বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবসে আর্জি, ধূমপানমুক্ত সুস্থ বিশ্ব গড়ে তুলুন!

0
শ্রয়ণ সেন

রায়ান ভট্টাচার্যের কথা-

বছর তিরিশের রায়ান ধূমপান শুরু করেন কুড়ি বছর বয়সে। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সিগারেটে হাতেখড়ি। সিগারেট খেলে কী ক্ষতি হয়, সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। কিন্তু দু’তিনটের বেশি সিগারেট খান না তিনি। তাঁর বক্তব্য, “অল্প সংখ্যক সিগারেট খেলে ক্যান্সারের কোনো ভয় নেই। তবে আমার আয়ু হয়তো কমতে পারে।” তবে ছাড়ার চেষ্টা তিনি করছেন বলে জানিয়েছেন।

মণীশ পালের কথা-

পঞ্চাশোর্ধ মণীশ পাল একজন সক্রিয় ধূমপায়ী। ৮ থেকে ১০টা সিগারেট সেবন না করলে তাঁর দিন ব্যর্থ! ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলিও জানেন, কিন্তু ১৮ বছর বয়সে ধরা অভ্যাসটি এখনও ছাড়তে পারেননি। তবে সিগারেট ছাড়ার একাধিকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।

মিলি আচার্যর কথা

কুড়ি বছর বয়স থেকে সিগারেট ধরলেও এখনও সেই অভ্যাসটি রয়ে গিয়েছে পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ়া মিলি আচার্যের। তবে ছ’টার বেশি সিগারেট তিনি খান না। তাঁর ধূমপানের এই অভ্যাসের প্রভাব সন্তানের ওপরেও পড়েছে। তিনি নিজেও চেষ্টা করেছেন সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার কিন্তু পারেননি। ধূমপানের প্রভাবে শারীরিক ক্ষতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হলেও তিনি বলেন, “নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ধূমপান করলে কোনো সমস্যা নেই।”

ওপরের দু’জনের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার ধূমপানের যে অভ্যাস তাঁদের রয়েছে, সেটা ছাড়ার চেষ্টা একাধিকবার তাঁরা করেছেন, কিন্তু পারেননি। আসলে সিগারেট ছাড়ার জন্য যে মনের জোরটা দরকার, সেটা হয়তো কোনো ভাবে পাননি। অনেকেরই বক্তব্য, টেনশনের সময়ে দু’ একটা সিগারেট না খেলে মাথার জট নাকি খুলতেই চায় না। এই দু’জন-সহ অসংখ্য মানুষের কাছে আজকের দিনটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ।

২৪ ঘণ্টার জন্য ধূমপান বর্জন করতে হবে। এই উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৭ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম বার পালিত হয় ধূমপান বিরোধী দিবস। পরের বছরই এর পরিধি আরও কিছুটা বাড়ানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অ্যাসেম্বলিতে একটি প্রস্তাব পাশ হয় যেখানে বলা হয় প্রতি বছর ৩১ মে পালিত হবে বিশ্ব তামাকবিরোধী দিবস। সেই থেকে প্রতি বছর আজকের দিনটি অর্থাৎ ৩১ মে বিশ্ব তামাকবিরোধী দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। প্রতি বছর কিছু না কিছু থিম থাকে এই দিনটাকে কেন্দ্র করে। এ বারের থিম হল “টোব্যাকো অ্যান্ড লাং হেলথ।” বাংলায় তর্জমা করলে যা দাঁড়ায় ‘তামাক এবং ফুসফুসের স্বাস্থ্য।’

তামাকজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে শুধু সিগারেট পড়ে না। হুকো, গুটকা, খৈনি, বিড়ি, সবই পড়ে। কিন্তু এঁদের মধ্যে বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে সিগারেটের কারণেই। কারণ সিগারেট সেবনকারীর সংখ্যা যে অনেক বেশি। পথ দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণের থেকে বেশি মানুষ মারা যান শুধুমাত্র সিগারেট-বিড়ির নেশার কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানটা শুনলে আঁতকে উঠবেন! প্রত্যেক বছর ৭০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় ধুমপান করে।

আমাদের শরীরের কোন জায়গায় সিগারেট বা সে অর্থে তামাক প্রভাব ফেলে, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সেটা তো এই বছরের থিম থেকেই পরিষ্কার। কিছু তথ্য দেওয়া যাক। বিশ্বে প্রতি বছরে কম করে ৮ লক্ষ মানুষ মারা যান শুধুমাত্র তামাকজাত দ্রব্য সেবন করে। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জনের মৃত্যু হয় এই কারণে। প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়ে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যান। ঘরের ভেতরের দূষণের অন্যতম কারণ এই সিগারেট। ধুমপায়ীদের প্রতি দু’জনের এক জন তার নির্ধারিত আয়ুর প্রায় ১৪ বছর আগেই মারা যান।

বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস উপলক্ষে জনৈকা অভিধা মিত্রের তৈরি করা একটি পোস্টার।

আর শুধু সিগারেট কেন, এখন নবীন প্রজন্ম যে দিকটার দিকে বেশি ঝুঁকছে, সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া কোনো ভাবেই যায় না। সেটা হুকো।

অনেকেরই ধারণা, সিগারেটে, বিড়ির মতো বেশি ক্ষতিকর নয় হুঁকো। অনেকে এমনও আছেন, যাঁরা জীবনে কোনো দিনও সিগারেট ছুঁয়ে দেখেননি কিন্তু হুঁকোর প্রতি চরম আসক্তি। তাঁদের ধারণা, হুঁকোতে কোনো ক্ষতিই নেই। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভুল।

হুঁকো অনেক বেশি ক্ষতিকর। একবার হুঁকোয় টান দিলে যে পরিমাণে তামাক ফুসফুসে প্রবেশ করে তা সিগারেট এবং বিড়ির তুলনায় অনেক বেশি। আর একটা সিগারেট বা বিড়ির থেকে একটি হুক্কা অনেক বেশি সময় ধরে চলে। ফলে অনেকটা সময় ধরে অনেক বেশি পরিমাণে তামাক ফুসফুসে গিয়ে প্রবেশ করে প্রভূত ক্ষতি করে ফুসফুসের। সিগারেটের মতোই হুঁকোর ক্ষেত্রেও ক্যান্সার এবং হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা থেকে যায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ধূমপায়ীরা একটা বক্তব্য মাঝেমধ্যেই মজার ছলে লেখেন, “ধূমপান ছাড়া খুব সহজ আমি অনেক বার ছেড়েছি।” এটা কিন্তু আর কোনো রসিকতার জায়গায় নেই। সুখটান কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যার কারণ। ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক আরও কত কী।

তাই যত দ্রুত সম্ভব জীবন থেকে এই সিগারেট বাদ দিন। বিশ্ব তামাক বর্জন দিবসে সব ধূমপায়ীর কাছে তামাক ছাড়ার আর্জি জানাই। নিজের জন্য তো বটেই, নিজেদের নিকট আত্মীয়ের কথা ভেবে এই সাদা কাঠিটির কথা এক্কেবারে ভুলে যান। এক ধূমপানমুক্ত বিশ্ব গড়তে সাহায্য করুন।

(নামগুলি পরিবর্তিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here