পূর্ণেন্দু কর্মকার, অকুপেশনাল থেপাপিস্ট ও জিম ট্রেনার

আপনার হয়তো সুগার লেভেলটা বেশ ওপরের দিকে। ডাক্তার বলেছেন প্রতিদিন নিয়ম করে আধ ঘন্টা হাঁটতে। শুরুও করেছিলেন। বাজার থেকে হাঁটার জুতো কিনেছেন। রাতের বেলা ছোলা বাদাম ভিজিয়ে রেখেছেন। গিন্নিকে বলেছেন ফিরলে উষ্ণ জলে লেবু দিয়ে এক গ্লাশ দিতে। চলল সপ্তাহ খানেক, হঠাৎই গোড়ালিতে ব্যথা। সাধারণত আমাদের প্রত্যেকের পায়েই সময়ে অসময়ে নানারকমের ব্যথা হয়। আমরা পাত্তা দিই না। অথচ ভেবে দেখুন, আপনার গোটা শরীরের ভারটা ধরে রেখেছে আপনার পা। হাঁটা-দৌঁড়ানোর সময় পায়ের উপর যে চাপ পড়ে, সেই চাপের বেশিরভাগটাই বহন করে গোড়ালির হাড়৷ চিকিৎসকদের মতে হাঁটার সময় পায়ের উপর শরীরের ওজনের ১.২৫ গুন চাপ পড়ে৷ দৌড়ানোর সময় চাপ পড়ে ২.৭৫ গুন৷ যার ফলে বেশকিছু ক্ষেত্রে গোড়ালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটা সময়ের পর শুরু হয় ব্যথা৷

গোড়ালি ব্যথার কারণ

১. হাঁটার সময় ঠিকভাবে পা না ফেললে, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস থাকলে, ডায়াবেটিস থেকে নিউরোপ্যাথির সমস্যা হলে,  হিল পেন হয়৷

২. রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গেলে, বোন সিস্ট থাকলে হিল পেন হয়।

৩. অস্টিওস্পোরোসিস থাকলেও গোড়ালিতে যন্ত্রণা হয়৷

৪. পায়ের পাতা ফ্ল্যাট হলে গোড়ালিতে ব্যথার সম্ভাবনা বাড়ে৷

৫. দীর্ঘদিন ধরে খুব শক্ত জুতো বা হাই হিল ব্যবহারেও গোড়ালিতে চাপ পড়ে৷ এতে গোড়ালির পিছন দিক থেকে অথবা গোড়ালির ভিতর থেকে ব্যথা অনুভূত হয়৷

৬.পায়ের পিছনের দিকে নার্ভে বেশি চাপও গোড়ালিতে ব্যথার অন্যতম কারণ৷
খুব বেশি ব্যায়াম, খেলাধুলো এবং হাঁটাচলা করে কাজ করলে গোড়ালির হাড়ে খুব চাপ পড়ে। এই কারণে গোড়ালিতে ব্যথা হয়৷

৭. গোড়ালির হাড় পূর্ণতা পায় না বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধির আগে টিনএজারদের এই সমস্যা হয়৷

কখন ডাক্তার দেখাবেন

১. গোড়ালি ফুলে গেলে৷

২. জ্বরের সঙ্গে গোড়ালিতে ব্যথা হলে৷ অনেক সময় জ্বরের মধ্যে গোড়ালি অসাড়ও হয়ে যেতে পারে।

৩. হাঁটার সময় সমস্যা হলে, পা ভাঁজ করতে অসুবিধা হলে, পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়াতে সমস্যা হলে৷

৪. এক সপ্তাহের বেশি গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে, চলাফেরা ছাড়াও ব্যথা করলে দেরি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন৷

কিছু ব্যায়াম

গোড়ালির ব্যথা দূর করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ব্যায়াম করতে পারেন

১. সকালবেলায় যেকোন একটি দেয়ালে সামনে গিয়ে দাড়ান। এরপর আপনার দু হাত দেয়ালে রেখে এক পা সামনে এবং আরেক পা পেছনে রেখে অনেকটা ধাক্কা দেওয়াম মতন ভঙ্গীতে থাকুন। কমপক্ষে ত্রিশ সেকেন্ড এই অবস্থায় থাকবার পর পায়ের অবস্থান বদলে ফেলুন।

২. একটি ছোট বোতলকে প্রথমে রেফ্রিজারেটরে রেখে ঠান্ডা করুন। এরপর সেটাকে তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে নিন আর পায়ের নীচে রেখে খানিকটা এদিক ওদিক করুন। পায়ের নীচের অংশ আর গোড়ালি দিয়েই সেটাকে সামনে পিছনে নিয়ে আসুন। কমপক্ষে ৫ মিনিট ধরে এই কাজটি করুন।

৩. দুই হাতের দুই বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে পায়ের নীচের অংশে চাপ দিন।খুব আস্তে ও খানিকটা চাপসহ নিজের আঙ্গুলদুটোকে গোড়ালি, আঙ্গুল ও পায়ের নীচের অন্যান্য অংশে এক মিনিট ধরে মালিশ করুন। এরপর অন্য পায়ের সাথেও একই কাজ করুন।

উপশম

১. হিল পেনের ব্যথা থেকে বাঁচতে সব সময়ে নরম জুতো ব্যবহার করুন৷ সিলিকন হিল প্যাড দেওয়া জুতো পরা সব থেকে ভাল৷

২. অসমতল জায়গায় বেশি হাঁটা চলবে না৷

৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ করা উচিত৷

৪. শরীরে ভিটামিনের অভাব থাকলে তার দিকে নজরদারি প্রয়োজন৷ গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে শরীরে ভিটামিন-ডি ও ভিটামিন-ই-এর পরিমাণ বাড়ানো দরকার৷ তাই বেশি করে সবুজ শাক-সবজি, ফল খাওয়া আবশ্যক৷সামুদ্রিক মাছ খেলেও উপকার পাওয়া যায়৷

৫. বদ হজম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, বেশি করে জল খেতে হবে৷ তেল-ঝাল জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া চলবে না৷

৬. ব্যথা হলে অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত৷ ব্যথার পিছনে অন্য রোগ থাকলে সেই রোগ নির্মূল করা আগে প্রয়োজন৷

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here