ডাঃ প্রদীপকুমার মাইতি:

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

কেমোথেরাপি:

এর অর্থ হল ওষুধ দিয়ে ক্যানসারের চিকিৎসা করা। আমরা আগেই আলোচনা করেছি, ক্যানসার যদি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় সীমিত থাকে, তখন তাকে অপারেশন করে এবং রে দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। তবে অনেক সময় দেখা যায়, অসুখটি তার শুরুর জায়গায় বসে নেই, ইতিমধ্যে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সব সময় হয়তো সেই ছড়িয়ে পড়াটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু আশঙ্কা করছি। এ সব ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ওষুধ দেওয়া হয়। কেমোথেরাপি ওষুধ অসুখটির মতোই, শরীরের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দূরতম অসুস্থ কোষগুলোকে মেরে ফেলে। এখানেও অঙ্গহানি হয় না।

কখনও আবার হয়তো অসুখটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েনি, কিন্তু সীমিত স্থানেই অনেকটা জায়গা জুড়ে বসে আছে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় অপারেশন এবং রেডিওথেরাপির মাধ্যমে অসুখের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয় না। কেমোথেরাপিও যোগ করা হয় মুল চিকিৎসার সঙ্গে।

কেমোথেরাপির ব্যবহার:

প্রধান চিকিৎসা (প্রাইমারি কেমোথেরাপি) লিউকিমিয়া, লিম্ফোমা

সহযোগী চিকিৎসা (অ্যাডজুভ্যান্ট কেমোথেরাপি) অপারেশন বা রেডিওথেরাপির পর যোগ করা হয়। যেমন স্তন ক্যানসার, মলাশয়/বৃহদন্ত্র ক্যানসার, কোরীয় কার্সিনোমা, জার্ম সেল টিউমার ইত্যাদি।

প্রাক সহযোগী চিকিৎসা (নিও অ্যাডজুভ্যান্ট কেমোথেরাপি) — মূল চিকিৎসার আগে সহযোগী চিকিৎসা – গলা ও মুখের ক্যানসার, স্তন ক্যানসার এবং মলাশয়/ বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের আডভ্যান্সড স্টেজ-এ ব্যবহার করা হয়।

কেমো-রেডিয়েশন: কখনও কখনও রে চিকিৎসার পাশাপাশি একই সঙ্গে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়, এখানে কেমোথেরাপি রে চিকিৎসার কাজটাকে জোরদার করে।

অনাকাঙ্ক্ষিত বিষক্রিয়া/পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (টক্সিসিটি/সাইড এফেক্টস):

একটা দেশের সরকারকে যেমন রক্ষা করে তার প্রশাসন বিভাগ-পুলিশ-মিলিটারি, তেমনি আবার রক্ষাকর্তারা তাদের উচ্ছৃঙ্খলতা, অসাধুতা দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুঃসহ করে তোলে। একই রকম ভাবে ওষুধের ক্রিয়ার সাথে সাথেই আসে তার বিষক্রিয়া বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গ।

কিছু কিছু বিশেষ প্রতিক্রিয়া অনেক অসুখেই হয় – যেমন বমি অথবা বমি ভাব, বোনম্যারো ডিপ্রেশন [রক্তে হিমোগ্লোবিন, শ্বেত কণিকা (হোয়াইট ব্লাড সেল), অনুচক্রিকা (প্লেটলেট) কমে যাওয়া, গলা ও মুখে ঘা হওয়া ইত্যাদি]।

আবার কিছু কিছু পার্শ্ প্রতিক্রিয়া বিশেষ ওষুধের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেমন,

Cyclophosphamide/ Ifasfamideমূত্রথলির প্রদাহ

5 Fluro Uracilঅতিরিক্ত পায়খানা

Methotrexateমুখ ও শরীরের ভেতরের চামড়া (মিউকাস মেমব্রেন) উঠে ঘা হয়, রক্ত কণিকা কমে যায়।

Adriamycinহার্ট-এর পক্ষে ক্ষতিকর।

Vincristine, Paclitaxel, Docetaxel–  নার্ভ-এর পক্ষে টক্সিক

Gemcitabineরক্ত কমিয়ে দেয়। যকৃতের পক্ষেও ক্ষতিকারক।

Cisplatinকিডনি এবং স্নায়ুর ক্ষতি করে, বমি হয়। (বেশির ভাগ সময় এই সব প্রতিক্রিয়াগুলো চিকিৎসা শেষে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।)

কেমোথেরাপির সময় তার বিষক্রিয়া/পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রাখতে হয়। প্রতিরোধের জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বমিবন্ধ করার জন্য এবং অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন প্রতিরোধের জন্য দেওয়া হয়। যেমন Dexamethasone, Ondansentron, Antihistamine, Ranitidine এই সমস্ত ইনজেকশন।

Ifosfamide/High dose Cyclophosfamideএর পাশাপাশি Mesna ইনজেকশন,

Adriamycinএর পাশাপাশি Dexrazoxane বলে আর একটি ওষুধ দেওয়া যায়। তবে Adriamycin ওষুধটি সারা জীবনে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম না করলে ওই প্রতিরোধী ওষুধের দরকার হয় না।

Methotrexateএর জন্য Leucovorin ইনজেকশন।

কেমোথেরাপি দেওয়ার সময় লক্ষ রাখা দরকার, ওষুধ যাতে কোনো মতেই vein-এর বাইরে চামড়ার তলায় চলে না যায়। এ রকম হলে ওই অঞ্চলের চামড়া একেবারে উঠেই যেতে পারে।

এ বার বলি, কেমোথেরাপি সাধারণত intravenous ছাড়া Intramuscular injectionও হয়। মুখে খাওয়ার কেমোথেরাপি ওষুধও আছে।

টার্গেটেড থেরাপি:

আমরা দেখলাম, কেমোথেরাপি যেমন ক্যানসার কোষের ওপর কাজ করে, তেমনই স্বাভাবিক সুস্থ কোষের ওপরেও তার ক্ষতিকারক প্রভাব থাকে। সেই জন্যই নানা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

টার্গেটেড থেরাপি এক নবতম চিকিৎসা, যা বিশেষ ভাবে শুধু মাত্র ক্যানসার কোষগুলোর ওপরেই কাজ করে। সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে না। ফলত, ওই ওষুধগুলোর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কেমোথেরাপি অপেক্ষা বেশি কার্যকর। ক্যানসার কোষের পর্দা বা ভেতরে কিছু বিশেষ অ্যান্টিজেন থাকে। ওই বিশেষ অ্যান্টিজেনই ক্যানসার কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনে সাহায্য করে। বা ক্যানসার কোষের স্বাভাবিক মৃত্যুতে (Apoptosis) বাধা দেয়। ফলে ক্যানসারটি কেবল বাড়তেই থাকে। টার্গেটেড থেরাপি এক প্রকার অ্যান্টিবডি যা ওই অ্যান্টিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে প্রতিহত করে। ফলে ক্যানসার আর বাড়তে পারে না। এই টার্গেটেড থেরাপি আবার দু’ ধরনের:

মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (Monoclonal  Antibody)ক্যানসার কোষের পর্দায় যে অ্যান্টিজেন থাকে, তার ওপর কাজ করে

স্মল মলেকিউল অ্যান্টিবডি (Small Molecule Antibody)কোষের অভ্যন্তরে অবস্থিত অ্যান্টিজেনের ওপর কাজ করে।

কয়েকটি উদাহরণ:

Monoclonal  Antibody        অসুখের নাম

Cetuximab–             ফুসফুসের ক্যানসার বিশেষ

Trastuzumab–     স্তন ক্যানসার

Rituximab–             লিম্ফোমা

Bevacizumab–          ব্রিহদন্ত্র, ফুসফুস, গলা ও মুখের ক্যানসার

 

Small Molecule Antibody       অসুখের নাম

Gefitinib–                  ফুসফুসের ক্যানসার

Lapatinib–                   স্তন ক্যানসার

Imatinib–                    ক্রনিক মাইলয়েড লিউকিমিয়া ও GIST

Desatinib–                   ক্রনিক মাইলয়েড লিউকিমিয়া

Sunitinib/ Sorafenib –      কিডনি ক্যানসার

 

বিশেষ ভাবে উল্লেখ প্রয়োজন, ফুসফুস, রক্ত, স্তন বা বৃহদন্ত্র, যে কোনো ক্যানসারে এই টার্গেটেড অ্যান্টিবডি কিন্তু কাজ করবে না। ওই বিশেষ অ্যান্টিজেন যদি ক্যানসারটিতে থাকে, তবেই ওই অ্যান্টিবডি তাকে প্রতিহত করে অসুখটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

আর একটা কথা, Small Molecule Antibody অর্থাৎ যেগুলো nib দিয়ে শেষ, সেগুলো ইনজেকশন নয়, মুখে খেতে হয়। সুতরাং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝামেলাটাও এড়ানো যায়।

আরও পড়ুন: ক্যানসার ও চিকিৎসা- দু’চার কথা / ১

হরমোন থেরাপি:

শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কিছু ক্যানসার হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাইরে থেকে হরমোন দিয়ে ওই হরমোনের চিকিৎসা করা হয়। যেমন স্তন ক্যানসার। প্রথমে পরীক্ষা করে দেখা হয় ওই ক্যানসার হরমোনে সাড়া দেবে কি না। ক্যানসার কোষ থেকে Estrogen Progesterone Receptor Detection করা হয়। যদি তা positive হয়, তবে Antioestrogen  দেওয়া হয়।

Prostate ক্যানসার- মূলত সহযোগী চিকিৎসা হিসেবে হরমোন চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেমন

১) Orchietomyঅণ্ডকোষ দু’টি কেটে দিলেই তার থেকে 5 Hydroxy Testosterone তৈরি বন্ধ হয়।

২) LH-RHঅনেক রোগী অণ্ডকোষ কেটে দেওয়া মেনে নিতে পারেন না। তাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত চিকিৎসা LH-RH Injection। মাসে এক বার থেকে তিন মাসে এক বার দেওয়া হয়। এই ওষুধটির দাম কয়েক হাজার টাকা।

৩) Anti Androgenপ্রয়োজনে উপরোক্ত চিকিৎসার সঙ্গেই Flutamide / Bicalutamide যোগ করা হয়।

Uterine Cancer: Medroxy Progesterone Acetate দিয়ে চিকিৎসা

Thyroid Cancer:   সার্জারি ও রেডিওথেরাপির পর শরীরের প্রয়োজনীয় hormone thyroxine এর অভাব পড়ে। তখন TSH নামে একপ্রকার হরমোন মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। এই হরমোন আবার থাইরয়েড ক্যানসারকে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই বাইরে থেকে থাইরক্সিন জাতীয় হরমোন দেওয়া দরকার, যা অতিরিক্ত TSH নিঃসরণে বাধা দেয়।

চিকিৎসায় প্রতি দিন পরিবর্তন ঘটছে। পুরোনো ধারণা বদলে নতুন ধারণা আসছে। চিকিৎসাপদ্ধতিরও তাই পরিবর্তন ঘটছে। সাধারণের অবগতির জন্য সামান্য কথায় কিছু সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলাম। প্রয়োজনে পরে আরও বিস্তৃত আলোচনা করা যেতে পারে। (শেষ)

(বিভাগীয় প্রধান, রেডিওথেরাপি, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ)

1 মন্তব্য

  1. ক্যানসার ও চিকিৎসা- দু’চার কথা লেখা গুলো কিলিক করলেই প্রথম থেকেই আশা উচিত।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন