় না এই বঙ্গে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রান্তিক উঠোনে এসে পড়েছে আরও এক চৈতালি উৎসব ‘নন্দাস্নান’।

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে প্রায় ৫৪ কিলোমিটার পথ পার হয়ে ফের সড়কপথে পৌছোলাম চক্রতীর্থে। সেখানে জনসমুদ্র। ভোরের ট্রেন যত এগিয়েছে ততই গৃহস্থের ঘুম ভেঙেছে। ধীরে ধীরে কামরা ভরে উঠেছে মানুষের কোলাহলে। মথুরাপুর স্টেশন থেকে রায়দিঘি রোড ধরে ১১ কিলোমিটার অতিক্রম করলে বড়াশি গ্রাম। গ্রামের চার দিকে আছে কৃষ্ণচন্দ্রপুর, কাটানদিঘি, শোভানগর, মাধবপুর, কাশিনগর, সরবেরিয়া-সহ আরও ছোটোবড়ো নানা গ্রাম। কাশীনগরের কয়েক মাইল দক্ষিণে ছুতোরভোগ নামে একটি নদী আছে। মনসার ভাসান, চণ্ডীর গান, চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্যভাগবত, রায়মঙ্গল প্রভৃতি পুথি থেকে জানা যায় বহু বছর আগে আদিগঙ্গার এই পথেই নিম্নবঙ্গের অন্যতম শক্তিপীঠ ছত্রভোগ। বাঙালি সওদাগর তীর্থযাত্রীরা এখানে ত্রিপুরাসুন্দরীদেবী ও ভৈরব অম্বুলিঙ্গশিব দর্শন করে, চক্রতীর্থে স্নান করে সমুদ্রে নৌকায় বাণিজ্যে যেতেন।

গ্রামের নাম বড়াশি নিয়ে একটি জনশ্রুতি আছে। আলিবর্দি খান এক বার শিবমাহাত্ম্য পরীক্ষা করার জন্য গাজনের আয়োজন করেন। মাটিতে বর্শা পুঁতে দিয়ে সন্ন্যাসীদের তার ওপরে ঝাঁপ দিতে বলেন। ভক্তদের বিপদ আসছে বুঝে তাদের রক্ষা করতে সেখানে মহাদেব শঙ্খচিলের রূপ ধরে ওই প্রান্তে চক্কর দিতে থাকেন। তাঁর উপস্থিতি বুঝতে পেরে সন্ন্যাসীরা নির্ভয়ে ঝাঁপ দিলেন বর্শার উপরে। ভক্তদের শরীর বিদ্ধ হওয়ার বদলে বর্শা ভেঙে যায়। সেই থেকে বর্শা ভঙ্গ বা কথ্যে বড়াশি। এখানেই চক্রতীর্থ মহাশ্মশান।

রায়দিঘি রোডে ভ্যানোতে আলাপ হয়েছে ভুবনখালির আরতিদেবীর সঙ্গে। এই নিয়ে ২৫ বছর তিনি আসছেন পরিবারের সঙ্গে। পরিবারের কর্তা রমাপদ পাল বলছিলেন চক্রতীর্থের নানা কথা। আরাধ্য দেবতার কথা শুনতে শুনতে পথ শেষ হয়ে গেল। চক্রকুণ্ডের কাছে যেতেই হারিয়ে গেলাম ভিড়ে। ভাব জমালাম লতিকাদির সঙ্গে। হাওড়ার সালকিয়া থেকে সবে এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে দেবমাহাত্ম্যের একটি বই দেখে চোখ বুলিয়ে নিলাম।

বদ্রিকানাথ অম্বুলিঙ্গ এখানকার আরাধ্য দেবতা। কথিত যে চক্রতীর্থে অম্বুলিঙ্গের নিত্যসেবার জন্য নবাব আলিবর্দি খান দেবোত্তর সম্পত্তি দান করেছিলেন। জমি দিয়েছিলেন জমিদার বরদাকান্ত রায়চৌধুরীও। কলকাতার ভবানীপুরের এই রায়চৌধুরী পরিবারই মন্দির নির্মাণ করেন। দক্ষিণমুখী মন্দিরের ভিতরে গৌরীপট্ট সহ শিবলিঙ্গ। বর্তমানে চক্রবর্তী পরিবার এই মন্দিরের পুজোর কাজ চালিয়ে আসছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মইপীঠ, নলগোড়া, জি প্লট, কে প্লট, ভুবনখালি দ্বীপ, কয়েমুড়ি, পাথরপ্রতিমা, কঙ্কনদিঘি, সাগর থেকে ভক্তেরা ঠাকুরান নদী ও মণি নদী পার হয়ে অমাবস্যার রাতে চক্রকুণ্ডে পৌঁছে যান। ভোর হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় সন্তান কোলে বা ঘাড়ে নিয়ে জলে ডুব দেওয়া। কোনও দিকে বাবা-মায়ের হাত ধরে মেয়ে বা বউমা জলে ডুব দিচ্ছেন। আর এই তীর্থস্নান নিয়ে জমে উঠেছে মেলা, চলবে সাত দিন।

চক্রতীর্থের কাছে ছত্রভোগ। এখানেই ত্রিপুরাসুন্দরীদেবীর মন্দির। কথিত, গঙ্গা, বিষ্ণু, সংকেতমাধব অম্বুলিঙ্গশিব ও ত্রিপুরাসুন্দরী — এই চার শক্তি একত্রে অবস্থান করায় এই জায়গার নাম হয়েছে চক্রতীর্থ। চৈতন্য ভাগবতে এই ছত্রভোগ ও অম্বুলিঙ্গ শিবের ঘাটের উল্লেখ আছে। অম্বুলিঙ্গ ঘাটের কাছে চক্রতীর্থ ঘাট। এখানে চৈত্রের শুক্লা প্রতিপদ থেকে তৃতীয়া পর্যন্ত পুণ্যস্নান চলে। এই উপলক্ষে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত ওই মহাশ্মশানে আসেন।

সূর্য তখন মধ্য গগনে। সনাতন সরকারের মতো কত সনাতন যে প্রতীক্ষা করছেন স্নানের জন্য! কেউ মাথা কামাচ্ছেন, কেউবা পিণ্ডদান করছেন, কেউ বা জোরে জোরে মন্ত্রচারণ করছেন। স্নান সেরে দ্বারির জাঙ্গল হয়ে মন্দিরে পুজো দেওয়া। মেলায় মনের মতো খাবার আর হরেক খেলা। পুজো সেরে কাতার দিয়ে লোক চলেছে মেলার দিকে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here