ভারতের মহিলা ক্রিকেটকে নতুন দিশা দিয়ে গেলেন হরমনপ্রীত কৌর

0
568

ওয়েবডেস্ক: ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, আইপিএলের ধাঁচে অস্ট্রেলিয়ায় মহিলা বিগ ব্যাশ লিগে সিডনি সিক্সার্স দলের হয়ে প্রথম ম্যাচে নেমেছেন হরমনপ্রীত কৌর। মারকুটে ব্যাটস্‌উয়োম্যান হিসেবে প্রথম ম্যাচেই নাম কামিয়ে নিয়েছেন তিনি।

সেই ইনিংসের উনিশতম ওভারের শেষ বলে এক বাঁ-হাতি বোলারের করা গুডলেংথ বলকে নিজের হাঁটুতে বসে এক্সট্রা কভারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দিলেন তিনি। এমন শট দেখে ধারাভাষ্য দেওয়া অ্যাডাম গিলক্রিস্ট মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বলেন, “ক্রিকেটের অন্যতম ভালো শটগুলোর মধ্যে পড়ে এটি।” তবে গিলক্রিস্টের প্রশংসাই নয়, আরও একটা জিনিস নজর কেড়েছিল। সেটা হল ছক্কা খেয়ে বোলারের অট্টহাসি। আসলে মুগ্ধতা মাখা ওই হাসির মধ্যে দিয়েই হরমনের শটের তারিফ করছিলেন তিনি।

এর পরে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, কলম্বোয় বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জনকারী টুর্নামেন্টের ফাইনাল। দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি ভারত। টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য শেষ দু’ বলে আট রান দরকার ভারতের। স্ট্রাইকে রয়েছেন হরমন। ওভারের পঞ্চম বলেই বিশাল ছক্কা মারলেন তিনি এবং শেষ বলে দু’রান নিয়ে ভারতকে টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন করেন হরমন। এই ইনিংসটার পরেই ভারতের সেরা মারকুটে মহিলা ক্রিকেটারের তকমা পান হরমন।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, অস্ট্রেলিয়ার সেই ইনিংস হোক বা দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ইনিংসটি, ম্যাচের সরসরি সম্প্রচার করা হলেও, খুব বেশি ক্রিকেটপ্রেমী সেগুলি দেখেননি। তবে ক্রিকেটপ্রেমীদেরও বেশি দোষ দেওয়া যায় না। এই ম্যাচগুলি নিয়ে বেশি আগ্রহ তো কোনো সংবাদমাধ্যমও দেখায়নি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ডার্বির মাঠে ব্যাট হাতে যখন হরমন নামলেন, তখন অবশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্রিকেটপ্রেমী টিভির সামনে বসেছেন। মাঠেও ভারতের নামে জয়ধ্বনি দেওয়ার জন্য হাজির মানুষ। সেমিফাইনাল খেলছে ভারত, জিতলে ফাইনাল, তাই নিজেকে সারা বিশ্বের কাছে চেনানোর জন্য সব থেকে ভালো সুযোগ তাঁর কাছে।

দু’ ঘণ্টা ২৩ মিনিট পর তিনি যখন মাঠ ছাড়লেন, তখন গোটা মাঠ, সেই সঙ্গে টিভির সামনে থাকা ক্রিকেটপ্রেমীরা তাঁকে কুর্নিশ জানাতে কোনো কার্পণ্য করেনি। এই ইনিংসের পর ভারতই যে ফাইনালে যাবে সেটা পাকাই হয়ে গিয়েছিল।

ম্যাচ শেষে হরমনকে কুর্নিশ জানিয়ে অজি অধিনায়ক মেগ ল্যানিং বলে দেন, “আমরা ওকে থামানোর অনেক চেষ্টা করেও পারিনি।”

যদি তাঁর সেমিফাইনালের ইনিংসের দিকে নজর দেওয়া যায়, তা হলে দেখা যাবে দারুণ ভাবে ইনিংসটা সাজিয়েছিলেন তিনি। স্মৃতি মানধানা এবং পুনম রাউতকে হারিয়ে প্রথম দশ ওভারে ৩৫-২ হয়ে গিয়েছিল ভারত। তখন ইনিংসটাকে ধরা দরকার ছিল। প্রথম ৭২ রান করতে হরমন নিয়েছিলেন ৭৭ বল। কিন্তু তার পরে যা হল সেটা তাণ্ডব। মাত্র ৩৮ বলে শেষ ৯৯ রান করলেন তিনি।

প্রত্যেক হবু ক্রিকেটার ক্রিকেটের এক একটা অবিস্মরণীয় মুহূর্তকে ধরে রাখেন যা তাঁদের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে বাড়িয়ে তোলে। ১৯৮৩-তে কপিলের সেই ১৭৫-এর ইনিংস দেখেই ক্রিকেটার হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন সচিন। শারজায় সচিনের সেই ডেজার্ট স্টর্মের ইনিংস দেখে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ধোনিও। ভবিষ্যতে এমন কোনো ক্রিকেটার ভারত পাবে যে বলবে ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালে ধোনির ইনিংসটা দেখেই তিনি ক্রিকেটার হয়েছেন।

ঠিক একই ধারা বজায় থাকবে মহিলা ক্রিকেটেও। আজ থেকে বেশ কয়েক বছর পর কোনো এক বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন কোনো মহিলা ক্রিকেটার ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন তখন তিনি বলবেন হরমনপ্রীতের সেই ইনিংসটা দেখেই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল তাঁর।

হরমনের ইনিংসটা ভারতকে শুধু বিশ্বকাপের ফাইনালেই তুলল না, এটা বুঝিয়ে দিল ক্রিকেট এখন আর শুধু বিরাট কোহলি, মহেন্দ্র ধোনিতেই সীমাবদ্ধ নেই। মিতালি রাজ, হরমনপ্রীত কৌররাও এখন ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের নয়নের মণি হয়ে উঠেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here