স্বাস্থ্য সাবধান: স্তন ক্যানসার, কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর

0

দীপঙ্কর ঘোষ

সে দিন হেমন্তের মায়ালু কমলা চাঁদ পূর্ব দিগন্ত ছাড়িয়ে পুকুরপাড়ের ছাদের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। রোগীহীন বৃদ্ধ ডাক্তার টেবিলে মাথা রেখে নিদ্রামগ্ন। ওঁর সুন্দরী পিসিমা কাম রিশেপনিস্ট কানে ইয়ারফোন গুঁজে মোবাইলে কিছু দেখতে দেখতে আনমনে খিলখিলিয়ে হাসছেন। এমন সময় একটি ভীত সন্ত্রস্ত দম্পতি ডাক্তারের খুপরিতে প্রবেশ করল। ডাক্তার ঘুমভাঙা আলসেমির চোখ তুলে ঢুলু ঢুলু চোখে তাকালেন। ইতস্তত এলোমেলো নিম্ন আয়ের ভারী মিষ্টি একজোড়া স্বামী-স্ত্রী নতমুখে এসে ঢুকল।

“বসুন”, দু’ জনেই জড়োসড়ো হয়ে বসল। মেয়েটি ডাক্তারের কন্যাসমা।

“কী হয়েছে রে মা?”

“আমার বুকে একটা গোটা…” মেয়েটির চোখ বেয়ে অশ্রুবিন্দু।

ওর বর হাল ধরে – “ডাক্তারবাবু ওর ডান দিকের বুকে সে দিন একটা শক্ত গোটা মতন কী যেন ঠেকল। তো আমরা লোকালে দেখিয়ে একটা ছবি করিয়েছি, ডাক্তার বলল ভয়ের কিছু নেই, ফাইব্রোঅ্যাডিনোসিস নাকি যেন।”

মেয়েটি কাজল ধ‍্যাবড়ানো চোখ তুলে তাকায় – তখনও সে দু’টি চোখ জলেভেজা – “আমার বড়ো ভয় করছে…গরিব মানুষ একটা ছোট্ট মুদিদোকান।”

বুড়ো ডাক্তার ওঁর সুন্দরী রিশেপনিস্টকে ডাক দেন, “ও পিসিমা, নিয়ে আয় মা তিন কাপ চা।”

পিসিমা অশ্রুমুখী কিশোরী বধূটিকে দেখে চা আনতে চলে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়, “হুঁ! এর মধ্যেই চার কাপ হয়ে গেছে কিন্তু।”

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান: প্রস্টেট ক্যানসার – কাঁধে ব্যথা এবং এক ভয়বিহ্বল রোগী

যা-ই হোক, চোখের জলে নোনতা করে কিশোরী বধূটি চা পান করল। ডাক্তার আবার ডাক দিলেন, “পিসিমা, ওপিসিমা, এক বার ই দিকে আয় তো।” পিসিমা এসে দাঁড়াল। ডাক্তার কিশোরীর পরীক্ষা সম্পূর্ণ করলেন। “নেমে আয় মা, আমার সামনে বোস। আজ তোদের ক’টা কথা বলি।”

নতমুখে কিশোরী বধূটি চেয়ারে গিয়ে বসে। ডাক্তার গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করেন, “ভালো করে মন দিয়ে শোন–ও ভালো মানুষের ছেলে তুমিও শোনো। প্রথমটা ভালো লাগবে না, তবুও মন দিয়ে শুনতে হবে। ব্রেস্ট বা স্তন নারী, পুরুষ নির্বিশেষেই থাকে। নারীদের যে হেতু সন্তান ধারণ করতে হয় এবং শিশুর জন্মের পর প্রথম ছ’ মাস শিশুকে কেবলমাত্র মায়ের দুধ খেয়ে বাঁচতে হয় – হ‍্যাঁ, কেবলমাত্র মায়ের দুধ– তাই মেয়েদের স্তনগ্রন্থী পুরুষদের থেকে বড়ো হয়। আর নারীদের স্তনে যা যা রোগ হ‌ওয়া সম্ভব সব‌ই পুরুষেরও হতে পারে। তবে সম্ভাবনা অনেকখানি কম। এ বারে বলি স্তনের গঠন নিয়ে। স্তন মূলত দুধ তৈরির জন্যে তৈরি। অর্থাৎ এই অংশটি প্রচুর গ্ল‍্যান্ড দিয়ে তৈরি।আর এই গ্ল‍্যান্ড বা গ্রন্থীগুলো যদি টাইট করে বেঁধে না রাখা হয় তা হলে তো ওগুলো এ-দিক ও-দিক সরে যাবে। তাই ওদেরকে ফাইবার দিয়ে টাইট করে বেঁধে রাখা হয়।”

কিশোরী বধূ আর তার বর হাঁ করে শুনছে।

ডাক্তার হাসেন, “বড্ড উলটোপালটা বলছি না-রে?” কিশোর বরটি বলে, “না গো, তুমি বল, ভালো লাগছে।”

ডাক্তার ঠান্ডা চায়ে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলেন, “কথা আর বেশি নেইকো –এ বার এই গ্ল‍্যান্ড আর শক্ত ফাইবারের মধ্যে দিয়ে কতগুলো দুধ নিয়ে যাওয়ার পাইপ এসে বাচ্চাকে খাওয়ানোর মতো একটা ব‍্যবস্থা তৈরি করে। এ বার স্তনে সাধারণত কম বয়সে যেটা হয় সেটা হচ্ছে ওই ফাইবার আর গ্ল‍্যান্ড একটু বেড়ে শক্ত চাকার মতো হয়ে যায় – সেটাকে বলে ফাইব্রোঅ্যাডিনোসিস। এটা নির্দোষ নিরীহ ধরনের ব‍্যাপার। এটাকে ঠিক অসুখ বলা যায় না –মানে যেটা এই মেয়েটার হয়েছে।”

বর, বউ দু’জনেই ভারী খুশি হয়ে পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসে। তবু বউটি বলে, “এটা না হয় ভয়ের কিছু নয়, কিন্তু আমি সাবধান কখন হব?”

ডাক্তার চোখ গোল গোল করে বলেন, “প্রতি মাসে পরীক্ষা করতে হবে –কেননা রোগ কবে আসবে সেটা তো নোটিশ দিয়ে আসবে না – তাই না?”

নতুন বরটার মুখ দেখে মনে হয়, ভাবছে এত ঝামেলা জানলে বিয়েই করত না। কাঁচুমাচু হয়ে বলে, “মানে প্রতি মাসে…গরিব মানুষ…তা হলে এত…।” একটুখানি খাবি খেয়ে কেবল বলতে পারে, “ওরে বাবা।”

ডাক্তার নির্বাক তাকিয়ে থাকেন। অল্পবয়সি বউটি ইতস্তত করে প্রশ্ন করে, “কী কী পরীক্ষা?”

ডাক্তার হাসেন, “সহজ ব‍্যাপার রে মা, বাড়িতেই করা যাবে। তবে শোন –

(১) মাসে এক বার পরীক্ষা করে দেখতে হবে দু’ পাশের দু’টো বৃন্ত এক‌ই লাইনে আছে কিনা অর্থাৎ উঁচুনিচু হয়ে গেছে কিনা;

(২) কোনো বৃন্ত হঠাৎ করে বিকৃত হয়েছে কিনা, বা কুঁচকে ভেতরে ঢুকে গেছে কিনা, বা কোনো রসজাতীয় কিছু বেরোচ্ছে কিনা;

(৩) হাতের তালু দিয়ে দেখা বুকের ভেতরে কোনো শক্ত ঢ‍্যালার মতো কিছু হয়ে আছে কিনা;

৪) যদি সেই ঢ‍্যালার মতন জিনিসটা না নড়ানো যায় অর্থাৎ কিনা শক্ত হয়ে আটকে থাকে তা হলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার দেখাতে হবে।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান: ডাক্তার আর এক মাঝবয়সি রোগিণীর ‘মিষ্টি’ গল্প

তবে যে মাসে এইগুলোর যে কোনো একটা পাওয়া যাবে তক্ষুনি বাড়ির ডাক্তার বা সার্জন, যে কারো সঙ্গে দেখা করা উচিত। আর একটা কথা। ডাক্তারবাবুর মতামতে বা এই ধরনের পরীক্ষার ফলাফলে মোটামুটি ভাবে রোগটা খারাপ কিনা সেটা বোঝা যায়। সুতরাং অহেতুক আতঙ্কিত হ‌ওয়ার কোনো কারণ নেই।”

বর, বউ দু’ জনেই বেজায় খুশি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। ডাক্তার আবার ঘুমের তোড়জোড় করছিলেন। পিসিমা তাড়া দিলেন, “উঠুন স্যার, এ বার বাড়ি যান। অনেক রাত হয়েছে।”

(লেখক চিকিৎসক)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.