payel samanta
পায়েল সামন্ত

সৈয়দ মুজতবা আলির ‘দেশে বিদেশে’ বুকে চেপে দেশ ছেড়েছি। মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল, আমার বন (জার্মানি) সফরে অন্তত কাবুল-কান্দাহারের মতো খাওয়াদাওয়ার কষ্ট হবে না। তার ওপর জার্মান ফুটবল আর দাড়িওয়ালা জার্মান কার্ল মার্কসের সঙ্গে বাঙালির সেই কত কালের কত কিসিমের সম্পর্ক। কিন্তু খাওয়া অন্তপ্রাণ যে গুটিকয় বাঙালি দেশে বিদেশে জাতির নাম উজ্জ্বল করছেন, আমি তাদের অশ্রদ্ধা না করেই বলছি, তাঁরা কেউ একটা ‘জার্মান দেশে বাঙালি কী খাইয়া বাঁচিবে’ সুলভ গাইডবুক লেখেননি। লিখলে আমি এ যাত্রায় সব চেয়ে বেশি উপকৃত হতাম।

বঙ্গদেশের মতো শাক-সবজি সুলভ দেশ এটা নয়। এ দেশে চাল পাওয়া যায়, আলু পাওয়া যায়। খিদে মেটানোর জন্য দু’টো ফুটিয়ে খাওয়ার বন্দোবস্ত করা যাবে। কিন্তু রোজ সেটা খাওয়া যায় কি? অফিসের ক্যান্টিনে দু’দিন ঢুঁ মেরে বুঝলাম দু’টো জিনিস। এক, ক্যান্টিনে খাওয়া পকেটের শ্রাদ্ধ। দুই, সবই জার্মান পপুলার খাবার। বঙ্গসন্তানের মুখোপযোগী কিছু নেই। এর মধ্যে শুধু একদিন সবজি সেদ্ধই খেয়েছি তাই। এখানে এসে নানা দুঃখে তাই নিরামিশাষীর ভেক ধারণ করেছি।

বন শহরে রেস্তোরাঁও আছে বিস্তর। চাইনিজ, জার্মান বা ইন্ডিয়ান সবই আছে। ম্যাকডোনাল্ড, সাবওয়ে টাইপের বহুজাতিকও আছে। এর মধ্যে একদিন ‘মুগল’ নামে একটি ভারতীয় কাম পাকিস্তানি রেস্তোরাঁতেও পা রেখেছি। জার্মানরা যে প্রাচ্যের খাবারদাবার ভালোবাসে, তা এ দোকানে ঢুকেই বুঝেছি। জার্মান নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে বিরিয়ানি, ফ্রায়েড রাইস, মুর্গ মুসল্লম খাচ্ছে জমিয়ে। আমরা যে ভাবে কলকাতায় আমিনিয়া বা আরসালানে ঢুকে গোগ্রাসে গিলি, ব্যাপারটা সে রকম নয়। কাচের প্লেটে চামচ দিয়ে ঠুংঠাং শব্দই এ খাওয়ার মূল আকর্ষণ। খাওয়া যতটা তার থেকে প্লেট চামচের আওয়াজ বেশি। সাহেবি কায়দা এমনই হয় নাকি! আমার বাংলাদেশি বন্ধুরা বিরিয়ানি খেয়ে জানাল, এর চেয়ে ঢের ভালো বিরিয়ানি ঢাকায় পাওয়া যায়। পনির টিক্কা, চিকেন চাপ, মাটন রোগান জোশ, বিরিয়ানি, শামি কাবাব, সবই ওই ১০ থেকে ১৩ ইউরো দাম। বাংলাদেশের এক সাংবাদিক বন্ধু তো বলেই ফেলল, “আসলে জার্মানদের য্যামন খুশি বিরিয়ানি খাওয়াইলেই হইল। ওরা তো আর আমাগো দ্যাশের স্বাদ বুঝবা না।” আমি ঘাড় নাড়ি। এখানে আমিও যদি ফুচকা, ভেজিটেবিল চপ বেচতে বসি, ভালোই মুনাফা করতে পারব। ‘তেঁতুলজলে টক দাও’ কিংবা ‘একটা ফাউ দাও’ বলে কোনো নাছোড়বান্দা খদ্দের পাব না, বাজি রেখে বলছি।

রেস্তোরাঁ মাসে হয়তো একদিন। বাকি দিনগুলো নিজেই রাঁধি। ভাত, ডাল, তরকারি রেঁধে সকাল আটটায় অফিস করাটা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল, পরিশেষে কেক পাঁউরুটিতেই নিবেদিত প্রাণ করে নিলাম।

এটা কেক-বিস্কুট-পাঁউরুটিরই দেশ। হাজার রকমের রুটি এখানে পাওয়া যায়। নানা আকারের এবং নানা স্বাদের। পাঁউরুটির ভেতর শসা, টমেটো, গাজর মেয়োনিজ আর লেটুস পাতা দিয়েই বড়ো বড়ো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি লাভ করে। আমিও সেই পথেই হাঁটলাম। ক’দিন সে পথে হেঁটে দেখলাম, উদরের জন্য এ পথ বড় বন্ধুর। খাইবার পাস পেরোনোর মতোই প্রায়। তাই ফিরে এলাম ফের ভাত-ডালের নিদানে— ‘রাধে গো, ব্রজসুন্দরী, পার করো, পার করো’।

এখানকার ইন্দো-আফগানি দোকান ‘মিনি এশিয়া’তে পটল থেকে পাকা আম বা মুড়ি-চানাচুর সবই পাওয়া যায়। তবে সবটাই বিচার হয় ইউরোর মূল্যতে। যে চানাচুরের প্যাকেট কলকাতার ফুটপাতে ২০ টাকায় কিনেছি, সেটাই এখানে কিনতে আমায় আড়াই ইউরো দিতে হয়। এই আফগানি ব্যবসায়ীরা আদতে দিল্লির বাসিন্দা, ওয়ান্স আপনে টাইম উহারা আফগানিস্তানে ছিলেন। কেন জানি না, কোনো অর্থে ওদের দেখে স্বদেশি মনে হয় না। কাজেই একটু দাম কমানোর সলজ্জ অনুরোধ করতেও সাহস পাই না। তাই আঙুরফল টক। ও পথে আর হাঁটি না। যে পটল আমার মা শত চেষ্টা করেও আমার পাতে দিতে পারত না, সেই পটল ইউরোতে কেনার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু, জার্মানির দূষণমুক্ত হাওয়া খেয়ে মন ভরলেও তা দিয়ে তো আর পেট ভরানো যায় না। ‘রেওয়ে’-এর মতো জার্মান ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে ঘোরাঘুরি করে দেখলাম, “হেথায় সুখ গেলে স্মৃতি একাকিনী বসে, হেথায় সুলভ নহে হাসি (সবজি)”। যে সবজি সুলভ, তার ব্যবহার জানি না। অ্যাসপারাগাস সবজিটা জার্মানদের প্রিয়। এই বসন্তের সময়টা এই সবজির সময়। দু’ রকম অ্যাসপারাগাস আছে দোকানে দোকানে — সাদা আর সবুজ। আমার জার্মান সহকর্মীদের মুখে এ বস্তুটির প্রচুর প্রশংসা শুনি। কিন্তু সাহস সঞ্চয় করে কিনে উঠতে পারিনি।

আমাদের অফিসের আশিসদা বড়ো মনের মানুষ। খাওয়াদাওয়া নিয়ে কঞ্জুসি করতে নিষেধ করেন। তাঁর কাছেই মাঝে মাঝে চোখের জল ফেলি। অভিযোগ জানাই, একটা মাঝারি সাইজের ফুলকপি কিনা তিন ইউরো! দুর্গাপুজোর সময় যখন অষ্টমীর ভোগে ফুলকপি মহার্ঘ, তখনও যে বাঙালি অত দাম দিয়ে ফুলকপি কেনে না! কিংবা ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ মাত্র দু’টো বেগুন কিনতে আমার দেড় ইউরো খরচ হল। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২০ টাকা। ও-দিক থেকে আমার মা-ও ফোনে বলে, “ভাবিস না, এখানেও বেগুন ৮০ টাকা কেজি। নিশ্চিন্তে খা।” কিন্তু মা, ৮০ টাকা তো কেজিতে। দু’টো বেগুনে নয়!

যদি সস্তার কথাই বলতে হয়, এখানে সানফ্লাওয়ার ওয়েল মানে সূর্যমুখীর তেল সস্তা। মুরগির ডিম কিংবা ভালো বিস্কুটেরও দামটা আয়ত্তে। আশিসদা বলেন, “তা হলে আর কি, তেল খেয়েই কাটান এখানে।” সোজা সলিউশন তিনিই দিলেন — ওপেন মার্কেট। এখানে চাষিরা খেত থেকে সরাসরি এসে সবজি বেচে। কাজেই টাগের্ট রইল সস্তার সবজির অভিযান। অফিস টপকে একদিন এখানে হাজির হয়েও দেখেছি, দু’টো ব্রকোলি আড়াই ইউরো!

ডাল-ভাত-তরকারিতে পুষ্ট শীর্ণকায় যে বঙ্গসন্তান হাওড়ার পাইকারি মাছের মার্কেটের সন্ধান জানে কিংবা বৈঠকখানা রোড, কোলে মার্কেটে বাজার করার সুখ চেনে, তার কাছে ওপেন মার্কটের মাহাত্ম্য অন্য। মাছের কানকো দেখে বাজার করার সুখ জার্মানরা জানে না। টিনজাত টুনা মাছ বা নানা রকম মাংস (পর্ক, ল্যাম্ব) তারা কেনে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘আলদি’ বা ‘রেওয়ে’ থেকে।

উফফ্, আর না! এ সব ভাবলেই যে বড্ড মনে পড়ে যাচ্ছে, জ্যান্ত চারাপোনা কিংবা টাটকা মৌরলা না আনলে এক কালে ভাতই খেতাম না আমি। মা গো, আবার কবে কলকাতায় গিয়ে দু’মুঠো ঝোল ভাত খাব?

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here