স্বামী সত্যদীপানন্দ:

যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণের মহামন্ত্র ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’, যুগাচার্য স্বামী বিবেকানন্দের মহাবাণী ‘দরিদ্রদেবো ভব, মূর্খদেবো ভব’; এই মহাভাবকে সর্বস্ব জীবন পণ করে যিনি প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন, যাঁর হাত ধরে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম দুর্ভিক্ষ-সেবাকার্য শুরু হয়েছিল তিনিই স্বামী অখণ্ডানন্দ।

স্বামী অখণ্ডানন্দ যখন মুর্শিদাবাদে গেলেন, তখন সেখানকার দুর্ভিক্ষের করাল মূর্তি তাঁর সন্ন্যাস জীবনে তীব্র আঘাত আনল। তিনি ভাবলেন, “ভগবানকে দয়াময় বলিতে কুণ্ঠাবোধ করিলাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কি পাপে যে অনাহারে দয়াময় ভগবানের রাজ্যে মারা যায়, তাহা আমার বোধগম্য হইল না। এমন দয়াময়ের রাজ্য ছাড়িয়া পালাইতে ইচ্ছা হইল।”

এ রকম ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে তিনি ভাবতা বাজারের একটা দোকানে রাত কাটালেন। পরের দিন সকালে হাতমুখ ধুয়ে যেই অন্যত্র যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন, অমনি যেন তিনি শুনতে পেলেন কে যেন তাঁকে বলছেন, “কোথায় যাবি? তোর এখানে ঢের কাজ আছে। গঙ্গার তীর, ব্রাহ্মণের গ্রাম, সুভিক্ষ স্থান – তোকে এখানে থাকতে হবে।” পর পর তিন বার তিনি এ রকম শুনতে পেলেন। তিনি ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু উঠতে পারলেন না। কে যেন তাঁকে কোমর ধরে বসিয়ে দিতে লাগলেন। তাঁর যাওয়ার চেষ্টা বন্ধ হল।

এর পর স্বামী অখণ্ডানন্দকে গ্রামের এক ব্রাহ্মণ মহুলায় তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে অন্নপূর্ণা পুজোয় নিমন্ত্রণ করলেন। অন্নপূর্ণা পুজোর শুভ সংবাদ পেয়ে তিনি ভাবলেন, এই ভীষণ অন্নকষ্টের দিনে নিরন্নের অন্নকষ্ট দূর করার জন্যই কি মা অন্নপূর্ণা তাঁকে এখানে রাখলেন?

যথোপচারে পূজা শেষ হওয়ার পর রাত্রে এক দল চাষি এসে নাচতে নাচতে ‘বোলান গান’ গাইল। সেই গানেও ভেসে এল দুর্ভিক্ষের করুণ সুর – “অন্ন ব্যাগোরে প্রাণ গেল, জল ব্যাগোরে প্রাণ গেল।” এ ভাবে বার বার দুর্ভিক্ষের ছায়া অখণ্ডানন্দের হৃদয়কে ব্যথিত করে তুলল। অখণ্ডানন্দ সুদৃঢ় সংকল্প নিয়ে দুর্ভিক্ষসেবায় আত্মনিয়োগ করলেন।

এ দিকে মাদ্রাজ থেকে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ চিঠি লিখে পাঠালেন, “তুমি কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসী, হাজার হাজার লোকের অন্নসংস্থান করা তোমার অসাধ্য। অতএব মঠে ফিরে যাও।” স্বামী প্রেমানন্দও আলমবাজার মঠ থেকে এই মর্মে দু’-তিনখানা চিঠি লিখে পাঠালেন। কিন্তু অখণ্ডানন্দ নিজ প্রতিজ্ঞায় স্থির রইলেন – “এখানে অযাচিতভাবে যাহা পাই, তাহাতে যদি একটি লোকেরও প্রাণ বাঁচাতে পারি, তাহলেও নিজেকে ধন্য মনে করব। তাছাড়া আমি ৬। ৭ দিন অনায়াসে উপোস করতে পারি। তাই এ দৃশ্য দেখে এস্থান হতে কাপুরুষের ন্যায় পৃষ্ঠপ্রদর্শন আমার দ্বারা অসম্ভব। মরে যাই তাও স্বীকার, তথাপি এর একটা বিহিত না করে যাব না।” স্বামী বিবেকানন্দও চিন্তিত ছিলেন অখণ্ডানন্দকে নিয়ে। কিন্তু পরে অখণ্ডানন্দের ধনুর্ভাঙা পণের কথা শুনে বাহবা দিয়ে লিখলেন – “সাবাস বাহাদুর! ওয়া গুরুজী কী ফতে!! কাজ করে যাও, যত টাকা লাগে আমি দেব।” স্বামীজির এই উৎসাহপূর্ণ চিঠি পেয়ে অখণ্ডানন্দের উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। তাঁর নতুন মনোবল সঞ্চারিত হলে তিনি স্থির করলেন, ‘মন্ত্রং বা সাধয়েয়ম্‌, শরীরং বা পাতয়েয়ম্‌’।  

এর পর সারগাছিতে আশ্রম স্থাপন করে শ্রীশ্রীঠাকুরের মন্দির প্রতিষ্ঠার সংকল্প করলেন অখণ্ডানন্দ। সেইমতো কাজও চলতে লাগল। তিনি মন্দির উদ্বোধনের দিন হিসাবে বিভিন্ন শুভতিথি দেখতে লাগলেন, কিন্তু সময়মতো কিছুতেই মন্দিরের কাজ শেষ করতে পারলেন না। শ্রীশ্রীমায়ের জন্মতিথি চলে গেল, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মতিথিও চলে গেল, তবুও তাঁর পক্ষে মন্দির উদ্বোধন করা সম্ভব হল না। এ বার তিনি ভাবলেন সামনেই শ্রীশ্রীঠাকুরের শুভজন্মতিথি, যে ভাবেই হোক তিনি এই শুভদিনে তাঁর হৃদয়দেবতাকে তাঁর নতুন মন্দির স্থাপন করবেন। কিন্তু এতেও তিনি সফল হলেন না, মন্দিরের কাজ যেন কিছুতেই শেষ হতে চায় না। অবশেষে দেখতে দেখতে অন্নপূর্ণাপুজোর ঠিক দু’দিন আগে আশ্চর্যজনক ভাবে মন্দিরের কাজ শেষ হল। অখণ্ডানন্দ মহুলায় এসেছিলেন এই অন্নপূর্ণাপুজোর দিনে, আবার তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনও দৈবক্রমে নির্দিষ্ট হল অন্নপূর্ণাপুজোর দিনেই। তাই এই দিনটাকে তিনি বিশেষ দিন হিসেবে মনে করতেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, “ঠাকুরের তিথিপুজোর দিনই মন্দির প্রতিষ্ঠার সংকল্প ছিল। তখনও মন্দিরের কাজ শেষ না হওয়ায় আমি সকাতরে ঠাকুরের শ্রীচরণে আমার মনে কথা জানাই। তারপর ঠাকুরই আমায় জানিয়ে দেন, এখানে ব্যষ্টিরূপে তিনি অন্নপূর্ণা। তাই, কী আশ্চর্য! শ্রীমন্দিরের সকল কাজ সেই অন্নপূর্ণা-পূজার পূর্বদিনেই শেষ হল। এ-দিনের নাম শুনলেই আমার রোমাঞ্চ হয়।” সর্বদেবদেবীস্বরূপ শ্রীরামকৃষ্ণ প্রকটরূপে স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছে দেবী অন্নপূর্ণা রূপে ধরা দিলেন।

মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন আশাতীত ভাবে ভক্তগণ আসতে লাগলেন। চার জন মহিলা বারো মাইল পথ পদব্রজে অতিক্রম করে আশ্রমে অনুষ্ঠান দেখতে এলেন। তাঁদের দেখে অখণ্ডানন্দজি আপ্লুত হয়ে বললেন, “মা অন্নপূর্ণা নিজেই মেয়েদের টেনে এনেছেন।” বেলা বাড়তে বাড়তে আশ্রমে জনস্রোত বয়ে গেল। ধন্য হল সারগাছি।

বিভিন্ন দেবদেবীর কথা প্রসঙ্গে অখণ্ডানন্দ বলতেন, “দেবীপুরাণে দেবীর মাহাত্ম্যই কীর্তন করা হয়েছে। তাতে আরও কোনো দেবতার মাহাত্ম্য নেই। তেমনই শিবপুরাণে শিবের, বিষ্ণুপুরাণে বিষ্ণুর। যে দেবদেবীরই পুজো কর না কেন, ঠাকুরকে সেই দেবদেবী বলে ভাববে এবং সেই দেবদেবীর যেরকম পূজার বিধি সেইভাবেই পূজা করবে।”

শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে অন্নপূর্ণা রূপে পুজোর উৎস এ ভাবেই। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমবিহারেও আশ্রম-আচার্য স্বামী সম্বুদ্ধানন্দ শারীরিক ও মানসিক অন্নদাতৃকাশক্তি অন্নপূর্ণাদেবীর কলিতে প্রকটরূপ অন্নপূর্ণা-শ্রীরামকৃষ্ণের সালঙ্কারা পট পূজা বিবেচনা করেছেন। এটা স্বামী অখণ্ডানন্দেরই পথগামী ভাবনা। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমবিহারের কলকাতা শাখায় উষা থেকে সারা দিন চলে সেবা, পাঠ ও পূজা। অন্ন-বিতরণ করে সম্পূর্ণ করার চেষ্টা চলে অন্নপূর্ণা পূজা। মহামিলন হয় ভক্ত ও ভগবানের। 

  

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here