ডাঃ অমিতাভ চন্দ, নিউরো সার্জন

তপব্রত। বয়স ৩৯। আইটি কর্মচারি। বর্তমানে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কারণ মস্তিস্কে রক্ত সরবরাহের ঘাটতি। সহজ ভাষায় স্ট্রোক। তপব্রতের দিন শুরু হত সকাল আটটায়। ন টার মধ্যে খেয়েদেয়ে অফিস। দুপুর তিনটেয় লাঞ্চ, চার টা থেকে ছ টা পর্যন্ত অফিসের নানান স্তরে মিটিং। কাজ শেষ হতে রাত আটটা। অফিস থেকে বেড়িয়ে অভ্যেস মতন কোনও পানশালায় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সামান্য আড্ডা। বাড়ি ফিরতে রাত দশটা। স্ত্রী সন্তান দের সময় দিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত বারোটা। (ইদানিং তপব্রত ঘুমের ওষুধ খেত)। পরের দিন আবার সকাল আটটায় ঘুম থেকে ওঠা। কী নিজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন তো! আপনার বয়সটাও তপব্রতর মতন? আপনার ছেলেও তপব্রতর ছেলের বয়সি? ঠিকই ধরেছেন। আধুনিক জীবনযাত্রার একটি কমন উপহার স্ট্রোক। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়ে আক্রান্ত অংশের কোশ নষ্ট হওয়াকে স্ট্রোক বা ব্রেন স্ট্রোক বলে। বর্তমান বিশ্বে স্ট্রোক মানুষের মৃত্যুর চতুর্থ কারণ হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে।

স্ট্রোক দু’ ধরনের। হেমারেজিক এবং ইস্কিমিক। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে হেমারেজিক স্ট্রোক হয়।

তার মূল কারণ
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • মস্তিষ্কের রক্তবাহী শিরা উপশিরার কোনও অংশ আচমকা বেলুনের মতো ফুলে ওঠা।
  • ব্রেন টিউমার।
  • মস্তিষ্কের কোনও রক্তবাহী শিরার গঠনগত ত্রুটি।
  • মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীর মধ্যে দিয়ে রক্ত চলাচলে বাধা হলে দেখা দেয় ইস্কিমিক স্ট্রোক।
  • অধিক পরিমাণে নুন খাওয়া, চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়া,
  • রক্তে অতিমাত্রায় কোলেস্টেরলের উপস্থিতি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিকস, উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি করে।
  • এছাড়া শারীরিক কর্মতৎপরতার অভাব, ধূমপান, অতিমাত্রায় মদ্যপান,হার্টের সমস্যাও স্ট্রোককে তরান্বিত করে।

আরও পড়ুন: ডাক্তারের চেম্বার থেকে: স্ট্রোক আধুনিক জীবনযাত্রার দান

কী করে বুঝবেন

স্ট্রোকের মুহূর্তে বিশেষত হেমারেজিক স্ট্রোকে প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হয়। তার সঙ্গে আরও এক বা একাধিক উপসর্গ থাকতে পারে। যেমন —

  • হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
  • খিঁচুনি
  • শরীরের কোনও অংশ অসাড় হয়ে যাওয়া
  • চোখে অন্ধকার দেখা
  • হঠাৎ ডাবল ভিশন, কথা জড়িয়ে যাওয়া শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পারা
  • মেজর স্ট্রোকে অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে পক্ষাঘাত, কথা বন্ধ ইত্যাদি হয়।
  • ট্রানসিয়েন্ট ইস্কিমিক অ্যাটাক বা টি আই এ-তে খুব অল্প সময়ের জন্য মুখের একটা পাশ, একটা হাত কি একটা পা একটু অবশ হয়ে আবার ঠিক হয়ে যায়। চোখের সামনে কালো পর্দা পড়ে। খানিক বাদেই আবার ঠিক হয়ে যায়।
  • রিভার্সিবল ইস্কিমিক নিউরোলজিকাল ডেফিসিট-এ স্ট্রোক হয়। কিন্তু দু-তিন দিনে রোগী মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে যান। এ হল মেজর স্ট্রোকের ওয়ার্নিং সাইন।
কী করণীয়
  • স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। মস্তিস্কের কোষ এক বার নষ্ট হয়ে গেলে তাদের আর ঠিক করা যায় না। স্ট্রোক হওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে চিকিত্সা শুরু হলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • ইস্কিমিক স্ট্রোক হলে টিস্যু প্লাজমিনোজেন অ্যাকটিভেটর ইঞ্জেকশন দিয়ে ব্লাড ক্লট খোলার চেষ্টা করা হয়। একে বলে থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি। অনেক রোগীই দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। এক দিকে প্যারালিসিস হয়ে গেছে এমন রোগীও অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
  • আজকাল সরু ক্যাথেটারের সাহায্যে সরাসরি ক্লটে ইঞ্জেকশন দেওয়া যায়। রোগী ছ’ ঘণ্টার মধ্যে এলেও খুব ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়।
  • ছ’ ঘণ্টা পরে চিকিত্সা শুরু হলে আগের মতো ভালো ফল না পাওয়া গেলেও চেষ্টা করা হয় যাতে আর বেশি ক্ষতি না হয়।
  • একটু সুস্থ হওয়ার পরই শুরু হয় রিহ্যাবিলিটেশন। অর্থাৎ দ্রুত মানুষটিকে তাঁর পূর্ণ কর্মক্ষমতায় ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। শরীর সচল করতে শুরু হয় ফিজিওথেরাপি। মনকে হতাশামুক্ত করতে সাইকোথেরাপি।
  • স্নায়ুর কর্মক্ষমতা ফেরার সর্বোচ্চ সময় এক থেকে দেড় বছর। অর্থাৎ এর মধ্যেই যত টুকু যা ঠিক হওয়ার তা হবে। এর পর ফিজিওথেরাপি চালিয়ে কোনও লাভ হয় না।

রিহ্যাবিলিটেশনের পর্ব চলাকালীনই স্ট্রোকের পরবর্তী আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখার জন্য কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। যেমন —

  • উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। খাওয়াদাওয়ার নিয়ম মেনে চলা। প্রয়োজনে ওষুধ খাওয়া।
  • টাটকা শাকসবজি এবং ফলে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। স্ট্রোক ঠেকাতে এদের কার্যকর ভূমিকা আছে।
  • ঘুম যাতে ঠিক ঠাক হয় সে দিকে খেয়াল রাখা।
  • ডাক্তারের পরামর্শমতো কিছু ব্যয়াম করা।
  • ধূমপান ছেড়ে দেওয়া।
  • ডাক্তারের পরামর্শমতো কিছু ওষুধও খেতে হবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here