Aedes Aegypti
এডিস ঈজিপ্টি। ছবি সৌজন্যে এনবিসি মিউজ।
dr. dipankar ghosh
দীপঙ্কর ঘোষ

এডিস ঈজিপ্টি প্রজাতির মশা এবং এই প্রজাতির মহিলা মশারাই ডেঙ্গু রোগের বাহক ও ধারক। ঈজিপ্ট বললে কেমন যেন মিশরের কথা মনে হয়, তাই না? হ‍্যাঁ । এই মশার উৎস মিশরদেশ। তাই এ রকম নামকরণ।

বহু সহস্র বছর আগে আগে মানে মরুভূমি হ‌ওয়ার আগে সেখানে ছিল এক বিরাট জঙ্গল। সেই বনে থাকত এই প্রজাতির মশা (সিলভ্যাটিক)। পরে প্রকৃতি পরিবর্তনের কারণে একদিন, সম্ভবত দাবানলে সমগ্র বনভূমি পুড়ে তৈরি হয় বিশাল মরুভূমি। এই প্রজাতির মশারা তখন বুঝতে পারে যে এই অসম্ভব গরমে মরুভূমির ভেতরে তারা বাঁচতে পারবে না। তখন তারা গৃহবাসী হয়ে ওঠে। এরা মূলত পশুরক্তপায়ী (জুফিলিক)। গর্ভবতী স্ত্রী মশাদের ডিমের পুষ্টির জন্য নররক্তের প্রয়োজন হয়। তারা মরুভূমিতে শিকারের খোঁজে উড়ে গিয়ে বুঝল যে এই ধুধু আগুনগরম মরুভূমিতে ভরা দুপুরে বেশি দূর গিয়ে খাবার জোগাড় করা সম্ভব নয়। ক্রমশ ওদের উড়ানের দৌড় কমে পাঁচশো মিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। ওরা গৃহবাসী হয়ে উঠল। গরমের জন্য সূর্যোদয়ের আধ ঘণ্টার মধ্যে আর সূর্যাস্তের আধ ঘণ্টা আগে এরা রক্ত পান করতে বেরোয়। এটাই ওদের আক্রমণের মূল সময়। এরা ঘরের ভেতরেই জমা জলে ডিম পাড়ে।

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: প্রস্টেট গ্ল‍্যান্ড ও তার অসুখ

এই মশা নার্ভাস বাইটার অর্থাৎ সামান্য নড়াচড়া অনুভব করলেই অন‍্য শিকার খোঁজে। তাই একটি জীবাণু বহনকারী মশার থেকে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়। এক‌ই কারণে এরা সাধারণত পায়ের নীচে অথবা হাত থেকে বহু দূরে কামড়ায়। এদের ডিমের মধ্যেও ডেঙ্গুর জীবাণু দিব‍্য বেঁচে থাকে। ডিম ফুটে ছানাপোনা জন্মাতে প্রায় দশ দিন সময় লাগে এবং ছানাপোনারা বেরোলে তারাও রোগের জীবাণু বহন করে। তাই একজন ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ালে সাধারণত আশেপাশের বাড়িতেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে

সুতরাং কী ভাবে এই রোগের হাত থেকে বাঁচা যাবে?

একটাই পথ – জমা জল সরাতে হবে, জলাধার পাত্র ধ্বংস করতে হবে। কী ভাবে?

ভেঙে ফেলতে হবে পরিত্যক্ত মাটির পাত্র, ডাবের খোল;  উলটে দিন ব্যবহার না-করা ফেলে রাখা পাত্র, যাতে তাতে জল জমতে না পারে;  নষ্ট করে ফেলুন ফেলে দেওয়া খালি থার্মোকল/প্লাস্টিকের পাত্র; ফুটো করে দিন ফেলে রাখা টায়ার,  যাতে জমা জল বেরিয়ে যায়;  চৌবাচ্চা, ড্রাম, ফ্রিজ, এসি, কুলারের তলা, ফুলদানি, টব – এ সবের  জল ফেলে পরিষ্কার করুন; ওভারহেড ট্যাঙ্ক  ঢেকে রাখুন;  বন্ধ নর্দমা পরিষ্কার করে তাতে তেল ছড়িয়ে দিন;  সেচখালের  আগাছা পরিষ্কার করুন; ফেলে রাখা পাতকুয়ায় সাত দিন অন্তর তেল ছড়িয়ে দিন।

এডিস ঈজিপ্টির ক্ষেত্রে ডিম ফুটে মশা হতে দশ দিন সময় লাগে। তাই প্রতি সাত দিনে এক বার ঘরের মধ্যে জমা জল পরিষ্কার করতে হবে বা জলের ওপর তেল ছড়িয়ে দিতে হবে। অবশ্যই অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে শুতে হবে। ঘুমকাতুরে মানুষজনকে দিনের বেলাতেও মশারি টাঙাতেই হবে।

আরও পড়ুন স্বাস্থ্য সাবধান: কখন প্রয়োজন হবে মানসিক চিকিৎসক?

এই রোগ হলে প্লেটলেট বা অন‍্যান‍্য রক্তকণিকা তো সংখ‍্যায় ভীষণভাবে কমে যায়। কিন্তু মৃত্যুর কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্লেটলেট কমে যাওয়াটা নয়। মৃত্যুর কারণ হল শিরা-ধমনি থেকে জল চুঁইয়ে (লিক করা) বেরিয়ে যাওয়া – যার ফলে শরীরে ভয়াবহ জলশূন্যতা ঘটে এবং ক্রমশ সমস্ত অঙ্গপ্রত‍্যঙ্গ অকেজো হয়ে যায়। তাই প্রচুর জল খাইয়ে এবং প্রয়োজনে ‘শিরায়’ নানা রকম জল (ফ্লুইড) দিয়ে ও নানা জীবনদায়ী প্রয়াসে রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। প্রত‍্যেক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা আলাদা হতে পারে। কখনও ডায়ালিসিস‌ও প্রয়োজন হতে পারে।

(লেখক একজন সাধারণ চিকিৎসক)

ঋণ স্বীকার: সমুদ্র সেনগুপ্ত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন