ডাঃ অঞ্জন ভট্টাচার্য

কালীপুজো এখন ঘণ্টায় হিসেব হচ্ছে। তোজো জোজো মিঠুরা এখন ব্যস্ত বাজিতে। বাজি কেনা, রোদ খুঁজে বাজি কড়া করতে দেওয়া ইত্যাদি নানান গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। আর আপনি মরছেন টেনশনে। কালীপুজোয় সবথেকে যেটা ভয়ের, বাজিতে অঘটন।তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে শরীরের কোনো অংশ পুড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারলে পরবর্তী সময়ে ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। ফার্স্ট ডিগ্রি বা প্রথম বা স্বল্প মাত্রার পোড়া, সেকেন্ড ডিগ্রি বা দ্বিতীয় বা মধ্যম মাত্রার পোড়া, থার্ড ডিগ্রি বা তৃতীয় বা মারাত্মক মাত্রার পোড়া। চিকিৎসাও নির্ভর করে কোন মাত্রায় পুড়েছে তার ওপর।

প্রথম মাত্রার পোড়া

শুধু চামড়ার উপরিভাগ পুড়ে গেলে তাকে প্রাথমিক মাত্রার পোড়া বলা হয়, সাধারণভাবে যাকে সামান্য পোড়া বলে। চামড়া বা ত্বকে দুটি স্তর থাকে। এপিডার্মিস ও ডার্মিস। এ ক্ষেত্রে শুধু এপিডার্মিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আর লক্ষণ হিসেবে-

  • চামড়া লাল হয়ে যায়।
  • আক্রান্ত স্থান ফুলে যায়।
  • আক্রান্ত স্থানে ব্যথা থাকে।

তবে মুখ, যৌনাঙ্গ, নিতম্ব, অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টে সামান্য পুড়ে গেলেও তাকে প্রথম মাত্রার পোড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রথম মাত্রার অন্যান্য পোড়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও চলবে।

 দ্বিতীয় মাত্রার পোড়া

চামড়ার এপিডার্মিস ও ডার্মিস উভয় স্তর পুড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে চামড়ায় বা ত্বকে-

  • ফোসকা পড়ে।
  • লাল হয়ে যায়।
  • অতিরিক্ত ব্যথা অনুভূত হয়।
  • ফুলে যায়।

দ্বিতীয় মাত্রার পোড়া সাধারণভাবে যদি তিন ইঞ্চি পরিমাণের বেশি বিস্তৃত না হয়, তবে সামান্য পোড়া হিসেবে প্রাথমিক চিকিৎসা করলেও চলবে। পোড়া অংশ যদি তিন ইঞ্চির বেশি হয় কিংবা হাত-পা, যৌনাঙ্গ, নিতম্বে বিস্তৃত হয়, তবে তা গুরুতর পোড়া হিসেবে তৎক্ষনাৎ হাসপাতালে চিকিৎসা করতে হবে।

তৃতীয় মাত্রার পোড়া

গুরুতর পোড়া। এ ক্ষেত্রে চামড়ার উভয় স্তর, চর্বি, মাংস এমনকি হাড়ও পুড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে

  • পোড়া অংশ কালো হয়ে যায় অথবা শুষ্ক ও সাদা বর্ণ ধারণ করে।
  • শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
  • কার্বন মনোক্সাইড নামক বাতাসের বিষাক্ত পদার্থ ফুসফুসে ঢুকে পড়ে।

গুরুতর পোড়া রোগীর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সম্ভব হলে সরাসরি বার্ন ইউনিটে রোগী স্থানান্তর করতে হবে। তবে পোড়ার ক্ষেত্রে কত ডিগ্রি পুড়ে গেল তার ওপর রোগীর অবস্থা নির্ভর নাও করতে পারে। কয়েকটি জরুরি বিষয় হলো-

  • রোগী কতক্ষণ ধরে পুড়েছে।
  • বাহ্যিকভাবে শরীরে পোড়ার অংশ কতখানি।
  • মাথা, গলা, ঘাড়, বুক, পেট, যৌনাঙ্গ পুড়েছে কি না এই বিষয়গুলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

    সাধারণ পুড়ে যাওয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা

প্রাথমিক ও দ্বিতীয় মাত্রার পোড়া, সাধারণভাবে যার বিস্তৃতি তিন ইঞ্চির কম, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে-

  • পোড়া অংশ ঠান্ডা জলের প্রবহমান ধারার নিচে ১০-১৫ মিনিট ধরে রাখতে হবে। গা পুড়ে গেলে শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে দিন।
  • পোড়া অংশ জীবাণুমুক্ত গজ বা ব্যান্ডেজ (তুলা নয়) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যাতে জীবাণুর সংক্রমণ না হয়।
  • পেইন কিলার খাইয়ে দিন। সাধারণ পোড়ায় প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রফেন-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • পোড়ার মাত্রা রোগীর পক্ষে সব সময় বোঝা সম্ভব নয়। তাই অল্প পুড়লেও একবার ডাক্তার দেখানো উচিত।

যা করা যাবে না

  •  পোড়া অংশে ফ্রিজের জল বা বরফ দেওয়া যাবে না। গরম জলও ঢালা যাবে না।
  • ডিম, টুথপেস্ট, মাখন এবং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের মলম ব্যবহার করা যাবে না।
  • তুলা দিয়ে ড্রেসিং করা বা পোড়া অংশ ঢেকে রাখা যাবে না। শুকনো গজ বা ব্যান্ডেজ ব্যবহার করতে হবে।
  • ডাক্তার দেখানোর আগে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করবেন না।

পোড়া রোগীর বিপদ সংকেত

  • রোগী অজ্ঞান হয়ে যাবে।
  • বাতাসের বিষাক্ত ধোঁয়া ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসনালি ফুলে যাওয়া ও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
  • পোড়া অংশে জীবাণুর সংক্রমণ হওয়া।
  •  ইউরিন বন্ধ হয়ে যাওয়া।
  • শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়া।
  • খিঁচুনি হওয়া।

মনে রাখুন

  • শরীরে আগুন লেগে গেলে ওই স্থান থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে যান, আগুনের ধোঁয়া থেকে দূরে যান।
  • দৌড়াবেন না। এতে আগুন আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
  • শুয়ে পড়ে বারবার মাটিতে গড়াগড়ি দিন। এতে জামা-কাপড়ের আগুন নিভে যাবে এবং পোড়ার অংশ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। এ সময় দুই হাত দিয়ে মুখ, গলা ঢেকে রাখা উচিত।
  • মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, ভয় পাওয়া যাবে না। ভীত হলে মানুষ স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না।
  • আগুন লাগলে কী করা উচিত সে বিষয়ে বাড়ির শিশু-বৃদ্ধ সবাইকে প্রাথমিক ধারণা দিন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here