dr_kaushik-lahiriডাঃ কৌশিক লাহিড়ী

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ

সে দিন হোয়াটস অ্যাপে একটা মেসেজ পেলাম – একটা ছবি। সহাস্য বদনে অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গলায়-কানে-মাথায় চির পরিচিত শেয়ালরঙা মাফলার। নীচে লেখা – “মুখ্যমন্ত্রী মাফলার পরে ফেলেছেন : শীতের আগমনবার্তা সরকারি ভাবে ঘোষণা করল আবহাওয়া দফতর”।

বাঙালি কিন্তু আসলে থার্মোমিটার দেখে না, ক্যালেন্ডার দেখে সোয়েটার পরে। শুধু সোয়েটার কেন (পৌষ মাঘ বললে গুলিয়ে যেতে পারে) ডিসেম্বর পড়তে না পড়তেই অবধারিত ভাবে মাফলার (আমাদের জনৈক বাহনচালক বলতেন মামলার, আবার কখনও কখনও মামলেটও বলতেন), মাঙ্কি টুপি, নানা ধরনের শাল, উলের মোজা আর তার সঙ্গে ইদানীং যোগ হয়েছে কানঢাকা ইয়ার-মাফ।

শুধু দার্জিলিং, সিমলা, গুলমার্গ নয়, আমাদের দত্তপুকুর, শ্যামবাজার বা গগন সরকার লেনেও একই অবস্থা। বিশ্বাস না হয় একবার সকালের দিকে ভিক্টোরিয়া চত্বরে বা লেকের দিকটায় ঘুরে আসুন। আর মফঃস্বল শহর বা একটু গ্রামের দিকে তো কথাই নেই। শীতের পোশাকের আড়ম্বর দেখলে মনে হবে বরফ পড়ছে। আমাদের সেই বাহনচালক বিশ্বকর্মা পুজোর পর থেকেই ‘মাফলার পরে ফেলতেন’। অথচ এই বঙ্গে পনেরো থেকে পঁচিশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে শীতের বিস্তার! মানে সেলসিয়াস কখনও কখনও ভুল করে প্রায় দশের আশেপাশে পৌঁছে গেলে তো আর রক্ষে নেই। টিভির পর্দায় স্ক্রোল, ব্রেকিং নিউজ, খবরের কাগজে হেডলাইন সর্বত্র এক কথা। ফেসবুকেও আদিখ্যেতার চূড়ান্ত। সাড়ে বারো না পৌনে তেরো তাই নিয়ে হোয়াটস অ্যাপ সরগরম। ব্রিটিশদের আর কিছু না পাক, আবহাওয়া নিয়ে ভাবনাহীন কথার বদভ্যাসটা বাঙালির মজ্জাগত। সমস্যাটা অবশ্য মজ্জায় নয়, হয় ত্বকে।

আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের বৃহত্তম অঙ্গ, আমাদের সকলের প্রাথমিক ঠিকানা, এই ত্বকে। কী রকম?

বিস্তারে বলি –

শীতের পোশাক থেকে যেটা হয় সেটা হল কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস। আগেই বলেছি, তেলা মাথায় তেল দেওয়ার মতো স্বল্প শীতে অতিরিক্ত শীতের পোশাক পরা বাঙালির বদ অভ্যাস। তাতে ত্বকের ওপর ঘাম জমে। ফলে সৃষ্টি হয় এই প্রদাহমূলক ত্বকের রোগের আদর্শ পরিবেশ।

কাপড়ের ফেব্রিক, পোশাকে ফিনিশিং-এর গলদ, গরম কাপড়ে ব্যবহৃত ‘অ্যাজো’ ডাই বা ‘প্যারাফিনাইল-ডাই অ্যামিন’ থেকে ত্বকের প্রদাহ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শিশুদের কোমল ত্বকে।

সুতির কাপড় থেকে সাধারণত এই সমস্যা হয় না। তবে তাতে ব্যবহৃত রঙ থেকে হতে পারে আর হতে পারে অসমান নিম্ন মানের ফিনিশিং থেকে। মজার কথা হল, রেশম বা সিল্ক থেকে কিন্তু ত্বকের সমস্যা হয় না। এটা একটা প্রাকৃতিক তন্তু। তবে পলিয়েস্টার পোশাকের প্রতিটি ধরন থেকে সমস্যা হতে পারে।

অ্যাক্রাইলিক, ওরিয়ন, পলিভিনাইল, রেসিন বা মারক্যাপটোবেন বেনজোথায়াজোল – নামের দিক থেকে যেমন খটোমটো তেমন সমস্যা সৃষ্টির দিক থেকেও মারাত্মক। মোজা, ব্রেসিয়ার বা অন্যান্য অন্তর্বাসে স্ক্যানডেক্স নামে একটি প্রসারণশীল পলিইউরেথেন ফাইবার থাকে। কোমরে, বুকে, পায়ে প্রদাহ তৈরি করতে এর জুড়ি মেলা ভার। এ ছাড়া গরম কাপড়ে থাকা ফরমালডিহাইড থেকে হতে পারে কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস।

skin-problem-1

এবার আসি উলের কথায়।

ভেড়ার গায়ের পশম যতই প্রাকৃতিক হোক, তার থেকে সমস্যা হতে পারে। এই উলে থাকে ল্যানোলিন নামে একটি প্রাকৃতিক তেল। অনেকের এই ল্যানোলিনে অ্যালার্জি থাকে। শুধু ত্বক নয়, উল অ্যালার্জির থাবা পড়তে পারে চোখ ও নাকেও। শীতে উলের পোশাক পরে গা চুলকে চোখের জলে, নাকের জলে হতে হামেশাই দেখা যায়। অনেকেই আছেন যাঁরা উলে ঠিক অ্যালার্জিক নন, সেনসিটিভ। উলের পোশাকের নীচে সুতির পোশাকের আস্তরণ থাকলে তাঁদের সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় শুধু মাত্র সরাসরি স্কিন কনট্যাক্টে। আর যাঁদের উলে অ্যালার্জি, তাঁদের সমস্যার সমাধান এত সহজে হওয়ার নয়।

তৈলাধার পাত্র না পাত্রাধার তৈল, এই চুলচেরা বিশ্লেষণে না গিয়ে এটা বলা যায়, শীতের পোশাকের ফাইবার, রঙ, ফিনিশিং, উল – সবগুলির সংস্পর্শেই কিছু প্রদাহমূলক ত্বক-সমস্যা হতে পারে।

ইরিট্যান্ট ডার্মাটাইটিস — মানে ত্বককে সরাসরি বিরক্ত উত্ত্যক্ত করে এমন কিছু তীব্র অম্ল, ক্ষার বা উদ্বায়ী বাহক থেকে হওয়া সমস্যা। এটা সবার হতে পারে।

অ্যালার্জিক ডার্মাটাইটিস – সবার নয়। কারো কারো হয়। পোশাকের কোন না কোন উপাদান থেকে অ্যালার্জি।

কী ভাবে বোঝা যাবে?

প্রাথমিক ভাবে লাল হয়ে, দানা দানা র‍্যাশ বেরিয়ে চুলকোতে শুরু করে। পরে চুলকে ঘা হয়ে সংক্রমিত হয়ে মারাত্মক আকার নিতে পারে। প্যাচ টেস্ট করা যেতে পারে, পোশাকের ঠিক কোন উপাদান থেকে সমস্যা হচ্ছে সেটা জানার জন্য। তবে এই টেস্টটি সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়।

সব চেয়ে ভালো হল, রোগীর কাছ থেকে জেনে নেওয়া ঠিক কোন পোশাকে সমস্যা। যাঁর উল থেকে সমস্যা তাঁর যে সিনথেটিকে অ্যালার্জি হবেই তার কোনো মানে নেই। আবার উল্টোটাও সত্যি।

skin-problem-2

কী করতে হবে?

যদি বোঝা যায় কোন গরম পোশাক থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে তা হলে সেটি পরা চলবে না। ভালো করে ধুয়ে নিয়ে প্রথম বার পরা উচিত শীতের পোশাক। তাতে কিছু রাসায়নিক ডিটারজেন্ট, রঙ ধুয়ে গিয়ে পোশাকটি কিছুটা নিরাপদ হবে। বাড়িতে ল্যাকটোক্যালমাইন লাগানো যেতে পারে আর অ্যান্টিঅ্যালার্জিক ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। না কমলে ত্বক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তো আছেনই।

কী করবেন না?

১) যে জায়গাটা চুলকোচ্ছে, চেষ্টা করুন সেই জায়গাটা নখ দিয়ে না চুলকোতে। ওই জায়গায় বরফ লাগাতে পারেন। অথবা ঠান্ডা জলে বার বার ধুতে পারেন।

২) সাবান লাগাবেন না, তাতে সমস্যা আরও বাড়বে।

৩) গন্ধহীন কোনো ভেসলিন জাতীয় ক্রিম লাগানো যেতে পারে।

৪) স্পিরিট বা অ্যান্টিসেপটিক লোশন বা ক্রিম একেবারেই নয়।

৫) যদি প্রাথমিক চিকিৎসক স্টেরয়েড ক্রিম (জেনে নিন) লাগাতে দেন, তা অতি অল্প পরিমাণ লাগান। বেশি লাগালে বিপদ হতে পারে।

সব শেষে বলা যায়, ক্যালেন্ডার দেখে নয়, শীত পড়লেই শীতের পোশাক পরুন।

ছবি: ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগৃহীত

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here