rahin
Samir mahat
সমীর মাহাত

জঙ্গলমহলে শুরু হল ঐতিহ্যবাহী লোক-পরব রহৈন্। চলবে টানা সাত দিন। কুড়মি জনজাতি অধ্যুষিত গোটা জঙ্গলমহল-সহ ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখ শুরু হয় এই লোক-পরব। প্রকৃতির পূজারি এই লোক-সম্প্রদায় প্রাচীন কাল থেকে আচার ও নিয়মের মাধ্যমে এই পরব পালন করে আসছে। ‘রহৈন্’ হল কৃষিকেন্দ্রিক মৃত্তিকাপূজা। শুধু মৃত্তিকাই নয়, এই সংস্কৃতির নামে লতাগাছ ও পোকাও রয়েছে। লোক-সম্প্রদায়ভুক্ত বিশিষ্ট প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, গোটা রহৈন্ পরবের মূলত তিনটি অংশ। লোক-ভাষায় সেগুলি হল, ‘টেটকো’, ‘ডাহা’ এবং ‘রহৈন্’।

টেটকো বলতে সম্ভবত নানা রকমের টোটকার কথায় বলা হচ্ছে। এই পরবে সাদা বেলে মাটি বা রহৈন্ মাটি সংগ্রহ করেন ঘরের গৃহবধূরা। সাঁঝের বেলা কোনো কথা না বলে এই মাটি সংগ্রহ করতে হয়। দলবদ্ধ ভাবে ফেরার পথে খেয়াল রাখতে হয় অন্যের পায়ে যেন পা না লাগে। মাটি এনে পুজো করে তুলসী থানে, চালার কোনের কাঠে রাখা হয়। এই মাটি সারা বছর প্রতিষেধক হিসেবে কাজে লাগানো হয়। আগে সন্তানদের নাভি কাটার পর বা ষাঁড় গরুকে বলদকরনের সময় আঘাতস্থানে এই মাটিই এক মাত্র ওষুধ হিসাবে প্রলেপ দেওয়া হত। এই সাত দিনের মধ্যে অনেকেই নিমছাল, মুসুর ও রহৈন্ ফল এক সঙ্গে বেটে খায়। লোক-সংস্কার মতে, ওই বাটাটি খেলে সারা বছর সাপের বিষ থেকে প্রতিকার মেলে।

রহৈন্ পোকা
রহৈন্ পোকা

রহৈন্ গাছ হল কাঁটাযুক্ত লতা। এর ইংরেজি নাম capparis belnika, কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে লাল হয়। এই পরবে অনেকেই তা রান্না করে খায়। অদ্ভুত ভাবে এই সময়ই মাকড়সার মতো বিশেষ এক ধরনের সিঁদুরে লাল পোকা বছরে একটি বারই দেখা যায়। এটি হল রহৈন্ পোকা। এই পোকার বৈজ্ঞানিক নাম red mite , তবে লোকসমাজ রহৈন্ পোকা নামেই চেনে।

রহৈন্ ফল
রহৈন্ ফল

‘ডাহা’ বলতে সম্ভবত আবহাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। নিম, জৈড় (অশ্বত্থ), আম – এই তিন বৃক্ষের চেহারা দেখে নির্দিষ্ট করা হয় যে, চলতি বছর কী ‘ডাহা’ চলবে। পাশাপাশি, রহৈনালি তাক (নির্দিষ্ট সময়) হিসেবে ধানের চারা ফেলার কাজ এই সাত দিনের মধ্যেই সেরে ফেলা শুভ বলে লোক-বিশ্বাস। কুড়মি সংস্কৃতিসমাজের প্রবীণ ব্যক্তি অশোক মুতরুয়ার বলেন, রহৈন্ হল মাটি ও প্রকৃতির পুজা। একমাত্র কুড়মিরাই এর ধারক ও বাহক। এই সাত দিনের রহৈনের আবহাওয়া অনেক কিছুর আগাম সঙ্কেত দেয়। এই সময় বৃষ্টি না হলে সাপের বিষ তীব্র হয়। লোক-সমাজ রহৈন্ গাছ বলে যা চেনেন, তার ভেষজ গুণ অনেক বলে জানান উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ দে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here