ডাঃ প্রদীপকুমার মাইতি

ক্যানসার কী?

প্রাণীদেহে বৃদ্ধি (গ্রোথ) একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বৃদ্ধি হয় বলেই একটি কোশ থেকে ভ্রূণ তৈরি হয়, ভ্রূণ বড়ো হয়ে হয় শিশু, আবার শিশু বাড়তে বাড়তে প্রাপ্তবয়স্ক ও পূর্ণাঙ্গ দেহ লাভ করে। কিন্তু বাড়তে বাড়তে সে দৈত্যাকৃতি হয় না। তার পাঁচটা আঙুল, অন্য মানুষের পাঁচ আঙুলের মতো অর্থাৎ আমাদের প্রত্যাশা মতোই বাড়ে। দু’টো হাত – একটা বড়ো, একটা ছোটো হয় না। মানুষের হাত-পা মানুষের মতো, হাতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হাতির মতোই হয়। অর্থাৎ এই বৃদ্ধি একটা নিয়ম মেনে চলে, একটা নিয়ন্ত্রণ আছে। আবার এই বৃদ্ধি এক সময় থামতেও জানে।

ক্যানসারও এক প্রকার বৃদ্ধি। কিন্তু সে থামতে জানে না। সে বল্গাহীন। চালক (নিয়ন্ত্রক) হীন গাড়ি যে রকম পথ-ঘাটের তোয়াক্কা না করে যে কোনো দিকে দৌড়োতে থাকে, পাশাপাশি গাড়ি-ঘোড়া-বাড়ি-পথচলতি মানুষকে ধাক্কা মারে, এ-ও তেমনি প্রথমে যে অঙ্গে শুরু হয় সেই অঙ্গের কাজ নষ্ট করে, পরে শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যান্য অঙ্গের ভিতর ঢুকে পড়ে ওই অঙ্গগুলির কাজকর্মও ব্যাহত করে। নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি থামাতে না পারলে যেমন চরম দুর্ঘটনা ঘটে, তেমনই চিকিৎসা করে ক্যানসার নির্মূল করতে না পারলে সে-ও মানুষের চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আর যত শুরুর অবস্থায় তাকে থামানো যাবে, বিপর্যয় তত কম ঘটবে। অর্থাৎ অসুখ শুরুর অবস্থাতেই তাকে নির্ণয় (ডায়াগনোসিস) এবং চিকিৎসা (ট্রিটমেন্ট) করা দরকার।

যদিও শুরুতে চিকিৎসা করলে ভালো হয় বলছি, প্রকৃত পক্ষে ক্যানসারের শুরুতেই তাকে ধরা এক কথায় অসম্ভব। ক্যানসার শুরু হয় মাত্র কয়েকটি ‘ক্লোনাল সেল’ (clonal cell) থেকে। সেই কোশগুলি – এক থেকে দুই, দুই থেকে চার – এই পদ্ধতিতে বাড়তে বাড়তে যখন 10 9  সংখ্যক = 10,000,000,00 সংখ্যক কোষ হয়, তখন টিউমারটি মোটামুটি মাত্র ১ সেমি আয়তনের হয়, আমরা হয়তো তখন প্রথম বুঝতে পারি, তা-ও যদি তা আমাদের শরীরের একেবারে উপরের স্তরে হয়। যদিও শরীরের ভেতরে হলে, তা আর দু-চার গুণ না বাড়লে আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। দূষিত অসুখ তার দূষিত কোষগুলিকে আমাদের অজ্ঞাতসারেই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গগুলিতে চালান করে দিতে থাকে। এখন এই টিউমারটি ৪ বা ৮ সেমি-র হলে আমরা ভাবি রোগটি শুরুতেই ধরা পড়ল। আসলে তা শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে।

যাই হোক, ধরা পড়ার পর আসে চিকিৎসার কথা। আমাদের দেশে মূলত কয়েক প্রকার চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু আছে। অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা ইত্যাদি। অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির প্রতি সম্মান দেখিয়েই বলব, এই মুহূর্তে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য অ্যালোপ্যাথি-র শরণ নেওয়াই ঠিক। অন্যান্য পদ্ধতিগুলিতে পরীক্ষামূলক কাজ চলতেই পারে, কিন্তু পশ্চিমি চিকিৎসা (অ্যালোপ্যাথি) ক্যানসার চিকিৎসায় এখনই বেশ কিছুটা পরিণত হয়ে গিয়েছে। যদিও এই রোগকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে সে-ও এখনও অক্ষম। অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির রোগ নিরাময় ক্ষমতা নিয়ে নানাবিধ মত আছে।

অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার আবার কিছু ভাগ আছে – শল্য চিকিৎসা, রে চিকিৎসা, ঔষধ চিকিৎসা, হরমোন চিকিৎসা, অ্যান্টিবডি চিকিৎসা।

শল্য চিকিৎসা (সার্জারি)

ক্যানসারে শল্য চিকিৎসা বড়ো ভূমিকা পালন করে। রোগ বিশেষত প্রথম অবস্থায় থাকলে, তাকে আমূল উৎপাটন করে। যদি অসুখটি ইতিমধ্যেই অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে থাকে তবে এতেই চিকিৎসা সম্পূর্ণও হতে পারে। অর্থাৎ অপারেশনের পর কোনো সহযোগী চিকিৎসা অনেক সময় যোগ করতে হয় না। শল্য চিকিৎসা প্রধান চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার হয় স্তন, মস্তিষ্ক, জরায়ু, পাকস্থলী, বৃহদন্ত্র. মলাশয়. পিত্তথলি, চোখের ক্যানসার এবং হাত-পায়ের সারকোমা (সারকোমা) ইত্যাদিতে।       

রেডিওথেরাপি (তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরণ চিকিৎসা)

তেজস্ক্রিয় বস্তু থেকে সর্বদা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তিন প্রকার রশ্মি বিকিরিত হয় – আলফা, বিটা এবং এবং গামা রশ্মি। আলফা রশ্মি বেশি দূর যেতে পারে না। চিকিৎসাশাস্ত্রে এর ব্যবহার নেই। থাইরয়েড ক্যানসারের চিকিৎসায় এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে বিটা রশ্মির ব্যবহার হয়। তবে ক্যানসারের চিকিৎসায় মূলত ব্যবহৃত হয় গামা রশ্মি এবং এক্স-রে (হাই এনার্জি)।

গামা রশ্মি ব্যবহার করা হয় প্রধানত ‘কোবাল্ট ৬০’ নামে একটি আইসোটোপ থেকে। আর হাই এনার্জি এক্স রে (উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এক্স রে) ব্যবহার করা হয় ‘লিনিয়ার অ্যাক্সেলেটর’ নামক যন্ত্র থেকে। এই যন্ত্রটি ‘কোবাল্ট ৬০’-এর তুলনায় আধুনিক, দামও অনেক বেশি, সুবিধাও। তবে সাধারণ ভাবে ‘কোবাল্ট ৬০’ দিয়েই যথেষ্ট উন্নত মানের চিকিৎসা করা সম্ভব। এই যে চিকিৎসার কথা বলা হল, এক কথায় এর নাম টেলিথেরাপি। মানুষের শরীর থেকে বেশির ভাগ সময় ৮০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার দূর থেকে রশ্মি নির্গত হয়ে শরীরের ওপর পতিত হয়।

অন্য আর এক ধরনের চিকিৎসা আছে, যাকে বলে Brachy TherapyBrachy অর্থ নিকট। এই পদ্ধতিতে আইসোটোপ অর্থাৎ রশ্মির উৎপাদককে অসুস্থ কোষগুলির একেবারে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং ওই রশ্মি অসুস্থ কোষগুলিকে মেরে ফেলে, কিন্তু বেশি দূর যায় না, অর্থাৎ চার পাশের সুস্থ কোষগুলিকে আঘাত করে না। ঘটনা হল টেলিথেরাপিতে অসুস্থ কোষের চিকিৎসার পাশাপাশি সুস্থ কোষের ওপরেও রশ্মি পড়ে এবং সুস্থ কোষকে আঘাত করে। Brachy Therapy-তে পার্শ্ববর্তী কোষগুলির কম ক্ষতিসাধন হয়। তবে বাস্তবত ক্যানসারের চিকিৎসায় দু’ ধরনের পদ্ধতিই দরকার।

ইলেকট্রন দিয়েও (উৎস ‘লিনিয়ার অ্যাক্সেলেটর’) ক্যানসারের চিকিৎসা করা হয়। রেডিওথেরাপি কখনও প্রধান চিকিৎসা, কখনও সহযোগী চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

রেডিওথেরাপি; প্রধান চিকিৎসা: শল্য চিকিৎসায় অসুস্থ অঙ্গ/অংশটিকে কেটে বাদ দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপি কোনো অঙ্গ কেটে ফেলে না, অঙ্গটিকে অক্ষত রেখে অসুস্থ কোষগুলিকে নষ্ট করে। বস্তুত অনেক অংশই কেটে ফেলা সম্ভব নয়, তাতে মানুষের শরীরের প্রকৃতি নষ্ট হয়, জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম করা দুরূহ হয়ে পড়ে। যেমন, গলা মুখের সার্জারিতে ভয়ঙ্কর মুখবিকৃতি হয়, শব্দ করা যায় না, অনেক সময় উচ্চারণ করাও যায় না, শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্যেও আলাদা নল লাগাতে হয়। মুত্রথলির (ইউরিনারি ব্লাডার) এবং মলাশয় (রেকটাম)-এর ক্যানসারে অনেক সময়ই প্রস্রাব ও পায়খানার জন্য ভিন্ন পথ তৈরি করতে হয়। এর ফলে রোগীদের সমাজে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটা চলার অসুবিধে হয়। গলা ও মুখ এবং জরায়ু মুখের ক্যানসারে তাই বেশির ভাগ সময় রেডিওথেরাপির মাধ্যমেই চিকিৎসা করা হয়। এবং তার কার্যক্ষমতা শল্য চিকিৎসার পাশাপাশি সমমানের, এমনকি কখনও উন্নত মানেরও। তা ছাড়া রেডিওথেরাপিতে শরীরের অঙ্গের যে হেতু বিকৃতি হয় না, তাই অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

রেডিওথেরাপি; সহযোগী চিকিৎসা: অনেক সময় সার্জারিতে ক্যানসার আক্রান্ত অঙ্গটিকে কেটে ফেলার পরেও পাশাপাশি অনেকটা অঞ্চল জুড়ে অল্প স্বল্প অসুস্থ কোষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। তাদের খালি চোখে দেখা যায় না। তা ছাড়া এতখানি অঞ্চল কেটে ফেললে শরীরের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। অথচ কোনো চিকিৎসা না করলে, কয়েক মাসের মধ্যে ওই অসুস্থ কোষগুলো বাড়তে বাড়তে বৃহদায়তন ধারণ করবে এবং নীরবে শরীরের দূরতম স্থানেও ছড়িয়ে পড়বে। একে বলে মেটাস্টাসিস। ফুসফুস (লাং), যকৃৎ (লিভার), মস্তিস্ক (ব্রেন), হাড় (বোন) হল মেটাস্টাসিসের উল্লেখযোগ্য জায়গা। আর বলা যায়, এগুলো শরীরের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই বাংলার সেই প্রবাদ –‘শত্রুর শেষ রাখতে নেই’- সেই দর্শন মাথায় রেখেই সার্জারির পর অনেক ক্ষেত্রেই পাশাপাশি অঞ্চলটিতে রে দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, যাতে আর অঙ্গহানি না ঘটিয়ে অসুখটাকে নির্মূল করা যায়। স্তন, বৃহদন্ত্র, প্রোস্টেট, মূত্রথলি বা জরায়ু ক্যানসারে সার্জারির পর সহযোগী চিকিৎসা হিসেবে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। (চলবে)

(লেখক বিভাগীয় প্রধান, রেডিওথেরাপি, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here