Connect with us

মেলাপার্বণ

ঐতিহ্যের শান্তিপুরে রঘুনাথের রথযাত্রা

শুভদীপ রায় চৌধুরী

সেই প্রাচীন কাল থেকেই শান্তিপুরের আনাচেকানাচে শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব, এই তিন ধারার মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। এই অঞ্চলের কালীপুজো, রাসযাত্রা যেমন বিখ্যাত তেমনই বহু প্রাচীন শিবমন্দিরও রয়েছে যেখানে শিবরাত্রির উৎসবও পালন করা হয় ধুমধাম করে। শান্তিপুরে রয়েছে বিভিন্ন গোস্বামীবাড়িও। তাদের ঐতিহ্য এবং প্রাচীন রীতিনীতি আজ এক ইতিহাস। মূলত এই গোস্বামীবাড়িগুলির দৌলতেই শান্তিপুরে সাড়ম্বরে পালিত হয় রথযাত্রা। কারও বয়স তিনশো বছর, আবার কারও বয়স দু’শো কিংবা দেড়শো বছর। এ বছরও প্রাচীন রীতি মেনেই পালিত হচ্ছে রথ উৎসব, তবে রথ নিয়ে শোভাযাত্রা হয়নি। করোনাভাইরাস জনিত পরিস্থিতির কারণে ভক্তসমাগমও প্রায় দেখাই যায়নি রথের দিন।

{ "slotId": "6629201461", "unitType": "responsive", "pubId": "pub-3207145692559075", "resize": "auto" }

পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মাহেশ, গুপ্তিপাড়া, বড়িশার রথের মূল দেবতা জগন্নাথ হলেও শান্তিপুরের রথের কেন্দ্রে রয়েছেন শ্রীরঘুনাথ। শ্রীরঘুনাথের পাশাপাশি জগন্নাথদেবও রয়েছেন, তবে রথের মূলে থাকেন শ্রীরঘুনাথই। শান্তিপুরের বড়ো গোস্বামীবাড়ি, মধ্যম গোস্বামীবাড়ি বা হাটখোলা গোস্বামীবাড়ি, সাহাবাড়ি–সহ প্রাচীন সমস্ত রথ উৎসবেই প্রধান দেবতা হলেন এই রঘুনাথ বা রামচন্দ্র। তাঁরই দারুমূর্তি পূজা করা হয়।

আরও পড়ুন: রথযাত্রায় কাঠামোপুজো, বনেদিবাড়ির পুজোর সূচনা

নদিয়া জেলার সুপ্রাচীন জনপদ এই শান্তিপুরে রামচন্দ্রের বিগ্রহকে কেন্দ্র করেই রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়। এই অঞ্চলের রঘুনাথ বিগ্রহটি অন্যদের থেকে একটু আলাদা, অর্থাৎ এখানে রঘুনাথ বা রামচন্দ্র পদ্মাসনে বসে আছেন, তাঁর গায়ের রঙ সবুজ আর ধুতি ও চাদর রয়েছে তাঁর গায়ে। এমন বিগ্রহই দেখা যায় শান্তিপুরের রথে।

শান্তিপুরে বড়ো গোস্বামীদের রথযাত্রা সব চেয়ে প্রাচীন, বয়স হল আনুমানিক তিনশো বছর। এই গোস্বামীদের হাতে রঘুনাথ বিগ্রহ তুলে দিয়েছিলেন গুপ্তিপাড়ার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা, যখন তাঁরা শান্তিপুরের বসতি ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। সেই থেকে রঘুনাথ রয়েছেন বড়ো গোস্বামীদের বাড়িতে। রঘুনাথকে কেন্দ্র করে প্রথমে রথযাত্রা হলেও পরে জগন্নাথদেবকেও বসানো হয় রথে। সঙ্গে থাকেন বলভদ্র ও সুভদ্রাদেবী।

কিন্তু শান্তিপুরের রথ উৎসবের কেন্দ্রে রঘুনাথ কেন? এর সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে একটি যুক্তি হল, ফুলিয়ার কৃত্তিবাসকে স্বীকৃতি দিতেই রামের গুরুত্ব বেড়েছে এই অঞ্চলে। শুধু বড়ো গোস্বামীবাড়িতেই নয়, শান্তিপুরের আরও যে যে বাড়িতে রথযাত্রা হয় তাদেরও রথের মূল দেবতা রামচন্দ্র ওরফে রঘুনাথ।

মধ্যম গোস্বামীবাড়ির রঘুনাথ।

বড়ো গোস্বামীবাড়ির আদি রথটি ছিল লোহার, প্রায় পঞ্চাশ ফুট উচ্চতা। দেড়শো বছর আগে সেই রথটি নষ্ট হয়ে গেলে একটু অপেক্ষাকৃত ছোটো কাঠের রথ তৈরি করা হয়েছিল। কালের নিয়মে সেটিও নষ্ট হলে ফের একটি লোহার রথ তৈরি করা হয়। রথের দিন গোস্বামীবাড়ি থেকে রঘুনাথ, জগন্নাথ-সহ বিভিন্ন বিগ্রহকে রথের কাছে নিয়ে আসা হয়। রথের একদম শীর্ষে রঘুনাথ-সহ জগন্নাথদেব, বলভদ্রদেব ও সুভদ্রাদেবীকে বসানো হয়।

এ বছর রথের ছবিটি সম্পূর্ণ আলাদা এই করোনার জন্য। বড়ো গোস্বামীবাড়ির রথ বের হল না, শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য রথের সামনে শালগ্রামশিলা এনে পুজো হল। তবে প্রাচীন নিয়ম মেনেই পুজো হয় বড়ো গোস্বামীবাড়িতে।

শুধুমাত্র বড়ো গোস্বামীই নয়, সাহাদের বাড়ির রথও বিখ্যাত এই শান্তিপুরে। গোস্বামীদের অনুসারী ভক্ত জমিদার হীরালাল সাহা দেড়শো বছর আগে রথযাত্রা শুরু করেছিলেন। এই বাড়ির রথযাত্রা হীরালাল সাহা শুরু করলেও জনপ্রিয় হয়েছিল কুঞ্জবিহারী সাহার আমলে। প্রায় ১৬ ফুট উচ্চতার কাঠের রথ বের হত সাহাবাড়ির মন্দির থেকে, তবে তার বদলে এখন লোহার রথ নামে। এ বছর ভক্তিসহকারে পুজো হল, সাহাবাড়িতেও তবে ভক্তসমাগম হয়নি। এই বাড়িতেও প্রথমে শ্রীশ্রীজগন্নাথের রথ হলেও পরে রথের মধ্যমণি হন শ্রীরঘুনাথ।

এ ছাড়া মধ্যম গোস্বামীবাটীর রথযাত্রাও বহু প্রাচীন। এই রথ উৎসবেরও মূলে রয়েছেন রঘুনাথ। রঘুনাথের পাশাপাশি জগন্নাথও থাকেন রথে। তাই বলাই যায়, আমরা সাধারণত যে রথযাত্রা অন্যত্র দেখি তার থেকে শান্তিপুরের রথ সত্যই আলাদা।

কলকাতার পুজো

চোরবাগান চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপূজায় ভোগ রান্না করেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা

শুভদীপ রায় চৌধুরী

উত্তর কলকাতা মানেই বনেদি বাড়ির দুর্গাদালানে বহু বছরের ঐতিহ্যকে ফিরে পাওয়া। তিলোত্তমার এই মহোৎসব বহু প্রাচীন, তার মধ্যে অন্যতম হল মধ্য কলকাতার চোরবাগানের চট্টোপাধ্যায় পরিবার।

{ "slotId": "6629201461", "unitType": "responsive", "pubId": "pub-3207145692559075", "resize": "auto" }

চোরবাগানের রামচন্দ্র ভবনের নির্মাতা রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাড়ির ঠাকুরদালানে ১৮৬১ সালে শুরু করেন দেবী দুর্গার আরাধনা স্ত্রী দুর্গাদাসীর পরামর্শে। রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বহু টাকা উপার্জন করে ১২০ নং মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে বাড়ি তৈরি করলেন। সেই বাড়িতেই পুজো শুরু করেন রাঢ়ী শ্রেণির ব্রাহ্মণ।

অন্যান্য বহু বাড়িতে রথের সময় কাঠামোপুজো হলেও, চট্টোপাধ্যায় পরিবারে কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হয় জন্মাষ্টমী তিথিতে। কাঠামোপুজোর দিন একটি লাঠিকে (পরিবার সূত্রে জানা যায় এই লাঠির বয়স পুজোরই সমসাময়িক) পুজো করা হয়। তার পর সেই লাঠিটি দিয়ে আসা হয় কুমোরটুলিতে। সেখানেই নিমাই পালের স্টুডিওতে  সপরিবার মৃন্ময়ী তৈরি হন।

অতীতে বাড়িতেই ঠাকুর তৈরি হত, রূপ দিতেন নিমাই পালের পূর্বসূরিরা। তবে বর্তমানে কুমোরটুলি থেকেই মা আসেন চট্টোপাধ্যায়দের বাড়িতে দেবীপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে। দুর্গাপুজোর পঞ্চমীর দিন দেবীকে বেনারসি শাড়ি ও বিভিন্ন প্রাচীন স্বর্ণালংকার পরানো হয়।

পরিবারের সদস্য অরিত্র চট্টোপাধ্যায় একটি বিশেষ রীতির কথা জানালেন। তিনি বলেন, “এই বাড়িতে ষষ্ঠীর দিন রাত্রিবেলা হয় বেলবরণ উৎসব। কথিত আছে, কৈলাস থেকে মা এসে বেলগাছের তলায় বিশ্রাম নেন। তাই ষষ্ঠীর দিন বাড়ির মহিলারা গভীর রাত্রে মায়ের চার দিকে প্রদক্ষিণ করে বরণ করেন ও দেবীকে স্বাগত জানান সে বছরের জন্য।”

সপ্তমীর দিন বাড়িতেই কলাবউ স্নান করানো হয়। আগে এই বাড়িতে ডাকের সাজের প্রতিমা হলেও পরে পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে চট্টোপাধ্যায় পরিবারে পুজো করে থাকেন শিশিরকুমার চট্টোপাধ্যায়।

অতীতে এই বাড়িতে বলিদান হত। সপ্তমী ও সন্ধিপূজায় একটি করে ও নবমীর দিন তিনটি পাঁঠাবলি দেওয়া হত। সেই প্রথা আজ বন্ধ, বর্তমানে প্রতীকী বলিদান হয় পুজোর সময়।

২০১৯-এ দুর্গাসপ্তমীর দিন চোরবাগানের চট্টোপাধ্যায় বাড়ির ইতিহাস সংবলিত পুস্তিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রবীণ সাংবাদিক ও জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ মতিলাল (মাঝে) ও সাংবাদিক-লেখক শংকরলাল ভট্টাচার্য (ডান দিকে)।

চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এই বাড়িতে ভোগ রান্না করেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা। খিচুড়ি, নানান রকমের ভাজা, শুক্তনি, চিংড়িমাছের মালাইকারি, ভেটকিমাছের ঘণ্ট, লাউচিংড়ি, চাটনি, পায়েস, পানতুয়া ইত্যাদি নানান রকমের ভোগ রান্না করে দেবীকে নিবেদন করা হয়।

এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর দশমীর দিন হয় রান্নাপুজো, যাকে বলা হয় দুর্গা-অরন্ধন দিবস, অর্থাৎ আগের দিন সমস্ত রান্না করা হয়। দশমীর দিন ভোগ থাকে পান্তাভাত, ইলিশমাছের অম্বল, চাতলার চাটনি, কচুশাক ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: দুর্গাপুজোর সূচনা: মতিলাল শীল বাড়ির কাঠামোপুজো হল উল্টোরথের দিন

দুর্গাপুজোর দশমীর দিন পরিবারের সদস্যরা মিলে মায়ের সামনে এক প্রার্থনাসংগীত পরিবেশন করেন। সকলে মিলে দেবীর কাছে অশ্রুজলে প্রার্থনা জানান ১৬ পঙক্তির স্তব গেয়ে। অতীতে এই চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে এক কীর্তনের দল ছিল, ‘রাধারমণ কীর্তন সমাজ’ নামে। দলটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের চিন্তামণি চট্টোপাধ্যায় ও মণীন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। এঁরাই মূলত গান করতেন। তাই সেই প্রাচীন কাল থেকেই ঠাকুরের বিসর্জনের আগে সবাই মিলে প্রচলিত সুরে গানটি করেন – ‘ভজিতে তোমারে শিখি নাই কভু / ডাকি শুধু তোমায় মা বলে।/ সাধনার রীতি জানি নাকো নীতি / পূজি শুধু তোমায় আঁখিজলে…”।  

Continue Reading

কলকাতার পুজো

দুর্গাপুজোর সূচনা: মতিলাল শীল বাড়ির কাঠামোপুজো হল উল্টোরথের দিন

শুভদীপ রায় চৌধুরী

কলকাতার বনেদিবাড়িতে এ বছরের উমা-বন্দনার জয়ধ্বনি শুরু হয়ে গেল বলা যেতেই পারে। গুটিকতক বনেদিবাড়ি ছাড়া বাকি সমস্ত বনেদিবাড়িতেই কাঠামোপুজো হয়ে গেল রথের দিন আবার কারও বা উলটোরথের দিন।

{ "slotId": "6629201461", "unitType": "responsive", "pubId": "pub-3207145692559075", "resize": "auto" }

উত্তর কলকাতার বনেদিবাড়ির মধ্যে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে কলুটোলার শীলদের বাড়ি। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর কাঠামোপুজো হয়ে গেল  উলটোরথের দিন। এ বার তৈরি হবে শীলবাড়ির মৃন্ময়ী প্রতিমা।

কাঠামোপুজো সম্পন্ন হল।

পুজোর সময় ঠাকুরদালান ঝলমল করবে ঝাড়বাতির আলোয় আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হবে গোটা ঠাকুরদালান। শীলবাড়ির পুরোহিত ও প্রতিমাশিল্পী বংশপরম্পরায় আসেন তাঁদের বাড়িতে পুজোর সময়।

শীল পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন উত্তর কলকাতার স্বনামখ্যাত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মতিলাল শীল আনুমানিক ১৮৩০সালে। মতিলালবাবু ও তাঁর স্ত্রী আনন্দময়ী দাসী কলুটোলার বাড়িতেই শুরু করেন দেবী দুর্গার আরাধনা। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ তিথিতে ঘট স্থাপন করা হয়, সেখানেই পুজো চলে।

এই বাড়ির দুর্গাপুজোয় অন্নভোগ নিবেদনের প্রথা নেই তবে চালের নৈবেদ্য, ফল ও বাড়িতে তৈরি মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয় দেবীর উদ্দেশে। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন মতিলাল শীলের ঘাটে নবপত্রিকার স্নান হয় ও সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মহাষ্টমীর দিন সন্ধিপূজার সময় বাড়ির মহিলারা ধুনো পোড়ানোয় অংশগ্রহণ করেন। মহানবমীর দিন রাতে ব্রাহ্মণ-বিদায় হয় ঘটা করে।

শীলবাড়ির ঠাকুরদালান।

মতিলাল শীলের বাড়ির ঠাকুর ১৯৪৫ সাল অবধি কাঁধে করে বিসর্জন হত, কিন্তু ১৯৪৬ সাল থেকে সেই প্রথা বন্ধ আছে। ২০০০ সাল অবধি দশমীর দিন  নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত কিন্তু সেই প্রথাও আজ বন্ধ। তবে ঐতিহ্য ও আভিজাত্যে আজও অটুট মতিলাল শীল পরিবারের দুর্গাপুজো।

Continue Reading

মেলাপার্বণ

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির তিন চণ্ডীমন্দির

শুভদীপ রায় চৌধুরী

আজ ১৫ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার, বিপত্তারিণী চণ্ডীপুজোর অন্যতম দিন। এর আগে ১২ আষাঢ়, শনিবারও বিপত্তারিণী ব্রত উদযাপনের আরও একটি দিন ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বহু প্রাচীন মন্দিরে এই দু’ দিন দেবী চণ্ডীর ব্রত পালন করেন বাঙালি মেয়েরা। চণ্ডী-মাহাত্ম্যের কথা যে বহু প্রাচীন, তা বলার অপেক্ষাই রাখে না। দক্ষিণ কলকাতার শহরতলির তেমনই তিন চণ্ডীমন্দিরের ইতিহাস তুলে ধরা হল এই প্রতিবেদনে।

{ "slotId": "6629201461", "unitType": "responsive", "pubId": "pub-3207145692559075", "resize": "auto" }

বড়িশার চণ্ডীমন্দির

বড়িশার চণ্ডীবাড়ির মা চণ্ডী।

দক্ষিণ কলকাতায় ডায়মন্ড হারবার রোডে সখের বাজার মোড়ের কাছেই বড়িশার চণ্ডীমন্দির। জনশ্রুতি, এই চণ্ডীমন্দির প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন। কিন্তু লিখিত ইতিহাস বলে, সাবর্ণ গোত্রীয় মহেশচন্দ্র রায় চৌধুরী ১৭৯২ সালে দুর্গাপঞ্চমীর দিন নিজ বাটীতে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাবর্ণদের এই বাড়ি চণ্ডীবাড়ি নামেই পরিচিত। চণ্ডীবাড়িটি তিনতলা মন্দির। এই মন্দিরেই চণ্ডীর অষ্টধাতুর কলস রয়েছে, যার নিত্যসেবা হয়।

চণ্ডীবাড়ির নিকটেই তৈরি হয় চণ্ডীমন্দির, যেখানে বছরে একবার মৃন্ময়ী রূপে দেবী আসেন। এই মন্দির তৈরি করেছিলেন মহেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর পুত্র হরিশচন্দ্র রায় চৌধুরী। অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী এবং নবমীতিথিতে চণ্ডীপুজো কেন্দ্র করে বিশাল মহোৎসব হয়, বসে বিরাট মেলাও।

তবে অগ্রহায়ণ মাসে মায়ের বার্ষিক পুজো হলেও বিপত্তারিণী চণ্ডীপুজোর দিনও ভক্তের ভিড় দেখার মতন হয়। সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় পুজোপাঠ। এই দিন দেবীকে লুচিভোগ দেওয়া হয়। লুচি ছাড়াও থাকে বিভিন্ন রকমের ভাজা, তরকারি, মিষ্টান্ন ইতাদি। পূজার পাশাপাশি আরতি এবং ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলিও চলে সকাল থেকেই।

রাজপুর বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়ি

দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া-বারুইপুর সড়কে রাজপুর বাজারের আগেই বাঁ দিকের পথ ধরে কিছুটা গেলেই রাজপুর বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়ি। বাবা দুলাল প্রতিষ্ঠিত এই বাড়ির চণ্ডীপুজোও বেশ প্রাচীন। বাবা দুলাল মা চণ্ডীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নিজের বাড়িতে। নিত্যপুজো হয় রাজপুরে মা বিপত্তারিণী চণ্ডীর বাড়িতে।

রাজপুর বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়ির সংগ্রহশালা।

বাবা দুলাল তাঁর প্রথম ইচ্ছায় দক্ষিণাকালীর মূর্তি তৈরি করতে দিয়েছিলেন। কিন্তু দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন দক্ষিণাকালী নয়, বিপত্তারিণী চণ্ডীর মূর্তি গড়তে। দেবী তাঁর রূপও বলে দেন, অর্থাৎ এখানে দেবী সিংহবাহিনী, তাঁর চার হাত, এক হাতে মহাশূল, এক হাতে খড়গ ও অন্য দুই হাতে বরাভয় ও অভয় দান করছেন তিনি। তিনি আরও জানিয়ে দেন, সকল ভক্তকে বিপদে উদ্ধার করতেই তিনি বাবা দুলালকে দিয়ে তাঁর প্রচার করাতে চান। শুধুমাত্র মূর্তিরই বর্ণনা নয়, তিনি পুজোর পদ্ধতিও শিখিয়ে গিয়েছিলেন দুলাল বাবাকে। সেই থেকে রাজপুরে মা বিপত্তারিণী চণ্ডী রয়েছেন।

নিয়ম অনুসারে এখানে সোজা রথ ও উলটোরথের মাঝের মঙ্গলবারে বিপত্তারিণীর পুজো হয়। পুজোর দিন একেবারে ভোর থেকেই এখানে ভক্ত সমাগম শুরু হয়ে যায়। সবাই মাকে তেরো রকমের ফল, মিষ্টান্ন দিয়ে পুজো দেন।

এই রাজপুর চণ্ডীবাড়িতে এক বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয় দুর্গাপুজোর নবমীর দিন। দেবীর দুর্গার উদ্দেশে ভোগ নিবেদন করার পেছনে একটি ঘটনা রয়েছে। ওই অঞ্চলে প্রাচীন এক দুর্গাপুজো হয়। একদিন বাবা দুলাল স্বপ্নাদেশ পান, নবমীর দিন যেন তাঁর জন্য ভোগ দেওয়া হয়। সেই থেকে দুর্গাপুজোর মহানবমীর দিন দেবী দুর্গার উদ্দেশে ভোগ দেওয়া হয় চণ্ডীবাড়ি থেকেই।

রাজপুর বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়িতে এক সংগ্রহশালা রয়েছে, যেখানে বহু পুরোনো জিনিস রয়েছে যা বাবা দুলাল ব্যবহার করতেন, রয়েছে রাজপুরের চণ্ডীবাড়ির প্রাচীন কিছু ছবিও। মা চণ্ডীর বিগ্রহ ছাড়াও এখানে বহু দেবদেবীর বিগ্রহ রয়েছে, তার সঙ্গে বাবা দুলালের বিগ্রহও রয়েছে।

কালীবাজার বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়ি

কালীবাজার বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়ির মা চণ্ডী।

কবি নজরুল মেট্রো স্টেশন থেকে বাসে বা অটোয় চলে আসুন মহামায়াতলা। সেখানে থেকে রিকশা ধরে পৌঁছোতে হবে লেকগার্ডেন লস্করপুরে। এখানেই কালীবাজার বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়ি।

রাজপুরের চণ্ডীবাড়ি থেকেই পুরোহিত এসে এই বাড়ির মাকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গিয়েছিলেন। এই বাড়ির মায়ের মূল সেবক সুব্রত দাস মহাশয় জানালেন, রাজপুর বিপত্তারিণী চণ্ডীবাড়িরই নিয়মকানুনম মেনে এক ভাবেই মায়ের পুজো করা হয়।  তবে এই কালীবাজারের চণ্ডীবাড়িতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও পালিত হয়। তা ছাড়া কালীপুজোর দিন হয় দেবীর অন্নকূটসেবা।

বিপত্তারিণী চণ্ডীপুজোর দিন সকাল থেকে ভক্তের ভিড় দেখা যায়। ভক্তরা তেরো রকমের ফল, মিষ্টান্ন দিয়ে পুজো দেন মাকে আবার প্রসাদ নিয়ে ফিরে যান। করোনাভাইরাসের কারণে এত দিন মন্দির বন্ধ থাকলেও কাল বুধবার ১ জুলাই মন্দির খুলছে এবং সমস্ত রকমের নিয়মবিধি মেনেই পুজো নেওয়া হবে। তবে আজ মঙ্গলবার বিপত্তারিণী ব্রত পালিত হচ্ছে। এই মন্দিরে মায়ের সন্ধ্যারতির পর নামগান করা হয়।

Continue Reading
Advertisement
বিনোদন3 hours ago

চলে গেলেন ‘শোলে’-র ‘সুরমা ভোপালি’ জগদীপ

দেশ6 hours ago

জম্মু-কাশ্মীরে বাবা এবং ভাই-সহ বিজেপি নেতাকে গুলি করে মারল জঙ্গিরা

ঝাড়গ্রাম6 hours ago

টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে, সক্রিয় রাজনীতিতে লালগড় আন্দোলনের মুখ ছত্রধর মাহাত

দেশ7 hours ago

৮৯টি অ্যাপ ‘নিষিদ্ধ’ করল ভারতীয় সেনা

বিনোদন7 hours ago

সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যাকাণ্ডে সলমন খান, করন জোহরের বিরুদ্ধে মামলা খারিজ আদালতে

দেশ8 hours ago

উজ্জ্বলা যোজনায় বিনামূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়ার মেয়াদ বাড়ল আরও তিন মাস

রাজ্য8 hours ago

রেকর্ড বৃদ্ধি, রাজ্যে একদিনে আক্রান্ত প্রায় ১০০০

কলকাতা9 hours ago

অনলাইনে নয়, পড়ুয়াদের জন্য এই বিকল্প পথই বেছে নিয়েছে গড়িয়া স্টেশনের একটি স্কুল

কেনাকাটা

কেনাকাটা1 day ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা2 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা4 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

কেনাকাটা1 week ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক :  এক ঘেয়ে সময় কাটছে না? ঘরে বসে করতে পারেন ডিআইওয়াই অর্থাৎ ডু ইট ইওরসেলফ। বাড়িতে পড়ে...

নজরে