সঞ্চিতা হালদার ও সম্রাট চন্দ

ঐতিহ্য তো ছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে থিমের জৌলুস। কয়েক শতক পার করে এসেও আজও শান্তিপুরের রাস উৎসবের দুর্নিবার আকর্ষণে মানুষ ছুটে যায় অদ্বৈতভূমিতে, বারবার। বুধবার থেকে শুরু হয়েছে শান্তিপুরের রাস। এ দিন সন্ধ্যা থেকেই শান্তিপুরের অলিগলির দখল নিয়েছে উৎসবমুখর জনতা। আনন্দোৎসবে জনপ্লাবনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বিগ্রহবাড়িগুলি থেকে শুরু করে নানান বারোয়ারি পূজা মণ্ডপে।

সেই কবে। বৈষ্ণব চূড়ামণি শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের হাতে সূচনা হয়েছিল যে রাস উৎসব, কালের নিয়মে তা আজ বৃহত্তর সমাজের আংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা আজ হয়ে উঠেছে বারোয়ারি। শান্তিপুরের রাস কিন্তু আজ আর কেবল মাত্র ধর্মীয় আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিকতার ছোঁয়ায়, উৎসবের জৌলুসে এই রাস এখন দেশ-বিদেশের মানুষের কাছেও এক অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। এক দিকে তার ঐতিহ্য আর এক দিকে তার আধুনিকতা। এই দুইয়ের মেল বন্ধনে শান্তিপুরের রাস পেয়ে গিয়েছে এক অন্য মাত্রা। ঢাকার জন্মাষ্টমী, বৃন্দাবনের ঝুলনের পাশাপাশি শান্তিপুরের ভাঙা রাস এখন আর শুধু বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যেই নয়, সমান ভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। তাই রাস থেকে ভাঙা রাসের শোভাযাত্রা এমনকী কুঞ্জভঙ্গতেও সাধারণ মানুষের উপস্থিত এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে একটা অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

অদ্বৈতাচার্য প্রথম শান্তিপুরে রাসের সূচনা করলেও সেই রাসের কোনও আড়ম্বর ছিল না। পরে তার পৌত্র মথুরেশ গোস্বামীর সময় থেকেই এই রাস কার্যত উৎসবের আকার নিতে থাকে। এই মুহূর্তে একাধিক বিগ্রহ-বাড়িতে রাস হয়। তার মধ্যে অদ্বৈতৈচার্যের বংশের বিভিন্ন শাখার একাধিক বাড়ির রাস এখনও সমান জনপ্রিয়। বিশেষ করে বড়গোস্বামী বাড়ির রাস শান্তিপুরের রাসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই বাড়ির ভক্তি আর আড়ম্বরের কারণে এই বাড়ির রাসের খ্যাতি দেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশের মাটিতেও। এ ছাড়াও রয়েছে মধ্যমগোস্বামী বাড়ি, ছোটগোস্বামী বাড়ি-সহ মদনগোপালগোস্বামী বাড়ি, পাগলাগোস্বামী বাড়ি, আতাবুনিয়া-গোস্বামী বাড়ি, বাঁশবুনিয়া-গোস্বামী বাড়ি। এই গোস্বামী বাড়িগুলি ছাড়াও খাঁ চৌধুরী বাড়ি, সাহা বাড়ি, বংশীধারী ঠাকুর বাড়ি, মঠ বাড়ি, আশানন্দ বাড়ি, রায় বাড়ি, কালাচাঁদ বাড়ি, প্রামাণিক বাড়ি, গোস্বামী ভট্টাচার্য বাড়ি, গোপীনাথ জীউ ঠাকুর বাড়ি, মুখোপাধ্যায় বাড়ির রাস বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও একাধিক বিগ্রহবাড়িতে এখনও যথেষ্ট ধূমধামের সঙ্গে রাস হয়। এ ছাড়াও পোদ্দার বাড়ি, দীনদয়ালবাবুর বাড়ি, যদুনাথ কাঁশারির বাড়ির রাস বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। আড়ম্বরের পাশাপাশি ভক্তিই এই সব বিগ্রহবাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য। আজও হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর রাত জেগে ধুরে ঘুরে দেখেন এই সব বিগ্রহবাড়ির রাস। আর এঁরাও কিন্তু আয়োজনে এতটুকু ঘাটতি রাখেন না।

rash1

শান্তিপুরের রাস দেখতে সাধারণ মানুষ আসেন দূরদূরান্ত থেকে। অনেকেই তিন দিন ধরেই থেকে যান এখানে। বিগ্রহবাড়িগুলির রাসমঞ্চের সামনেই শিবির করে দর্শনার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

এই সমস্ত বিগ্রহবাড়ির ঐতিহ্যবাহী রাসের পাশাপাশি নানা বারোয়ারির আকর্ষণীয় থিমের রাস তার যাবতীয় সম্পদ দিয়েই সমৃদ্ধশালী করেছে অদ্বৈতভূমির উৎসবকে। আর তার হাত ধরেই কোচবিহার থেকে লন্ডন সবই উঠে এসেছে শান্তিপুরে। সবুজায়নের বার্তা থেকে আদিবাদী সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রয়াসের মধ্যে দিয়েই বারোয়ারি রাসগুলি এখানকার রাস উৎসবকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। শান্তিপুরের থানার মোড় রাস উৎসব কমিটি যেমন তাদের থিম হিসাবে বেছে নিয়েছে উত্তরবঙ্গের এক রাজবাড়িকে। কাঠ, কাপড়, প্লাই দিয়ে তৈরি করেছে কোচবিহারের রাজবাড়ি। অন্য দিকে আবার বৌবাজারপাড়া বারোয়ারির থিম ছেলেবেলার পুতুলখেলা। নানান সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটের দাপটে আজকের ছোটদের সেই পুতুল নিয়ে খেলা হারিয়ে গেছে। তাকেই ফের মনে করিয়ে দিয়ে তারা মণ্ডপ সাজিয়েছে প্লাই, কাঠ, মাটি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পুতুল দিয়ে। তামাচিকাপাড়া বারোয়ারির পুজোয় আবার সবুজায়নের বার্তা। প্লাস্টিকের গাছ, পাতা, ফুল দিয়ে তারা তাদের মণ্ডপ সাজিয়েছেন। তরফদারপাড়া রাস বারোয়ারির পুজোয় চাটাই, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মূর্তি। আর তার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দুর্গার নানান রূপ। এখানেই তৈরি হয়েছে কাঠের রাধাকৃষ্ণের মুর্তি। বড়গোস্বামী পাড়া বারোয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের মণ্ডপে আবার হাজির এক টুকরো আদিবাসি গ্রাম। কাঠ, চট, বাঁশ, খড় ইত্যাদি দিয়ে আদিবাসী গ্রাম তৈরি করা হয়েছে। ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আদিবাসী উৎসবের চিত্র। আগমেশ্বরীতলা ইয়ং স্টাফের মণ্ডপ সেজেছে লন্ডনের টেমস নদীর ওপর ব্রিজের আদলে। কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছে সুদৃশ্য মণ্ডপ। সেতু দিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহন। এমনকী জলপথে জলযান যাওয়ার সময় সেতুটি দু’ভাগে ভাগ হয়ে তার জন্য রাস্তা করে দেওয়ার চিত্রও তুলে ধরা হচ্ছে যন্ত্রের সাহায্যে। এই উৎসবকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনের তরফেও যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শান্তিপুর জুড়ে তৈরি হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য ৫টি আশ্রয় শিবির, ১২টি স্বাস্থ্য শিবির। এ ছাড়াও রয়েছে সহায়তা কেন্দ্র।

ras4

তবে এর বাইরেও বেশ কিছু বড় বড় পুজো কমিটি আছে যারা সে ভাবে মণ্ডপ তৈরি করে না। এই সব পুজো কমিটি ভাঙা রাসের শোভাযাত্রায় বের হয়। দিন দিন তাই শান্তিপুরের ভাঙা রাসের পাশাপাশি ভাঙা রাসের শোভাযাত্রাও সমান আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। আর তারই আকর্ষণে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস ট্রেন বোঝাই করে হাজার হাজার মানুষ হাজির হন শান্তিপুরে। জনস্রোতে ভেসে যায় রাতের শান্তিপুর। শান্তিপুর পুরসভার পুরপ্রধান তৃণমূলের অজয় দে বলেন, ‘‘রাস কিন্তু এখন আর শুধু মাত্র ধর্মীয় বিষয় নয়। শান্তিপুরের রাস এখন সেই ধর্মীয় গণ্ডী ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। এখন এই উৎসবের জন্য সারা বছর ধরে এই শহরের সব ধর্মের মানুষ অধীর অপেক্ষায় থাকেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভুলে সকলেই মেতে ওঠেন এই উৎসবে।’’ এ ভাবেই কিন্তু ভক্তি, ঐতিহ্যের সঙ্গে শিল্প ভাবনা আর আধুনিকতার মিশেলের সঙ্গে সঙ্গে শান্তিপুরের রাস হয়ে উঠেছে মানুষের মহামিলন ক্ষেত্র।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here