hadia haeia rice beer
Samir mahat
সমীর মাহাত

ঝাড়গ্রাম:”হাঁড়িয়া” পান আদিজনজাতির সংস্কৃতি, ‘নেশা’ হওয়ার টানে তা অনেকেই পান করে। লোকসঙ্গীতের কথায় উঠে এসেছে, “হাঁড়িয়া খাঁয়ে মাতাল হব”। আদৌ কি তা মাতাল হওয়ার জিনিস! লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে আদিজনজাতির বিশিষ্টজন বলছেন, হাঁড়িয়া পান প্রথা প্রাচীন আদিজনজাতির সংস্কৃতি । খেটে খাওয়া শ্রেণি গ্রীষ্মকালে শরীর ঠান্ডা ও ক্লান্তি দূর করতে নিজেদের তৈরি এই পানীয় নিয়ে থাকে। আদিজনজাতির বেশ কয়েকটি সম্প্রদায় বিবাহ অনুষ্ঠান, সংস্কৃতির নানা পরবে অতিথি আপ্যায়নের মূল পানীয় হিসেবে একমাত্র হাঁড়িয়াকেই ব্যবহার করে।

এই পানীয় তৈরির উপাদান ও নিয়ম হল, ভাতের ফেনা ভাতেই শুকিয়ে, রান্না করা ভাত পাতার উপর মেলে একেবারে ঠান্ডা করা হয়। সেই ভাতে মাখানো হয় “বাখর”। বাখর হল, জঙ্গলের ভেষজ গাছের মূল-শিকড় ও ছাল মিশ্রিত চালের গুঁড়ির ছোটো লাড্ডু বিশেষ। শুকনো বাখর মিহি করে ভাতের পরিমাণ মতো মিশিয়ে দেওয়া হয়। যেমন তিন সের চালের ভাতে তিন থেকে চার গন্ডা বাখর। মাটির হাঁড়ির ভেতর বাহির ভালভাবে পুড়িয়ে বাখর মিশ্রিত ভাত রেখে মুখ পাতা দিয়ে বেঁধে তিন-চার দিন রাখা হয়। পরিপাক হয়ে গেলে সেই ভাত জাল দিয় ঘষে গাঢ় দুধের মতো হাঁড়িয়া তৈরি হয়।

তবে এ ভাবে তৈরির ক্ষেত্রে আদিজনজাতির মহিলারাই বিশেষজ্ঞ। বিশদ তাঁরাই জানেন। সম্প্রতি কালে গোটা জঙ্গলমহল এলাকায় এর প্রচুর চাহিদা হওয়ায় বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে এই হাঁড়িয়া। এলাকার রাস্তার বড়গাছের তলায় আদিজনজাতির মহিলারা হাঁড়িয়া বিক্রি করেন। এক বাটি (এক লিটার) হাঁড়িয়ার মূল্য পাঁচ টাকা। ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ওডিশার ক্ষেত্রে এই মূল্যের তারতম্য রয়েছে। বিক্রেতাদের কাছে জানা গেল, জকপুরে হাঁড়িয়া তৈরির বৃহত্তর ভাটি (কারখানা) রয়েছে। এই সময় ঘরে তৈরি হাঁড়িয়ায় জোগান দেওয়া মুশকিল। সেখানে পাইকারি দামে হাঁড়িয়ার ভাত পাওয়া যায়। হাঁড়িয়া বানিয়ে বিক্রি করলে যথেষ্ট লাভ হয়।গ্রীষ্মকালেই এর চাহিদা।

সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ বিমল মাহাত বলেন, আগে চাষের কাজে বিনা পারিশ্রমিকে দলবদ্ধভাবে সহযোগিতা করার “বেগার” প্রথা ছিল। তাঁদের আপ্যায়ন হিসাবে হাঁড়িয়া দেওয়া হতো। মাটি কাটার লোকেরা দুপুরে হাঁড়িয়া আহারই সঙ্গে নিতেন। সৌভাগ্য যে নেশার যুগে এই আদিজনজাতিরা বিলিতি মদের থেকে সরে নিজস্ব পানীয়র সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। এর ক্রিয়া হল, প্রকট রোদেও পরিশ্রম করা যায়, ঘুম ভাল হয়। অনিয়ম বা মাত্রাতিরিক্ত খেলে নেশার বসে ঘুমে চোখ জুড়ে যায়। এখন অনেকে একে “রাইসবিয়ার” বলে থাকেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here