tusu idol
টুসু মূর্তি। নিজস্ব চিত্র।

মৃণাল মাহাত

“আইসছে মকর দুদিন সবুর কর/তরহা মুড়ি চিড়া জোগাড় কর” – এই টুসু গানে মত্ত ছোটোনাগপুর মালভূমির তামাম কুড়মী জনপদ। শুরু হয়েছে সেই ‘ছোটোমকরে’ টুসু পাতানোর মাধ্যমে। চলবে পোষ সংক্রান্তির টুসু ভাসান পর্যন্ত। এক সংক্রান্তি থেকে আরেক সংক্রান্তির এই যে যাত্রাপথ তার মাঝখানে প্রতি বছর ভূমিষ্ঠ হয় হাজার হাজার টুসু গান। যে গানের বেশির ভাগই দু:খ, দারিদ্র্য, প্রেম-পিরীতের রসে রঞ্জিত। সাম্প্রতিক কালে এই টুসু গান ভূমিপুত্রদের কাছে বঞ্চনা বিদ্রোহের হাতিয়ারও।

সোমবার ছিল বাঁউড়ি। জঙ্গলমহলের প্রতিটি গ্রামে এ দিন সকাল থেকে চলেছে মহিলাদের ব্যস্ততা। ভোর থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল ঢেঁকিতে গুঁড়ি তৈরির কাজ। শালবনীর অনিমা মাহাত, মমতা মাহাতরা বলেন, এখনকার দিনে অধিকাংশ গুঁড়ি মেশিনে তৈরি হলেও, পরব-পার্বণে ঢেঁকিতে গুঁড়ি তৈরির মজাটাই আলাদা। জঙ্গলমহলের সংস্কৃতিতে ঢেঁকি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে বলে লোকসংস্কৃতিবিদদের অভিমত। তাঁদের বক্তব্য, আনন্দ, উদ্দীপনার দিক থেকে টুসু উৎসব কোনো অংশেই দুর্গাপূজার থেকে কম যায় না। লালগড়ের বিশিষ্ট কুড়মী সমাজকর্মী প্রাণবল্লভ মাহাত বলেন, যে সময় শারদীয়া দুর্গাপূজা হয়, সে সময় সারা ছোটোনাগপুর মালভূমি এলাকা জুড়ে অভাবের মাস। ধান রোপনের পর অধিকাংশ আদিবাসী পরিবারে অর্থের সংকুলান হয়। তাই দুর্গাপূজার সময় জঙ্গলমহল সে ভাবে মেতে উঠতে পারে না। কিন্তু, পোষসংক্রান্তির এই টুসু মেলায় প্রতিটি বাড়ি ধানে ভরে ওঠে। তাই পরিবারের প্রত্যেকের শরীরে ওঠে নতুন কাপড়।

টুসু আসলে কী? কে ছিলেন? এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম জঙ্গলমহলের বেশ কিছু বিদগ্ধ মানুষের কাছে। টুসু উৎসব সম্পর্কে প্রচলিত নানা কিংবদন্তি এই উৎসবকে আরও মহিমান্বিত করেছে। টুসুকে কাশীপুরের রাজার কন্যা মনে করা হলেও এবং মকর সংক্রান্তির দিন মুসলমান নবাবের লালসার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নদীতে আত্মবিসর্জন এর কাহিনি প্রচলিত থাকলেও, জঙ্গলমহলের গবেষকরা কেউই এই কাহিনি মানতে চাননি।

busy artist
মূর্তি তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পী। নিজস্ব চিত্র।

প্রাক্তন অধ্যাপক ড: অনাদিনাথ কড়ইয়ার বলেছেন, টুসু হল সম্পূর্ণ ভাবে কৃষিভিত্তিক উৎসব। কার্তিক মাস থেকে যে ধানকাটা শুরু হয় শেষ হয় অগ্রহায়ণের সংক্রান্তিতে। অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তি যা জঙ্গলমহলে ‘ছোটোমকর’ নামে পরিচত।ওই দিন প্রতিটি কুড়মী পরিবারের কর্তা জমি থেকে ধানের শেষ আঁটিটিকে পুজো করে মাথায় করে নিয়ে এসে বাড়িতে স্থাপন করেন।এই অনুষ্ঠানটিকে বলা হয় ‘ডেনী মাঁই’ আনা। অনাদিবাবুর মতে, এই ‘ডেনী মাই’ হল টুসু। এই সময় প্রতিটি বাড়ি যে হেতু ফসলে টুসটুস করে ওঠে অর্থাৎ ভরে ওঠে, ওই জন্য এটা টুসু নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তি থেকে পোষমাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতি দিন টুসুকে পুজো করা হয় নৃত্যগীতের মাধ্যমে।

হাজারিবাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.বিনয় মাহাত টুসুকে শস্যের পুনর্জন্মের উৎসব বলে বর্ণনা করেছেন। বর্ষার শুরুতে মাটিতে পোঁতা বীজ থেকে নতুন শস্যের জন্ম হয়। সারা বছর চাষবাসের পর পোষমাসের শেষে সেই শস্য পূর্ণতা লাভ করে মকর সংক্রান্তিতে। টুসু উৎসব তাই আদিম মানুষের মৃত শস্যের পুনর্জীবন কামনার একটি জীবনধর্মী, সৃষ্টিধর্মী অভিনব লোকউৎসব। অনেক গবেষকের মতে, ‘তুষ’ শব্দ থেকে টুসু শব্দের উৎপত্তি। বিনয়বাবু তাঁর ‘লোকায়ত ঝাড়খণ্ড’ গ্রন্থে বলেছেন, এই তুষ মৃত ধানের প্রতীক। আর জলাশয়ে টুসু বিসর্জনের অর্থ হল মৃত শস্যকে কবর দেওয়া। তবু টুসু ভাসান শোকোৎসব নয়। বরং মৃতের অবশ্যম্ভাবী পুনর্জন্মকে ত্বরান্বিত করার জন্য আনন্দোৎসব।

আরও পড়ুন মকর উৎসবের মূল সুর ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’

টুসুর সঙ্গে মূর্তি পূজার কোনো সম্পর্ক নেই। তবু অঞ্চলভেদে বাঁকুড়া, মেদিনীপুরের কিছু এলাকায় মুর্তিপুজো হচ্ছে। টুসু উৎসব এর প্রাণকেন্দ্র পুরুলিয়াতে কোনো ধরনের মূর্তি করা হয় না। টুসুর বাহন রূপে ‘চোড়ল’ ব্যাবহার করা হয় নৃত্যগীতে। পুরুলিয়ার বিশিষ্ট গবেষক চারিয়ান মাহাতের মতে, টুসু উৎসবে সূর্যদেবতাকে পুজো করা হয়। কুড়মালী শব্দ ‘টুই’ এর অর্থ সর্বোচ্চ, আর ‘সু’ এর অর্থ সূর্য। এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হওয়ায় সূর্য সর্বোচ্চ স্থানে থাকে। সূর্য যে হেতু সকল শক্তির উৎস, তাই সূর্যদেবতাকে পূজো করা হয় টুসুর মাধ্যমে।

‘টুসু’ সম্পর্কে যা-ই মতবাদ প্রচলিত থাকুক, টুসু বৃহত্তর ছোটোনাগপুর মালভূমি এলাকার জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। টুসু কুড়মী জনজাতির প্রধান উৎসব হলেও, এই এলাকায় বসবাসকারী সমস্ত জাতিগোষ্ঠী এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। মকরসংক্রান্তিতে স্নানের পর ধনী, গরিব প্রত্যেকের শরীরে উঠবে নতুন পোশাক। ওই দিন পুরুষরা চলে যায় নিকটবর্তী ‘পরকুল’ মেলায়। মহিলারা নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে চলে যান টুসু বিসর্জনে। বাস্তবিকই টুসু হয়ে উঠেছে জঙ্গলমহলের প্রাণের উৎসব।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here