স্বাস্থ্য সাবধান: প্রস্টেট ক্যানসার – কাঁধে ব্যথা এবং এক ভয়বিহ্বল রোগী

0

দীপঙ্কর ঘোষ

ফাঁকা চেম্বার। আমাদের ডাক্তারবাবু যথারীতি চেম্বারলীন হয়ে সান্ধ‍্যনিদ্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বয়স হয়েছে তো, সন্ধ্যায় বড়ো ঘুম পায়। রিশেপনিস্ট সুন্দরী কানে হেডফোন গুঁজে মৃদুমন্দ হাসিমুখে নখে রং মাখছেন। এমন সময় ডাক্তারের খুপরিতে এক বিলিতি কেতাদুরস্ত বৃদ্ধ এসে ঢুকলেন। শুভসন্ধ‍্যা কুশলাদি বিনিময়ের পর ডাক্তার যথাবিহিত সম্মানপুরঃসর প্রশ্ন করলেন, “কী ঘটনা ভাই?”

ভাই ডাকটা ভাইয়ের পছন্দ হয়নি। উনি বললেন, “গুডিভ্নিং আমি মিস্ঠ‍্যা বি এস মালিক।”

ডাক্তার ঈষৎ বিব্রত হয়ে শুধোলেন, “পুরো নাম?”

এ বার বিলেতফেরত মানুষটি বললেন, “ভবেন্দ্রসুন্দর মল্লিক।”

“বয়স?” “অ্যাঁ?” “বলি বয়স কত হল?” “সেভেন্টিসিক্স।”

ডাক্তার লিখলেন ছিয়াত্তর।

“কী অসুবিধে?”

“আই হ‍্যাভ ভীষণ কাঁধে ব‍্যথা। ”ভবেন্দ্রসুন্দর বাঁ কাঁধে ডান হাত ঠেকান – “এভ্রিবডি ইজ টেলিং ফ্রোজেন শোলডার কিন্তু ঘুমোতে পারি না – সারা রাত কাতরাই।”

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য সাবধান: ডাক্তার আর এক মাঝবয়সি রোগিণীর ‘মিষ্টি’ গল্প

ডাক্তার হাঁক পাড়েন, “পিসিমা, ও পিসিমা, আরেক পেয়ালা চা হবে?” (সবাই জানেন কোনো অজ্ঞাত কারণে আমাদের বৃদ্ধ ডাক্তার ওই রূপবতী রিশেপনিস্টকে পিসিমা এবং ওর বরকে পিসিবাবা বলে ডাকেন।)

পিসিমা নখরঞ্জনী রেখে ব‍্যাজার মুখে উঁকি দ‍্যান, “না একটু আগেই চা খেয়েছেন, আর হবে না।” ভবেন্দ্রসুন্দরবাবু ব‍্যাপারস‍্যাপার দেখে একটু ভ‍্যাবাচ‍্যাকা খেয়ে যান।

ডাক্তার টাক চুলকে বলেন, “আর কিছু অসুবিধে আছে? অন্য কোনো রোগ-ব‍্যাধি?”

“শুগার আছে, স্পেশালিস্ট দ‍্যাখাই – কিডনি আছে, স্পেশালিস্ট দেখাই – হার্ট আছে স্পেশালিস্ট দেখাই – প্রস্টেট আছে, স্পেশালিস্ট দেখাই।”

ডাক্তারের চোখ জ্বলজ্বল করে। বাধা দিয়ে বলেন, “বটে? প্রস্টেট‌ও আছে? কে দেখেন?”

ভবেন্দ্রসুন্দর অবজ্ঞাসূচক ঘোঁৎ করেন, “ল‍্যান্ড‍্যানের স্পেশালিস্ট।”

ডাক্তার যৎপরোনাস্তি অবাক, “ল‍্যান্ড‍্যানের? সেটা কী রকম?” ওঁর গলা দিয়ে বিস্ময় গড়িয়ে পড়ে।

“ও শ‍্যূওর (ডাক্তার চটবেন কিনা বুঝতে পারেন না)। আমি ল‍্যান্ড‍্যান মানে লন্ডন থেকে ফেরার সময় ওষুধের ডোজ ঠিক করে এনেছি…।”

“সেটা কত বছর আগে?” “ধরুন না, ফাইভ ইয়ার্স।”

বুড়ো ডাক্তার শূন্য চায়ের পেয়ালায় করুণ দৃষ্টি হেনে বলেন, “পিএস‌এ কত?”

“পিএস‌এ? সেটা কী?”

“প্রস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন… ওটা প্রস্টেটের রক্তপরীক্ষা।”

“শুনুন মশয়, আমার প্রস্টেট একদম ঠিক আছে – নো প্রোব্লেম -ওক্কে? কেবল কাঁধে অসহ্য ব‍্যথা। দু’ বার এক্সরে করেছি। শুগার ওক্কে। আপনি শুধু ব‍্যথাটা…।” ভদ্রলোক ঝুঁকে পড়ে যন্ত্রণায় মুখ বেঁকান – “উফ মাঝে মাঝে ভেতরটা পুরো ঝিলিক মেরে ওঠে।”

“কত জনকে দেখিয়েছেন?” “তিন-চার জনকে। এক্সরে ঠিক ছিল। মাগো বড্ড ব‍্যথা…”। ভদ্রলোক যন্ত্রণায় বেঁকে যান, “ব‍্যথার ওষুধেও কাজ হচ্ছে না।”

“হুমমমমমমম! চিতপাত হয়ে যান।” “অ্যাঁ?” “উঠে শুয়ে পড়ুন।”

বুড়ো ডাক্তার ঠুকে ঠাকে টিপে টুপে ভবেন্দ্রবাবুকে পরীক্ষা করেন। 

“উঠে আসুন ভবেন্দ্রবাবু।”

ভবেন্দ্রবাবু উঠে এসে বসেন।

“কিস‍্যু পেলাম না… সব তো ওপর থেকে ঠিকই আছে।”

“সবাই তো তা-ই বলছে।”

ডাক্তার চশমাটা খোলেন। গোলগোল চোখে ভবেন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাঁক পাড়লেন, “পিসিমা…।” তার পরে বললেন, “ও বাবা! আর তো চা দেবে না বলেছে।”  

খানিকটা সময় টেবিলে টরেটক্কা বাজালেন, তার পর বললেন,

“ও ভবেনবাবু, আপনি কি জানতে চান আপনার কী হয়েছে?”

ভবেন্দ্রবাবু তো রীতিমতো রুষ্ট – “নিশ্চয়ই চাই।”

“তা হলে একটা ভাগ্যপরীক্ষা করা যাক, কী বলেন?”

রোগী রাগে গনগনে এবং চুপ। আমাদের বুড়ো খসখস করে একটা রক্তপরীক্ষা লিখে খচাং করে ব‍্যবস্থাপত্রটা (প্রেসক্রিপশন) ছিঁড়ে ওঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন।

“এই পরীক্ষাটা চটপট করিয়ে আনুন দেখি।”

ভবেনবাবু গজগজ করতে করতে চলে গেলেন।

“আবার সেই পিএস‌এ টেস্ট  করাতে হবে। যত সব কচুপোড়ার কমিশনখোর ডাক্তার। এদের জন‍্যেই…।” আরও কিছু বলতে বলতে রোগী অপসৃত হন। এ সব কথা আজকাল ডাক্তারের সয়ে গিয়েছে, তাই আড়মোড়া ভেঙে আবার উনি নিদ্রাকর্ষণে মগ্ন হয়ে পড়েন।

পরের সন্ধ‍্যাকালে ডাক্তারের ঝরঝরে পুরোনো স্কুটারের পাশে একটা বিরাট লম্বা বিদেশি গাড়ি এসে দাঁড়াল। সেই বিলেতফেরত বাবুটি সমস্ত আদবকায়দা ভুলে সুন্দরী পিসিমার কুটিল ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে দরজা টরজা ঠেলে হাঁফাতে হাঁফাতে সোজা বুড়ো ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে পড়লেন।

ডাক্তার তখন আপন খেয়ালে নিজের টাকে হাত বোলাচ্ছিলেন। করজোড়ে ভবেন্দ্রসুন্দরকে আপ‍্যায়ন করলেন। ভবেন্দ্রবাবুর ও সব দিকে নজর নেই – “দেখুন পিএস‌এ… এ তো মশয় ভয়ংকর বেশি দেখাচ্ছে…১২৯…ও গড!”

ডাক্তার চশমাটা পরে দেখলেন, “হুঁ, বড্ড বেশি। আমি মানে…যা-ই হোক, ভবাবাবু চিন্তার কিছু নেই, ঠিক হয়ে যাবে।”

ভবেন্দ্রবাবু ফিশফিশ করে বললেন, “এটা কীসের টেস্ট?”

ডাক্তার অন‍্যমনে বললেন, “কর্কট মানে ক‍্যানসারের পরীক্ষা। এটাকে ক‍্যানসার মার্কার বলতে পারেন।”

“ক‍্যাহ‍্যানসাআর?”

ভবেন্দ্রবাবুর গলাটা হাহাকারের মতো শোনায়। ডাক্তার নীরবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানান।

“যে হেতু প্রস্টেট ক‍্যানসার হাড়ের ভেতরে ছড়ায় তাই আমার মনে হয়েছিল… হয়তো এটা…।”

“আমি তো ওষুধ ঠিকমতোই খেয়েছি। তা হলে…ডাক্তার এটা কী বোঝাচ্ছে? প্রস্টেট জিনিসটা কী? ওষুধে ভালো থাকে না? আমি কি আবার অন্য জায়গা থেকে আরেকটা টেস্ট করাব?”

এক ঝাঁক প্রশ্ন করে ভবেনবাবু ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

ডাক্তার কিঞ্চিৎ দিশেহারা। ঘাবড়ে গেলেই চা পান করা ওঁর বদভ্যাস। ডাক্তার গত কালের কথা ভোলেননি, তাই অতীব সুমিষ্ট স্বরে ডাক পাড়েন, “পিসিমা তুই একটুসখানি দু’ কাপ চা এনে দিবি?”

পিসিমা নাক কুঁচকে টেবিল থেকে আরশোলা পড়া চায়ের গেলাসটা তুলে নিয়ে চা আনতে চলে যায়।

“পিসিমার চা আনার ফাঁকেই আমরা আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে থাকি?”

ঘর্মাক্ত ভবেন্দ্রবাবু ভুল করে টেবিলের ওপর রাখা ডাক্তারের রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে ফ‍্যাঁচ করে নাকটাও ঝেড়ে নিয়ে রুমালটা ফেরত দেন।

“দেখুন মশয়, সহজ ভাষায় বলতে গেলে আমাদের মূত্রথলি থেকে মূত্রনালি বেরোনোর সময় নালিটার চার পাশ ঘিরে একটা গ্ল‍্যান্ড থাকে – এটার নাম প্রস্টেট। বয়সের সঙ্গে প্রায় সকল পুরুষেরই এটা বড়ো হয়। আর প্রতি আটত্রিশ জন প্রস্টেট বড়ো হ‌ওয়া রোগীর একজনের ক্ষেত্রে এটা ক‍্যানসারে পরিণত হয়…(ভবেন্দ্রসুন্দর চোখ কপালে তোলেন)। না এখান থেকে হর্মোন টর্মোন কিচ্ছু বেরোয় না – যৌনমিলনের সময় কিছু রস, কিছু এনজাইম লবণ টবন…।”

ভবেন্দ্রসুন্দর অধৈর্য হয়ে পড়েন, বাধা দিয়ে বলেন, “আহা, এ সব কথা বাদ দিয়ে বলুন ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও আমার কেন এ রকম রোগ হল?”

এমন সময় পিসিমা দু’ কাপ চা নিয়ে দিয়ে গেল। ডাক্তার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “আসলে এ সব ওষুধে তো ক‍্যানসার প্রতিরোধ করে না। কেবলমাত্র আপনার কষ্ট লাঘব করে। পেচ্ছাপটা যাতে সহজে হয় সেটুকুই দেখে। তাই ওষুধ খাওয়া মানেই ক‍্যানসার হবে না, এই ইয়েটা পুরোপুরি ভুল।”

ভবেন্দ্রবাবু খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন। বোধহয় ধাক্কাটা বড্ড জোরালো হয়ে গিয়েছে। বেচারা লন্ডনের ওষুধ খেয়েও এ সব হবে তা ভাবেননি। আসলে চিকিৎসাপদ্ধতি তো সব জায়গাতেই মোটামুটি এক। হয়তো কোথাও শল‍্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতি বেশি আধুনিক। ব্যাস, এই পর্যন্ত‌ই। কিন্তু নিয়ম মেনে নিয়মিত ডাক্তার দেখানোটা বাধ‍্যতামূলক।

“চিয়ার আপ ভাই… লড়াই তো সবে শুরু – এখনি  ভেঙে পড়লে হবে? নিন চায়ে চুমুক দিন, ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

“মানে দুধ-চা তো স্বাস্থ্যের পক্ষে ইয়ে…”, বলে ইতস্তত করেও ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দেন। গরমাগরম ধূম্রবতী চাঙায়নী সুধাপানেও ভবেন্দ্রবাবুর বিমর্ষতা কাটে না – “আমি তো বুঝতেই পারলাম না যে এত বড়ো একটা রোগ… আচ্ছা আমি বুঝব কী করে যে আমার ইয়ে মানে এমন ভয়ংকর একটা ইয়ে আমার শরীরে ঢুকেছে?”

ভবেন্দ্রবাবু এখনও হতচকিত। ডাক্তারের ঝুলভরা ময়লাজমা ঘরে প্রচুর আরশোলা  মহানন্দে থাকে। তার‌ই একটা অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে সিলিং-এ উঠেছিল। সিলিং-এ একটা টিকটিকি সেই মোটাসোটা আরশোলাকে টার্গেট করে খাওয়ার জন্যে এগোচ্ছিল। ডাক্তার কপাল আর চশমার ফাঁক দিয়ে ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে ভবেন্দ্রবাবুও তাকালেন। ডাক্তার ফিশফিশিয়ে বললেন, “টিকটিকি নিঃশব্দে শিকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পরেই… কপাত…।”

কিন্তু মোটকু আরশোলাটা হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে পালিয়ে গেল।

“যাহ্ ফসকে গেল”, দম ছাড়লেন ভবেনবাবু।

“হ‍্যাঁ, শিকার‌কেও আত্মরক্ষার জন্যে সব সময় সচেতন থাকতে হয়।…ও হ‍্যাঁ, বলছিলেন বুঝবেন কী করে যে আপনার ইয়ে হচ্ছে, তাই তো?”

ভবেনবাবু ঘাড় নাড়েন।

আরও পড়ুন: ডাক্তারের চেম্বার থেকে: সন্তান পালন করার সহজ উপায়

“ক‍্যানসার হল কৈশোরের প্রেমের মতো নিঃশব্দসঞ্চারী। যখন এসে ধাক্কা মারে কেবলমাত্র তখনই বোঝা যায় সে এসেছে। অথবা ওই টিকটিকিটার মতো নিঃশব্দ চরণে এগিয়ে আসে। তাই আপনাকে বছরে অন্তত একবার টেস্ট ফেস্টগুলো করাতেই হবে। আর ইয়ে… আপনাকে আরশোলা বললে আপনি রাগ করবেন না তো?”

ভবেন্দ্রবাবু ঘাড় নেড়ে জানান যে তিনি রাগ করবেন না।

“আক্রমণ হলেই আপনাকে আত্মরক্ষার জন্যে ওই হোঁৎকা আরশোলাটার মতো মৃত‍্যুদূতের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হবে এবং সেটা খুব চটপট। আজকাল আর ক‍্যানসার মানেই মৃত্যু নয়। চটপট চিকিৎসা করতে হবে। রোগটা কত দূর ছড়িয়েছে দেখে নিয়ে তার পর ঠিকঠাক ওষুধ খেলেই সম্ভবত… হ‍্যাঁ খুব সম্ভব আপনি ভালো হয়ে যাবেন। তাই এক্ষুনি আপনাকে অঙ্কোলজিস্টের কাছে দৌড়োতে হবে। ক‍্যানসার মানেই জীবন শেষ, তা কিন্তু নয়।”

ভবেন্দ্রবাবু উঠছিলেন, ডাক্তার ধমক দিলেন, “ইকি চা’টা শেষ করে যান।”

ভবেন্দ্রবাবু খুশ মেজাজে এক গাল হেসে দুধ চা পানার্থে বসে পড়েন। ডাক্তার‌ও চাঙায়নী সুধায় চিয়ার্স করেন।

আমরাও প্রার্থনা করি ভবেন্দ্রসুন্দরবাবু সুস্থ হয়ে উঠুন।

(লেখক চিকিৎসক)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here