আনুষ্ঠানিকতাই সব, নববর্ষের উৎসবে আজ আর নেই হৃদয়ের পরশ

0
632
শম্ভু সেন

ওঁ গণেশায় নমঃ।

মহাশয়, আগামী পয়লা বৈশাখ, ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ (ইং ১৪ এপ্রিল ১৯৬৬) বৃহস্পতিবার, আমাদের দোকানগৃহে শুভ হালখাতা মহরৎ অনুষ্ঠিত হইবে। অতএব, মহাশয় উক্ত দিবসে দোকানগৃহে পদার্পণ করিলে…।

ঘরদোর গোছানোর ফাঁকে পুরোনো ডায়েরিগুলো ঝাড়পোঁছ করতে করতে বেরিয়ে এসেছিল কার্ডখানা। ১৩৭৩ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখের হালখাতার আমন্ত্রণপত্র। গোলাপি রঙের কার্ড, চার দিকে খাঁজ কাটা, গণেশের ছবির উপর লেখাটা সুপারইমপোজ করা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজকাল হালখাতার অনেক হাল ফ্যাশনের কার্ড হয়েছে। সেই চৌকো খাঁজকাটা গোলাপি কার্ড কি আর পাওয়া যায় ? আশ্চর্য অর্ধ শতাব্দী পেরিয়েও কার্ডখানা যেন অমলিন।

নতুন বাংলা বছর যে আসছে সেটা বুঝতাম অফিস থেকে ফেরার সময় বাবাকে হাতে হাফপঞ্জিকা নিয়ে বাড়ি ঢুকতে। আমাদের বাড়িতে পুজো-আচ্চার খুব একটা রেওয়াজ ছিল না। মা শাঁখ বাজিয়ে সন্ধে দিত, ঠাকুরকে জল-বাতাসা দিত, ওই পর্যন্তই। আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে পঞ্জিকার খুব একটা সম্পর্ক ছিল না। ঠাকুমা গত হয়েছেন, বাবা তাই পূর্ণিমা-অমাবস্যা পালন করত। সেই পূর্ণিমা-অমাবস্যা কবে, দেখার জন্য ইংরিজি-বাংলা ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকাই ছিল ভরসা। তা ছাড়া প্রতিবেশীরাও মাঝেসাঝে আসতেন বিয়ে বা অন্য কোনো শুভ অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ দেখতে। তাই টুকটাক এই সব কাজ চালানোর জন্য একটা হাফপঞ্জিকা বাড়িতে রাখা থাকত। আর তখনই দোকানে দেখতাম থরে থরে লাল পাতলা মলাটের হাটখোলার পঞ্জিকা সাজানো, হাফ বা ফুল। হাফ কেন, বুঝতাম না। এতে কি ছ’ মাসের হিসেব থাকে? পরে বুঝেছিলাম, হাফ হল ফুলেরই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। বঙ্গাব্দের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হত তো ওই পঞ্জিকা মারফত। আর জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পালিত হত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বঙ্গাব্দের তারিখ মেনে।

দোকানে দোকানে ‘চৈত্র সেলের’ কোনো ধুম ছিল না। পুরোনো স্টক তখনও ক্লিয়ার করার রেওয়াজ ছিল বটে, তবে তা মোটামুটি নিঃশব্দে। চৈত্র মাসে কোনো কারণে কাপড়চোপড়ের দোকানে কিছু কেনাকাটা করতে গেলে দোকানি তাঁর পুরোনো জিনিস দেখাতেন, যাতে সত্যিই কিছু খুঁত থাকত। হয় কোথাও সামান্য একটু ছেঁড়া, কোথাও বা ময়লা দাগ। সেগুলো বিক্রিও করা হত নির্ধারিত দামের থেকে অনেকটা কম দামে। পছন্দ হলে খদ্দের কিনতেন, না হলে নয়। আজ আগে থেকে দাম বাড়িয়ে রেখে তার ওপর ‘হেভি ডিসকাউন্ট’ দিয়ে নতুন জিনিস হই হই করে বেচার নাম ‘চৈত্র সেল’। বাঙালিও হামলে পড়ে কেনে। অনেক সময় পুজোর বাজারকে ছাপিয়ে যায় সেলের বাজার। তখন নববর্ষে নতুন পোশাক কেনার রেওয়াজ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে খুব একটা ছিল না। তাই চৈত্রের বাজার মোটামুটি ঝিমিয়েই থাকত।

নববর্ষ যে আরও কাছে এসে গিয়েছে বুঝতাম যখন পাড়ার জিতেনকাকু এক দিন ওই চৌকো খাঁজকাটা গোলাপি আমন্ত্রণপত্রটা আমাদের কারও হাতে ধরিয়ে দিতেন। আমাদের পরিবারের সম্বৎসরের তৈজসসামগ্রী জিতেনকাকুর দোকান থেকেই আসত। ওঁর লাল খেরোর খাতায় লেখা থাকত আমাদের ধারের হিসাব। ছোটোবেলায় বুঝতাম না, পরে বুঝেছি, হালখাতায় আমন্ত্রণ মানে ধার শোধের আবেদন। আর এক দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ হালখাতার কার্ড নিয়ে হাজির হতেন জুয়েলারি দোকানের মালিক। সেখানেও তো আমাদের ধারবাকির কারবার চলত। তবে সে দিকটা দেখার দায়িত্ব ছিল সাধারণত মায়ের। কারণ একডালিয়া পার্কের (এখন যেখানে বিজন সেতু) ওই জুয়েলারি দোকানের নিয়মিত খদ্দের ছিল মা। আমাদের পরিবারে যা গয়নাগাটির প্রয়োজন হত তার সবই আসত ওই দোকান থেকে। কিন্তু সোনার দোকানে তো রোজ যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই জিতেনকাকু যেমন তাঁর দোকানেই আমাদের হাতে কার্ড ধরিয়ে দিতেন, তেমনটি উপায় ছিল না জুয়েলার্স-এর মালিকের। তাঁকেই বাড়ি আসতে হত কার্ড হাতে নিয়ে।

তার পর এক দিন এসে যেত নীলষষ্ঠী। সন্ধেবেলায় কাছাকাছি শিবমন্দিরে মা যাবে নীলের বাতি দিতে, আমরা সঙ্গী হব বেল, ডাব আর কাটারি নিয়ে। মনে মনে হিসেবটাও তখন পাকা হয়ে যেত। তার মানে আজ বাদে কাল চৈত্র সংক্রান্তি, পরের দিন পয়লা বৈশাখ। পরপর দু’ দিন স্কুল ছুটি। আর কোনো ভাবে যদি পরের দিনটা রোববার পড়ে যেত, তা হলে আমাদের আর পায় কে!

এসে যেত নববর্ষের দিনটা। গুরুজনদের প্রণাম করে দিনটা শুরু হত। খাওয়াদাওয়া এ দিন অবশ্য একটু অন্য রকম হত। দুপুরে পাঁঠার মাংস, রাতে লুচি, ছোলার ডাল। তখনকার সময়ে অবশ্য মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে প্রতি রোববার দুপুরে পাঁঠার মাংস খাওয়াটা একটা নিয়মের পর্যায়ে পড়ত। বলতে নেই শরীর-স্বাস্থ্য তো ঠিকঠাকই চলত। বড়োদেরও। সন্ধে হতেই বাবার হাত ধরে আমরা ভাইবোনেরা চলে যেতাম প্রথমে আমাদের পিসির বাড়ি। কাছেই। সেখানে প্রণাম সেরে মিষ্টিমুখ করে চলে আসতাম জিতেনকাকুর দোকানে।

জিতেনকাকু একটা উঁচু জায়গায় বসে দোকানপাট সামলাতেন। আধময়লা পোশাক পরে বাবু হয়ে বসতেন। পাশেই থাকত একটা ছোটো দাঁড়িপাল্লা। জিতেনকাকুর সামনে বিভিন্ন মাটির সরায় থাকত নানা ধরনের ডাল, মশলা। ডান দিকে থরে থরে তাক। তাতে বিভিন্ন বয়ামে সংসারের প্রয়োজনীয় নানা খুঁটিনাটি জিনিস রাখা। বাঁ দিকে টিনের মধ্যে সরষের তেল আর নারকোল তেল রাখা। আর পাশেই আরও একটু উঁচু জায়গায় বড়ো দাঁড়িপাল্লা, বিভিন্ন মানের চাল ও আটার বস্তা সাজানো। তার দেখভাল করছেন একজন কর্মচারী।

আমরা অবাক। রাতারাতি ভোল বদলে গেছে দোকানটার। তেলের টিন, মাটির সরা, বস্তা, দাঁড়িপাল্লা –- সব উধাও। গোটা জায়গাটা জুড়ে সাদা কাপড় পাতা। আর যেখানে থাকে বস্তা, সেই জায়গা সাফসুতরো করে কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার পাতা। জিতেনকাকু ধোপদুরস্ত। লাল খেরোর খাতা নিয়ে বসে। বাবা কিছু টাকা দিলেন। জিতেনকাকুর সঙ্গে কুশল বিনিময় হল। তার পর কর্মচারী ভিতর থেকে মিষ্টির বাক্স দিয়ে গেল।

ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে জুয়েলারি দোকানে যাওয়ার জন্য আমাদের ভাইবোনেদের ঝুলোঝুলি। আসলে এখানে যাওয়ার আকর্ষণটা একটু বেশি। কারণ এখানে মিষ্টির সঙ্গে পাওয়া যায় কোকাকোলা কিংবা জুসলা কোম্পানির অরেঞ্জ ড্রিঙ্ক। সে কারণেই এখানে দল বেঁধে যাওয়ার প্রশ্ন ছিল না। ভাইবোনেদের মধ্যে কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে তা নির্ভর করত মায়ের ওপর।

বেশ কয়েক বছর পর এল দূরদর্শন। পয়লা বৈশাখ সকালে দূরদর্শন সম্প্রচারিত করতে শুরু করল ‘নববর্ষের বৈঠক’। সেই বৈঠকে শামিল হলেন বাংলার গুণীজনেরা। পরিবারের নতুন অতিথি টিভি নিয়ে মজে গেল বাঙালি। কালক্রমে টিভির ওই অনুষ্ঠান একটা সামাজিক উৎসবের চেহারা নিল। এ ভাবেই কেটে যেত নতুন বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটা।

এখন তো অনেক বেশি হইচই। নববর্ষ এখন একটা আনুষ্ঠানিক উৎসবের চেহারা নিয়েছে। পয়লা বৈশাখ আসার এক মাস আগে থেকে চৈত্র সেলের ধুম। নতুন বঙ্গাব্দে নতুন পোশাক কেনার রেওয়াজ হয়েছে। বাঙালি আর কিছু খেয়াল রাখুক বা না-রাখুক, পুজোর দিনকটা, বঙ্গাব্দের প্রথম দিন আর ২৫শে বৈশাখের ইংরিজি তারিখগুলো মনে রাখার চেষ্টা করছে। রাত ১২টায় যে বাংলা তারিখ পালটায় না, সে কথা মনে না রেখেই ‘উইশ ইউ আ ভেরি হ্যাপি বেঙ্গলি নিউ ইয়ার’ মেসেজ পাঠানো শুরু করবে রাত থাকতেই। সকালের মধ্যেই মোবাইলের ইনবক্স আর হোয়াটসঅ্যাপ ভরে যাবে মেসেজে। তার পর মোবাইল বা ল্যান্ডলাইনে শুরু হবে গুরুজনদের প্রণাম পাঠানোর ধুম। এ বার সারা দিনের জন্য কোথাও বেরিয়ে পড়া। সেটা কোনো কারণে সম্ভব না হলে দুপুরে বাড়িতে ঠেসে খাওয়ার পর রাতে রেস্তোরাঁয় আহার।

নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো খামতি রাখবে না বাঙালি। কিন্তু সব কিছুই যেন কৃত্রিম, লোকদেখানো। নেই সেই হৃদয়ের পরশ যেটা আমরা এক সময় পেতাম হালখাতা, গঙ্গাস্নান, গুরুজনদের প্রণাম আর দু-একটা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

1 মন্তব্য

  1. lekha ta khub valo laglo.lehatar madhye chelebelar smriti ke jagie tola hoeche.duravas jantrar dayae paela boisakh kare kaye vule gechi.lekhak ei rakam aro purano smriti jagie tulun.

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here