pregnancy

ডাঃ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়

কী ভাবে যে সময়টা পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারল না অনিন্দিতা। সৌম্যর চাকরি, নিজের চাকরি। মাঝে বিদেশ যাওয়ার প্রলোভন। বিয়ের প্রথম দশ বছর কেরিয়ারের পিছনে দৌড়ে এখন কোলটা কেমন যেন ফাঁকা লাগে। বর্তমানে অনিন্দিতা ৪২। মনে প্রশ্ন জাগছে বেশি বয়সে মা হওয়াটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

সাধারণত ৩৫ পেরিয়ে প্রথম বার মা হতে গেলে গর্ভ নষ্ট হয়ে যাওয়ার একটা ঝুঁকি থেকেই যায়। এ ছাড়াও আরও কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ঘাবড়ে যাওয়ার মতন মোটেই কিছু নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রি-প্রেগনেন্সি কাউন্সেলিং করিয়ে নেওয়া উচিত কেননা আগে থেকে হবু মায়ের অসুবিধা জানা গেলে চিকিৎসার সাহায্যে তা ঠিক করে নিয়ে তার পর সন্তান ধারণ করলে এড়িয়ে যাওয়া যায় অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা।

প্রশ্ন জাগতে পারে বেশি বয়সে মা হতে গেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে

প্রথম সমস্যা মা হওয়া। অর্থাৎ বেশি বয়সে অনেক সময়ে চেষ্টা করেও সন্তানধারণে সমস্যা আসতে পারে। এ ছাড়া হাই ব্লাডপ্রেসার ও সুগারের একটা ঝুঁকি থেকে যায়। এ ছাড়াও গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হবার সম্ভাবনা থাকে। এ সব ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে হবু মা ও শিশুর জীবনহানির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সমস্যার কথা তো বোঝা গেল। সমাধান কী?

সন্তানধারণের পরিকল্পনার শুরুতেই ডাক্তার দেখিয়ে নিতে হবে। থাইরয়েড সহ কোনও হরমোনের গোলোযোগ, ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক, ফাইব্রয়েড বা অন্য কোনও সমস্যা দেখলে শুরুতেই সঠিক চিকিৎসার সাহায্যে তা সারিয়ে নিয়ে তবেই গর্ভধারণ করা উচিত। সন্তান গর্ভে আসার পরে নিয়মিত চেকআপ আর মনিটরিং করাতে হবে। ৩৫ বছরের পরে গর্ভধারণ করলে অনেক সময়ে শিশুর হৃৎপিণ্ডের ত্রুটি ও ক্রোমোজোম ঘটিত সমস্যা ডাউনস সিনড্রোম দেখা যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় তিন মাসে মায়ের কয়েকটি বিশেষ রক্ত পরীক্ষা এবং ভ্রূণের বিশেষ আলট্রাসাউন্ড করিয়ে রোগ নির্ণয় করা হয়। টেস্ট পজিটিভ হলে অ্যামিনওসেটেসিস পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে গর্ভপাত করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

অনেক সময় দেখা যায় বয়স বেশি নয় কিন্তু জটিলতা আছে, কী করবেন?

এই ধরনের ক্ষেত্রেও হাইরিস্ক প্রেগনেন্সি বলা হয়। ডায়াবেটিস, হাই ব্লাডপ্রেসার, জন্মগত হার্টের অসুখ, ক্রনিক কিডনির অসুখ, এপিলেপসি বা অন্যান্য সমস্যা থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে।

হাই রিস্ক প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে কী ধরনের চিকিৎসা করা হয়

সমস্যা অনুসারে চিকিৎসা করা হয়। হাই প্রেসার বা হাই সুগার কনট্রোল না করলে গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রূণের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমে এদের চিকিৎসা করা হয়। ইদানীং মেটারন্যাল মেডিসিনের আধুনিকতম প্রয়োগে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় মায়েদের সুস্থ সন্তান প্রসবে সাহায্য করা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে বার বার মিসক্যারেজ হতে দেখা যায়

এদের ক্ষেত্রে গর্ভ নষ্ট হওয়ার কারণ খুঁজে  বের করা হয়। কম বয়সে বার বার গর্ভপাত সাধারণত যে কারণে ঘটতে পারে তা হল স্বামী বা স্ত্রীর ক্রোমোজমের কোনো ত্রুটি থাকলে ভ্রূণ অসময়ে বেরিয়ে যায়। আবার প্রতি ১০০ জন মহিলার মধ্যে ১৫ জনের অ্যান্টিফসফোসিপিড অ্যান্টিবডির মতো অস্বাভাবিক উপাদান থাকে, এর ফলেও মিসক্যারেজ হয়। সঠিক চিকিৎসার সাহায্য না নিলে এদের সুস্থ সন্তানের জন্ম দেওয়া মুশকিল। অনেকের আবার জরায়ু মুখের দুর্বলতা থাকে, ফলে বারবার গর্ভপাত হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে সারভিক্সে সেলাই করা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা হয়। মিসক্যারেজের ক্ষেত্রে রক্তের সমস্যাও দায়ী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওষুধের সাহায্যেই সমস্যা দূর করা সম্ভব। মোটের উপর একটা কথা মনে করবেন সমস্যা অহেতুক জটিল করবেন না। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই আপনার জীবন সুখময় করে তুলবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন